কাজী নজরুলের সংকটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা

কানাই দাস বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক চিরস্মরণীয় নাম। মুলত বিদ্রোহী কবি হিসেবে চির পরিচিত ।তিনি সাম্যের কবি ও মানবতার কবি। তাঁর কবিতা, গান ও কয়েকটি....

কানাই দাস

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক চিরস্মরণীয় নাম। মুলত বিদ্রোহী কবি হিসেবে চির পরিচিত ।তিনি সাম্যের কবি ও মানবতার কবি। তাঁর কবিতা, গান ও কয়েকটি গল্পর লেখনীর মধ্য দিয়ে বারবার মূর্ত হয়ে উঠেছে শোষণমুক্ত সমাজের জয়গান, অসহায় নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষের মর্যাদা এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের বার্তা। অথচ জীবনের এক করুণ অধ্যায়ে এই মহান প্রতিভাবান কবিকেই একটা সময় , চরম অসহায়ত্ব ও দুর্বিষহ দিন কাটাতে হয়েছিল।

 

যে কবির কণ্ঠ একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠেছিল, অসুস্থতার নিষ্ঠুর আঘাতে সেই কণ্ঠ চিরতরে নির্বাক হয়ে যায়। নিজের যৎসামান্য প্রয়োজন, পরিবারের দুঃখ-কষ্ট কিংবা চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর মতো সাধারণ সামর্থ্যও তাঁর ছিল না, তাঁকে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। নজরুলের জীবনের এই কঠিন ও সংকটময় সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মানবিক ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে কবি নজরুল ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর বাক্‌শক্তি এবং স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ব্যাহত হতে থাকে। এই মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ভয়াবহ আর্থিক সংকট তাঁর জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কঠিন সময়ে নিজের ব্যয়বহুল চিকিৎসা, পাশাপাশি স্ত্রী প্রমীলার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং সংসারের ভরণপোষণের দায়ভার কবিকে এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

 

যাঁর কলম ও বাণী সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারের পক্ষে কথা বলেছিল, সেই মানুষটিকেই তখন বেঁচে থাকার তাগিদে অন্যের সহায়তার প্রতীক্ষায় দিন কাটাতে বাধ্য হয়। এই সময় আমাদের গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিভা মানুষকে অমর সম্মান , যশ ও খ্যাতি এনে দিতে পারে, কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের বাস্তব জীবন সব সময় নিরাপদ বা নিশ্চিতও হয় না।

নজরুলের এই গভীর সংকটের মুহূর্তে বাংলার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কবির পাশে বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত । তিনি কেবল একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ বা শিক্ষাবিদই ছিলেন না, তাঁর ভেতরে এক উদার মানবতাবাদী, শিল্পীর প্রতি সম্মানের মনোভাব সদা সর্বদা ছিল।

 

কবির অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি নিজেই যোগাযোগ করেন এবং তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে জানা যায়, তিনি কবির চিকিৎসার খরচ হ্রাস করার নানা চেষ্টা করেন এবং শারীরিক বিশ্রাম ও সুস্থতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নজরুলকে তৎকালীন স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে খ্যাত বিহারের মধুপুরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

এই সহায়তার গভীরতা ও গুরুত্ব বুঝতে হলে নজরুলের তৎকালীন মানসিক অবস্থা ও সেই সময়ের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। অসুস্থতার কারণে কর্মহীন কবির সংসারের দায়িত্ব থেমে থাকেননি। স্ত্রীর দীর্ঘকালীন চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তখন ঋণের বোঝা তাঁর কাঁধে পাহাড়প্রমাণ হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থায় মুখের সহানুভূতি নয়, বরং বাস্তব ও আন্তরিক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই সময় এই সাহায্যের হাত কেউ বাড়িয়ে দেয়নি, দিয়েছিল একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ।

 

 

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে মধুপুর থেকে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লেখা নজরুলের একটি চিঠি এই পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর তাৎপর্য বহন করে । ওই চিঠিতে কবি শ্যামাপ্রসাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, মধুপুরে আসার পর তাঁর মাথার ব্যথা কিছুটা কমেছে এবং তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।চিঠিতে তাঁর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি নিজের আর্থিক অনটন, স্ত্রীর চিকিৎসার ঋণ এবং সংসারের চরম অসহায়তার কথাও অকপটে তুলে ধরেন। এই চিঠির মধ্যে একদিকে যেমন কবির নিজস্ব আত্মমর্যাদাবোধ স্পষ্ট, অন্যদিকে তেমনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন প্রতিভাবান কবির সময়ের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে।

 

 

পরবর্তী সময়ে নজরুলের চিকিৎসা ও তাঁর পরিবারের সহায়তার জন্য একটি সাহায্য তহবিল বা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল( ‘নজরুল এইড ফান্ড’, ‘সেন্ট্রাল নজরুল এইড ফান্ড’ বা ‘নজরুল রিলিফ কমিটি’নামে পরিচিত)। ১৯৪৩ সালে গঠিত এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত নাম ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের , সভাপতি হিসেবে যুক্ত ছিল বলে বিভিন্ন দস্তাবেজে উল্লেখ পাওয়া যায়। আর সম্পাদক ছিলেন সজনীকান্ত দাস।

 

অবশ্য এই তহবিলের সঠিক নাম, গঠন প্রক্রিয়া কিংবা সাহায্য বন্ধ হওয়ার কারণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু ভিন্নমত বা বিতর্ক রয়েছে। তাই এই ইতিহাসকে কোনো একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে সংশ্লিষ্ট দলিল, তথ্য ও স্মৃতিকথার ভিত্তিতে বিচার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কবির চিকিৎসা ও আর্থিক সংকট লাঘব করার ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

 

এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের আরও একটি মহৎ শিক্ষা দেয়। মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সামাজিক পদমর্যাদা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার আচরণ ও কর্মে- বিশেষ করে অন্য কেউ ভীষণ বিপদে পড়লে তিনি কীভাবে পাশে দাঁড়ান, তার মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি ১৯৪৪ সালে ২৫ মে কলকাতার কলেজ স্কোয়ারের সভায় ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ অসুস্থ কবিকে ১০০ টাকা সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সভায় বক্তৃতা করেন কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় ও মুজিবুর রহমান খাঁ ।

 

নজরুল ছিলেন জন্মসূত্রে মুসলমান ঘরের সন্তান, আর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন হিন্দু সমাজের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। কিন্তু সেই সংকটের মুহূর্তে তাঁদের সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একজন অসুস্থ , নিঃস্ব ও বিপন্ন কবির প্রয়োজন এবং একজন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা উদারতার হাত। এই উচ্চ মানবিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই কোনো সংকীর্ণ ও নীচু সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে আবদ্ধ করে বিচার করা যায় না।

 

 

নজরুল সারা জীবন ধর্মীয় বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে কলম ধরেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে যে– ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’। তাই এই ঘটনাকে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে বরং খাঁটি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা উচিত। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একজন রাজনীতিবিদের একটি মানবিক উদ্যোগকে তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের একমাত্র মাপকাঠি বা সার্টিফিকেট হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। মহাকালের প্রতি পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার করতে হলে ব্যক্তির বহুমুখী ভূমিকা ও সময়ের বাস্তবতাকে নিরপেক্ষভাবে আলাদা করে দেখতে হয়।

 

 

সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, নজরুলের মতো একজন প্রতিভাবান ও প্রাণবন্ত কবিকে তাঁর জীবনের শেষ দীর্ঘ সময়, অচৈতন্য ও নীরবতার অন্ধকারে কাটাতে হয়েছে। তাঁর সাহিত্যিক অবদান অমর ও শাশ্বত হলেও, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্তিম সময়ের দুঃখ ও অসহায়তা আজও নজরুল প্রেমী পাঠকদের গভীরভাবে ব্যথিত করে।একজন শিল্পীর প্রতি সমাজের মূল দায়িত্ব কেবল তাঁর সৃষ্টিকর্মকে ভালোবাসা বা প্রশংসা করা নয়,বরং তাঁর চরম বিপদের দিনে পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগ সকলের কাছে সেই দায়িত্ববোধেরই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।আজকের দিনে যখন ধর্ম, জাতি ও রাজনীতির সংকীর্ণ বেড়াজালে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করা হয়, তখন নজরুল ও শ্যামাপ্রসাদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধার অধ্যায়টি নতুন করে পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের যেকোনো ঘটনাকে অন্ধভাবে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের আগে তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট অনুধাবন করা দরকার, পাশাপাশি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করাও কোথাও যেন মানবিকতায় আঘাত দিতে থাকে।

 

নজরুলের অসহায়তা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রতিভার প্রতি সম্মান শুধু মুখের কথাতে নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। আর শ্যামাপ্রসাদের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, বিপদের সময়ে আন্তরিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া একটি সাহায্যের হাত বিপন্ন মানুষের জীবনে বয়ে আনতে পারে অজস্র স্বস্তি ।কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন। তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ তখনই সম্ভব হবে, যখন তাঁদের মানবতাবাদী আদর্শকে জীবনের প্রতিটি দুয়ারে – দুয়ারে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে আমজনতা পৌঁছে দেবে, প্রতিটি কন্ঠে বেজে উঠবে প্রভাতের ভৈরবী–’মোরা এক বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু- মোসলমান’।