জুবিন গাৰ্গ: অসমকে নতুন সংগীত-পরিচয় উপহার দেওয়া কিংবদন্তি শিল্পী

ড রতন ভট্টাচাৰ্য   আধুনিক অসমের সাংস্কৃতিক জগতে এমন খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই সমানভাবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগ জেগে ওঠে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জুবিন গাৰ্গ।....

ড রতন ভট্টাচাৰ্য

 

আধুনিক অসমের সাংস্কৃতিক জগতে এমন খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই সমানভাবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগ জেগে ওঠে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জুবিন গাৰ্গ। গায়ক, সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং মঞ্চশিল্পী হিসেবে তিনি অসমীয়া সংস্কৃতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। গত তিন দশকে তিনি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অনন্য সমন্বয়ের মাধ্যমে অসমের সংগীতভুবনকে আমূল বদলে দিয়েছেন। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, নিরলস সৃজনশীলতা এবং নতুন কিছু করার সাহস অসমীয়া সংগীতকে নতুন পরিচয় দিয়েছে, যা একদিকে যেমন নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে তেমনই আধুনিক ও বিশ্বমুখী।

 

১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর অসমের যোরহাটে জুবিন গাৰ্গের জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম জুবিন বৰঠাকুৰ। সংগীত ও সাহিত্যচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠা জুবিনের পিতা মোহিনী বৰঠাকুৰ ছিলেন একজন সম্মানিত গীতিকার এবং মা বীণা বৰঠাকুৰ ছিলেন সুগায়িকা। শৈশব থেকেই তিনি সংগীতের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষাও তিনি গ্রহণ করেন, যা তাঁর সংগীতজীবনের ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে। তবে তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল তাঁর সীমা অতিক্রম করার মানসিকতা। তিনি শুধু প্রচলিত ধারাকে অনুসরণ করেননি, বরং নিজের একটি স্বতন্ত্র সংগীতভাষা গড়ে তুলেছিলেন।

 

১৯৯০-এর দশকে অসমীয়া সংগীতজগৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী সুরের জনপ্রিয়তা ছিল, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে বলিউড ও পাশ্চাত্য সংগীতের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছিল। এমন সময়ে এমন একজন শিল্পীর প্রয়োজন ছিল, যিনি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করতে পারবেন। জুবিন গাৰ্গ সেই পরিবর্তনের দূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর আবির্ভাব অসমীয়া সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
তাঁর শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং অভিনব সুরসৃষ্টির মাধ্যমে তিনি এমন এক সংগীতধারা তৈরি করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতাদের মন জয় করে নেয়। মায়াবিনী, পাখি, আশা, তুমি মোৰ মাথোঁ মোৰ প্রভৃতি গান দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই গানগুলিতে যেমন ছিল অসমের মাটি, মানুষের আবেগ এবং সাংস্কৃতিক সত্তার গভীরতা, তেমনই ছিল আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ ও সমসাময়িক সংগীতের নতুনত্ব। লোকসংগীতের সুরকে পপ, রক ও আধুনিক অর্কেস্ট্রেশনের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সংগীতধারা নির্মাণ করেন, যা সব প্রজন্মের মানুষকে আকৃষ্ট করে।

 

জুবিন গাৰ্গের অন্যতম বড় শক্তি তাঁর বিস্ময়কর বহুমুখিতা। তিনি সমান দক্ষতায় প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক সংগীত, ভক্তিমূলক গান, লোকসংগীতভিত্তিক সুর কিংবা প্রাণবন্ত নৃত্যসংগীত পরিবেশন করতে পারেন। খুব কম শিল্পীর মধ্যেই এমন বিস্তৃত প্রকাশক্ষমতা দেখা যায়। তাঁর কণ্ঠে এমন এক আবেগময় শক্তি রয়েছে, যা শ্রোতাদের অন্তর স্পর্শ করে। প্রেম, বিচ্ছেদ, আশা, হতাশা কিংবা সামাজিক বার্তাসমৃদ্ধ গানে তিনি সবসময় আন্তরিকতা ও গভীর অনুভূতির ছাপ রেখে যান।
গায়ক হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি সুরকার হিসেবেও তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর সুরগুলি স্মরণীয়, আবেগঘন এবং সৃজনশীলতার দিক থেকে সমৃদ্ধ। তিনি বিভিন্ন সংগীতধারায় নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, কিন্তু কখনও অসমীয়া সংস্কৃতির মূল ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। এর ফলে অসমীয়া সংগীতের সম্ভাবনার ক্ষেত্র বহুগুণে বিস্তৃত হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা উদ্ভাবনের সাহস পেয়েছেন।

 

তাঁর প্রভাব কেবল স্টুডিও বা অ্যালবামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লাইভ অনুষ্ঠানগুলি আজ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। অসম ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত তাঁর কনসার্টে হাজার হাজার অনুরাগী একসঙ্গে তাঁর গান গেয়ে ওঠেন। শ্রোতাদের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা তাঁকে অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পীতে পরিণত করেছে। অসংখ্য অসমীয়ার জীবনের আনন্দ, প্রেম, উৎসব ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর গান।

 

জুবিন গাৰ্গের সাফল্য শুধু অসমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তিনি ভারতীয় সংগীতজগতে এক বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, ওড়িয়া ও নেপালি-সহ বহু ভাষায় গান গেয়ে তিনি তাঁর ভাষাগত দক্ষতা ও শিল্পসত্তার বহুমাত্রিকতা প্রমাণ করেছেন। বলিউডে প্রবেশের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
চলচ্চিত্র গ্যাংস্টার-এর বিখ্যাত গান “ইয়া আলি” তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। গানটি সারা দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং কোটি কোটি শ্রোতার কাছে তাঁর কণ্ঠস্বর পৌঁছে যায়। এই গানের আবেগময় পরিবেশনা এবং সুরের গভীরতা তাঁকে বলিউডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবুও জাতীয় সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও তিনি কখনও অসমীয়া সংগীত থেকে দূরে সরে যাননি। বরং নিজের মাটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছেন এবং অসমীয়া সংস্কৃতির এক গর্বিত দূত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

 

সংগীতের পাশাপাশি অসমীয়া চলচ্চিত্র শিল্পেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিনেতা, সুরকার, গায়ক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি আঞ্চলিক চলচ্চিত্র জগতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর অংশগ্রহণের ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শক অসমীয়া চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন উদ্যমের সৃষ্টি হয়েছে।
জুবিন গাৰ্গের উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসমীয়া লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার। বিহু গান, গোয়ালপাড়ীয়া লোকসংগীত এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংগীতধারা অসমের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের অংশ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। তাই আধুনিক সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে লোকসংগীতের উপাদান যুক্ত করে তিনি এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

 

অসমের যুবসমাজের ওপর তাঁর প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বেড়ে ওঠা একটি পুরো প্রজন্মের আবেগ, স্বপ্ন, প্রেম ও সংগ্রামের ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর গান। তাঁর সাফল্য অসংখ্য তরুণ শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসেও বৃহত্তর সাফল্য অর্জন করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে।
জুবিন গাৰ্গ তাঁর নির্ভীক ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্যও পরিচিত। তিনি বারবার নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন এবং প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। কখনও কখনও তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সত্যনিষ্ঠ ও সাহসী শিল্পীসত্তাকে আরও উজ্জ্বল করেছে।

 

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করার ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম সংগীতজগতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু জুবিন গাৰ্গ নতুন সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েও তাঁর শিল্পীসত্তার মূল স্বরকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। এই বিরল ভারসাম্য তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জনপ্রিয় করে রেখেছে।
আজ জুবিন গাৰ্গকে অসমের এক সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর অবদান অসমীয়া সংগীতকে আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, আঞ্চলিক সংগীত ও চলচ্চিত্রকে নবজীবন দিয়েছেন এবং অসমীয়া সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করেছেন।

 

পরিশেষে বলা যায়, জুবিন গাৰ্গ শুধু একজন সফল গায়ক নন; তিনি এক সংগীতদ্রষ্টা, যিনি অসমের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নতুনভাবে রূপ দিয়েছেন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, লোকঐতিহ্যের সংরক্ষণ, উদ্ভাবনের সাহস এবং নিজের শিকড়ের প্রতি অবিচল আনুগত্যের মাধ্যমে তিনি অসমকে এক নতুন সংগীত-পরিচয় উপহার দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠ আজও অসমীয়া গৌরব, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার এক শক্তিশালী প্রতীক। অগণিত অনুরাগীর কাছে জুবিন গাৰ্গ কেবল একজন কিংবদন্তি শিল্পী নন, তিনি অসমের চিরন্তন কণ্ঠস্বর।

আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।