‘তিন মুসলিমের অসুবিধে আছে, বাকি ১৭ জন বিজেপিতে যাচ্ছি’! এনসিপিআই-তৃণমূলের সাংসদ জগদীশের দাবি, মিলবে মন্ত্রিত্বও

চার মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বার দল বদলাচ্ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল ছেড়ে অজ্ঞাতকুলশীল এনসিপিআই-তে গিয়েছিলেন লোকসভার ২০ জন সাংসদ। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন এ বার সরাসরি....

চার মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বার দল বদলাচ্ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল ছেড়ে অজ্ঞাতকুলশীল এনসিপিআই-তে গিয়েছিলেন লোকসভার ২০ জন সাংসদ। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন এ বার সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিতে চলেছেন। সোমবার এমনই দাবি করলেন কোচবিহারের সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া। ‘এবিপি আনন্দ’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর দাবি, ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-তে থাকা মুর্শিদাবাদের তিন সংখ্যালঘু সাংসদ বাদে বাকিরা প্রত্যেকেই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। পুজোর আগেই এই যোগদান প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে বলে দাবি তাঁর।

জগদীশ জানিয়েছেন, মুর্শিদাবাদের তিন সংখ্যালঘু সাংসদ আবু তাহের খান, খলিলুর রহমান এবং ইউসুফ পাঠান সরাসরি বিজেপিতে যোগ না-দিলেও শাসকজোট এনডিএ-কে সমর্থন করবেন। তাঁদের বিভিন্ন দফতর দেওয়া হবে বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও জগদীশের দাবি উড়িয়ে আবু তাহেরদের পাল্টা দাবি, তাঁরা তিনজন বিজেপি বা এনডিএ-তে যাবেন না। জগদীশের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, “বাসুনিয়া কী বলেছেন, তার উত্তর দেব না।” তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়া আর এক সাংসদ মথুরাপুরের বাপি হালদার বলেন, “আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না।”

সোমবার জগদীশ বলেন, “আমাদের সঙ্গে তিন জন সংখ্যালঘু সাংসদ সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করতে চাইছেন না। আমরা তিন জনকে বাদ দিয়েই ১৭ জন বিজেপিতে যোগ দেব। আমাদের পরিকল্পনা তৈরি আছে। বাকি তিনজনকে বিভিন্ন দফতর (মন্ত্রক) দেওয়া হবে। তাঁরাও এনডিএ-কে সমর্থন করবেন। এনডিএ-র সঙ্গে থাকবেন। কিন্তু সরাসরি বিজেপিতে যাবেন না।

 

আবু তাহেরদের সরাসরি বিজেপিতে যোগ না-দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জগদীশের সংযোজন, “তাঁদের এলাকা সংখ্যালঘু প্রধান। কিছু সমস্যা আছে। তবে তাঁরা এনডিএ-র সমর্থক থাকবেন। এনডিএ-র হয়ে কাজ করবেন। আমরা এখন এনসিপিআই। এনসিপিআই-এর ২০ থেকে ১৪ জন গেলেই হবে। তিন ভাগ। ২০-র দুই-তৃতীয়াংশ। সাড়ে ১৩ হলেই হয়। আমাদের সঙ্গে ১৭ জন রয়েছেন। ফলে দলবিরোধী আইনে পড়ব না। হয়তো পুজোর আগে-পরেই হবে (বিজেপিতে যোগদান)।”

জগদীশের দাবি, তাঁরা তৃণমূল থেকে সরাসরি বিজেপিতেই যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিন সংখ্যালঘু সাংসদ সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিতে না-চাওয়ায় ‘একটু সমস্যা’ হয়। তার পর বিজেপি নেতাদের উদ্যোগেই এনসিপিআই-এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি কোচবিহারের সাংসদের। তিনি বলেন, “মাননীয় অমিত শাহের নেতৃত্বে আমরা ২০ জন সাংসদ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বিজেপিতে যোগ দিতে গিয়ে একটু সমস্যা হল। কারণ আমাদের সঙ্গে তিনজন সংখ্যালঘু সাংসদ ছিলেন। তাঁরা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিতে চাইছিলেন না। তখন আমাদের দিল্লির নেতারা, শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে বাকি সবাই এনসিপিআই-এর সঙ্গে আমাদের মার্জার (মিশিয়ে) করিয়ে দেন।’’

একই সঙ্গে জগদীশ বলেন, “এনসিপিআই আনরেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি (অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল)। রেজিস্টার্ড কিন্তু আনরেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি (নথিভুক্ত কিন্তু অস্বীকৃত দল)। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। স্পিকারের কাছেও তিনি আবেদন করেন। সেই প্রক্রিয়া চলছে। হয়তো পুজোর আগেই শেষ হয়ে যাবে।”

জগদীশের দাবি প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের বলেন, “আমি জগদীশ বসুনিয়াকে আমার ভবিষ্যৎ কর্মসূচি কী হবে বা না হবে, তার দায়িত্ব দিইনি। জগদীশ বসুনিয়া যা বলেছেন, এটা তাঁর ব্যক্তিগত মত। তার সঙ্গে আমরা সহমত নই। আমরা বিজেপিতে যাব না। এনডিএ-তেও যাব না। এটা পরিষ্কার। আমরা তিন সাংসদ বার বার বলেছি, আমরা বিজেপিতে যাব না, এনডিএ-তে যাব না।” একই সঙ্গে আবু তাহের বলেন, “উন্নয়নের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী কিংবা মুখ্যমন্ত্রী যদি সরকারি বৈঠকে ডাকেন, আমরা যাব। তাই বলে বিজেপি বা এনডিএ-র বৈঠকে যাব না।” প্রসঙ্গত, বিজেপি বা এনডিএ-তে যোগদান না-করার বিষয়ে আগেও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন মুর্শিদাবাদ জেলার তিন সাংসদ আবু তাহের, খলিলুর এবং ইউসুফ। সংসদের বাদল অধিবেশন চলার সময় এনডিএ-র ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকেও গরহাজির ছিলেন এই তিনজন।

যে দলে যোগ দিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন জগদীশ, সেই দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে বলেন, “যে কেউ যখন তখন বিজেপিতে যোগদান করতে চাইবেন, আর তাকে বিজেপি নিয়ে নেবে, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে কী হয়েছিল, তা ভুললে চলবে না। তাই আজ কেউ বিজেপিতে যোগদান করতে চাইবেন, আর বিজেপি তাঁকে নিয়ে নেবে, এটা হবে না।” একই সঙ্গে কটাক্ষের সুরে তাঁর সংযোজন, “আর যে বিজেপিতে ওঁরা যোগদান করতে চাইছেন, সেটা হয়তো মঙ্গল গ্রহের বিজেপি।”

প্রসঙ্গত, জগদীশ, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার-সহ এই ২০ জন এনসিপিআই-এর সাংসদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। লোকসভার নথি অনুযায়ী, তাঁরা এখনও তৃণমূলেরই সাংসদ!

২০ জন ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূল সাংসদের সাংসদপদ খারিজের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি হোক— এই আর্জি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে দাখিল করা এই সংক্রান্ত আবেদনের নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেছিলেন তিনি। লোকসভার স্পিকার এবং সেক্রেটারি জেনারেলের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন ফাইল করেন অভিষেক। গত ২৫ অগস্ট অভিষেকের করা সেই মামলার প্রেক্ষিতে এনসিপিআই-এর ২০ জন সাংসদকেই নোটিস দেয় শীর্ষ আদালত।

তার পর রাতারাতি তৃণমূল থেকে এনসিপিআই হয়ে যাওয়া ২০ জন সাংসদকেই নোটিস পাঠিয়েছিল লোকসভার স্পিকারের সচিবালয়। গত ২৬ অগস্ট পাঠানো সেই নোটিসে ২০ জনকেই সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। সেই সময়সীমা গত ১ সেপ্টেম্বর শেষ হত। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে জবাব ওয়ার বদলে ২০ জনই লোকসভার স্পিকারের সচিবালয়ের কাছে তিন সপ্তাহ বাড়তি সময় চান। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছিল। সেই আর্জি মেনে নেন স্পিকার ওম বিড়লা।