কানাই দাস
প্রত্যেক বছর অক্টোবর মাস এলেই সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার নিয়ে সকলের মনে একটা অন্যরকম কৌতূহল তৈরি হয়। কে পাবেন এ বছরের নোবেল? কোন লেখকের নাম এবার উঠে আসবে সুইডিশ অ্যাকাডেমির ঘোষণায় ? সাহিত্যের ছাত্র, শিক্ষক, সাহিত্য প্রেমী কিংবা গবেষকদের মতো আমার মনেও তখন একটা ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব তৈরি হয় আর কি । নানা নাম নিয়ে আলোচনা হয়, নানা সম্ভাবনা সামনে আসে। কেউ আগে থেকেই সম্ভাব্য বিজয়ী, কেউ দীর্ঘদিনের দাবিদার, আবার কেউ হঠাৎ আলোচনায় চলে আসেন।
এইসব নামের ভিড়ের মধ্যে দেড় দশক ধরে একটি নাম বিশ্বকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে-জেরাল্ড মারনেন,(জন্ম ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯)।
এই মুহূর্তে ভদ্রলোকের বয়স এখন প্রায় সাতাশি বছর ছুঁই ছুঁই। এতদিন ধরে লিখছেন, অথচ পৃথিবীর সাহিত্যের বড় আলোচনায় তাঁর নাম যতটা থাকার কথা, ততটা নেই। তাই অক্টোবর এলেই মনে হয়—এবার না হয় জেরাল্ড মারনেনকে নোবেল দিয়ে দেওয়া যাক!
জেরাল্ড মারনেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তাঁর নামই শুনিনি, এমনকি সাহিত্যের ছাত্রদের মধ্যেও তাঁর পরিচিতি খুব বেশি নয়। অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যের নানা পাঠক্রমে তাঁর লেখা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা, সমালোচনা ততটা চোখে পড়েনা ।অথচ তাঁর The Plains, Inland কিংবা Velvet Waters-এর মতো সাহিত্যকর্ম আধুনিক সাহিত্যে কতজন লেখক সৃষ্টি করতে পেরেছেন, সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।
তবে মারনেনের এই অখ্যাত থাকার পেছনে তাঁর নিজের ভূমিকাও কম নয়, বরং বলা যায়, তিনি নিজেই যেন সারাজীবন নিজেকে প্রচারের বাইরে রেখেছেন। মারনান সাহিত্যিক পরিচিতির প্রচলিত পথের মানুষ নন। নিজেকে সামনে আনা, সাক্ষাৎকার দেওয়া, সাহিত্যিক আড্ডায় নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া কিংবা প্রচারের আলোয় থাকার কোনো বিশেষ আগ্রহ তাঁর ছিল না।
দীর্ঘ জীবনে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যাননি, ফলস্বরূপ কোনোদিন বিমানেও চড়েননি। অস্ট্রেলিয়ার , কোবার্ক,ভিক্টোরিয়া প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেই জীবন কাটিয়েছেন। লিখেছেন, চাষবাস করেছেন, সোনালী ফসল ফলিয়েছেন, গলফ খেলেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সীমিত। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা ল্যাপটপের মতো জিনিস তাঁর জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেনি। হাতে চালানো একটি পুরনো টাইপরাইটার ব্যবহার করেই তিনি তাঁর সাহিত্য লিখে গেছেন।আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই জীবনযাপন যেন প্রায় অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অসাধারণ।
আজ একজন লেখক নিজের নতুন বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন। পাঠকের প্রতিক্রিয়া, বইয়ের বিক্রি, পুরস্কারের সম্ভাবনা-সবকিছুই মুহূর্তে পৃথিবীর সামনে চলে আসে। লেখকের সাহিত্যিক উপস্থিতির সঙ্গে তাঁর দৃশ্যমান উপস্থিতিও যেন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই সময়ে জেরাল্ড মারনেন সম্পূর্ণ অন্যরকম।
তিনি যেন বলতে চেয়েছেন-লেখককে দেখা জরুরি নয়, তাঁর লেখা পড়াই যথেষ্ট।
আর সেই লেখার জগতও অত্যন্ত নিজস্ব , যার একান্ত আপনজন লেখক নিজেই। মারনেনের সাহিত্যে অস্ট্রেলিয়ার ভূমি, স্থান, প্রকৃতি, মানুষের স্মৃতি এবং পরিচয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তাঁর কাছে স্থান শুধু গল্পের পটভূমি নয়, স্থান নিজেই যেন গল্পের একটি চরিত্র। একটি দেশ কীভাবে তার মানুষের চিন্তা, স্মৃতি ও পরিচয়কে তৈরি করে, তাঁর লেখায় সেই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।
সাহিত্যে ‘স্থানের গুরুত্ব’ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মারনেনের লেখা পাঠকের কাছে তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। আজ যে বিষয়কে আমরানানা তাত্ত্বিক ভাষায় ‘spatial humanities’ বা স্থানকেন্দ্রিক মানববিদ্যার আলোচনায় দেখতে পাই, মারনেন তাঁর সাহিত্যিক কল্পনায় সেই স্থান, মানুষ ও ইতিহাসের সম্পর্ককে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন।
একজন মানুষের টান তার মাটির সঙ্গে কতটা যুক্ত? একটি ভূখণ্ড কি শুধু মানচিত্রের একটি অংশ? নাকি সেই ভূখণ্ড মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, পরিচয় এবং স্বপ্নেরও অংশ? যা বিশ্ব সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করে। মারনেনের সাহিত্য এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। বরং পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
এই কারণেই তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে শুধু অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্য নয়। এটি মানুষ এবং তার স্থানকে বোঝারও সাহিত্য।
কয়েক বছর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একজন বুক রিভিউয়ার তাঁকে নিয়ে অত্যন্ত প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছিলেন। তাঁকে এমন একজন ‘greatest living English-language writer’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যাঁর কথা অধিকাংশ মানুষই শোনেনি। মন্তব্যটি পড়লে একদিকে যেমন মারনেনের সাহিত্যিক ক্ষমতার প্রশংসা চোখে পড়ে, অন্যদিকে ডিজিটাল যুগের সময়ের একটি অদ্ভুত বাস্তবতাও সামনে আসে-একজন বড় লেখক হয়েও একজন লেখক কীভাবে এতটা অদৃশ্য থেকে যেতে পারেন!সম্ভবত এর উত্তর রয়েছে মারনেনের নিজের জীবনেই ।
তিনি নিজেকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেননি। তিনি নিজের লেখাকে সামনে রেখেছেন, নিজেকে নয়।
এই জায়গাতেই তিনি প্রকৃত অর্থে একজন ‘লিটারারি আউটসাইডার’। সাহিত্যের মূল স্রোতের বাইরে থেকেও কীভাবে নিজের একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন তৈরি করা যায়, মারনেন তার এক অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর প্রতি পাঠকের আর একটি কারণে আলাদা টান আছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, পৃথিবীকে জানতে হলে সবসময় পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও নিজের চারপাশটাকে গভীরভাবে দেখাও পৃথিবীকে জানার একটি উৎকৃষ্ট পথ হতে পারে।আমরা দূরের দেশ দেখতে চাই, অচেনা শহরে যেতে চাই, পৃথিবীর নানা প্রান্তের ছবি তুলতে চাই। আর জেরাল্ড মারনেন নিজের পরিচিত ভূখণ্ডের মধ্যেই এমন এক বিশাল পৃথিবী আবিষ্কার করেছেন, যা পাঠকের কাছে অচেনা হয়েও গভীরভাবে সত্যি হয়ে ওঠে।
তাই সাহিত্যের নোবেল নিয়ে যখনই অক্টোবরের জল্পনা শুরু হয়, পাঠকের মনে জেরাল্ড মারনেনের নামটি ফিরে আসে।
এবারও আসছে।
সাহিত্যের গবেষক ছাত্র হিসেবে আমিও চাই, এবার অন্তত তাঁর নামটি নোবেল পুরস্কারের ঘোষণায় থাকুক। তিনি নোবেল পাওয়ার যোগ্য কি না, তার চূড়ান্ত বিচার অবশ্যই নোবেল কমিটির। কিন্তু তাঁর মতো একজন লেখকের সাহিত্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়াও জরুরি। কারণ পুরস্কার কখনও কখনও শুধু একজন লেখককে সম্মানিত করে না, পাঠকের চোখের সামনে একটি বিস্মৃত বা অল্পপরিচিত সাহিত্যভুবনের দরজাও খুলে দেয়।
আর মারনেন নোবেল পেলে তাঁর ক্ষেত্রে একটি বাড়তি আনন্দের সম্ভাবনাও আছে।
যে মানুষটি সারাজীবন অস্ট্রেলিয়ার বাইরে গেলেন না, কোনোদিন বিমানে চড়লেন না, তাঁকেই হয়তো পুরস্কার নিতে যেতে হবে অন্য দেশে!
ভাবতেই ভালো লাগে-ভিক্টোরিয়ার সেই প্রত্যন্ত গ্রামের লেখক, হাতে টাইপরাইটার নিয়ে যিনি এতদিন নিজের পৃথিবী লিখে গেছেন, তিনি একদিন বিমানে চড়ে নোবেল নিতে যাচ্ছেন।
তাই নোবেল কমিটির কাছে একটি ছোট্ট অনুরোধ– জেরাল্ড মারনেনকে যদি এবার নোবেল দেন, তাহলে শুধু পুরস্কার দিয়ে থেমে থাকবেন না। একবার তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে নিয়ে আসুন। একবার বিমানে চড়ান।
যে মানুষটি নিজের গ্রামের বাইরে না বেরিয়েও সাহিত্যের ভিতর দিয়ে পৃথিবীকে এতটা দেখিয়েছেন, তাঁর নিজের পৃথিবীটাকেও এবার একটু আকাশ থেকে দেখানো হোক।
নোবেল পাক জেরাল্ড মারনেন।আর তাঁর আকাশযাত্রাও শুভ হোক।