ড. রতন ভট্টাচার্য
বাংলা চলচ্চিত্রে অনেক নায়িকা এসেছেন, অনেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন, কেউ কেউ কিংবদন্তিও হয়েছেন; কিন্তু সুচিত্রা সেনের স্থানটি অন্যরকম। তিনি শুধু একজন সফল অভিনেত্রী নন, বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকাকে তিনি এক নতুন সাংস্কৃতিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর আগে নায়িকার সৌন্দর্য ছিল আকর্ষণের প্রধান উপাদান; সুচিত্রার হাতে সেই সৌন্দর্য হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিত্বের ভাষা। তাঁর আগে প্রেমের গল্পে নায়িকা অনেক সময় নায়কের আবেগের পরিপূরক ছিলেন; সুচিত্রার অভিনয়ে নারী নিজেই হয়ে উঠলেন আকাঙ্ক্ষা, সিদ্ধান্ত, অভিমান, আত্মমর্যাদা এবং আত্মত্যাগের স্বতন্ত্র কেন্দ্র। এই কারণেই তাঁকে শুধু ‘মহানায়িকা’ বলা যথেষ্ট নয়—তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের নারী-অভিনয়ের এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
সুচিত্রা সেনের তারকাখ্যাতি যতটা প্রবল, তাঁর অভিনয়-পরিসরও ততটাই বিস্তৃত। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর হাস্যরসাত্মক রোমোলার স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র প্রেম ও সামাজিক বিধিনিষেধ, ‘হারানো সুর’-এর স্মৃতি ও পরিচয়ের সংকট, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মানসিক জটিলতা, ‘সপ্তপদী’-র ধর্ম ও প্রেমের দ্বন্দ্ব, ‘সাত পাকে বাঁধা’-র দাম্পত্য ও আত্মমর্যাদা, ‘উত্তর ফাল্গুনী’-র বহুসত্তার নারী, ‘দেবী চৌধুরাণী’-র সংগ্রামী প্রফুল্ল, ‘দত্তা’-র আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বিজয়া এবং ‘আঁধি’-র জনজীবনে সক্রিয় আরতি দেবী—এই দীর্ঘ পরিসর প্রমাণ করে, সুচিত্রা সেনকে একমাত্র ‘রোমান্টিক নায়িকা’ বলে চিহ্নিত করা তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি সুবিচার নয়।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংযম। তিনি আবেগকে চিৎকারে প্রকাশ করতেন না; অনেক সময় একটি দৃষ্টি, ঠোঁটের সামান্য কম্পন, মুখের ক্ষীণ পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘ নীরবতাই তাঁর হয়ে কথা বলত। এই ‘নীরব অভিনয়’ ছিল তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষর। ফলে তাঁর অভিনয়ে দর্শক শুধু সংলাপ শুনত না, চরিত্রের অন্তর্জগতও অনুভব করত। তাঁর মুখ যেন আবেগের একটি সূক্ষ্ম পর্দা—যেখানে প্রেম, বেদনা, প্রত্যাখ্যান, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মসম্মান একই সঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠত।
এই অভিনয়শক্তির প্রথম বড় বিস্ফোরণ ঘটে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর জুটিতে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় রোমান্টিক কমেডির এক নতুন পর্বের সূচনা করে। এরপর ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘পথে হলো দেরি’, ‘সূর্যতোরণ’ প্রভৃতি ছবিতে তাঁদের যুগল উপস্থিতি বাঙালির প্রেমের কল্পনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার ভিতরেও সুচিত্রা কখনও শুধুই নায়কের সহচরী হয়ে থাকেননি; তাঁর চরিত্রগুলির নিজস্ব আবেগ ও সিদ্ধান্ত ছিল।
‘চাওয়া-পাওয়া’-য় তাঁর অভিনয়ে যে হালকা রসিকতা ও প্রাণবন্ততা দেখা যায়, তার সঙ্গে ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর রাধার তুলনা করলে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার বিস্তার স্পষ্ট হয়। একদিকে হাস্যরস ও রোমান্টিক স্বচ্ছন্দতা, অন্যদিকে পেশাগত কর্তব্য ও ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীর সংঘাত—একই অভিনেত্রী কীভাবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ নির্মাণ করতে পারেন, সুচিত্রা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
‘হারানো সুর’-এ স্মৃতিভ্রংশের কাহিনির মধ্যে তিনি পরিচয় ও সম্পর্কের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেন। এখানে তাঁর অভিনয়ের শক্তি ছিল মানসিক অবস্থার সূক্ষ্ম পরিবর্তনে। ‘সপ্তপদী’-তে রিনা ব্রাউন চরিত্রে এসে সেই অভিনয় আরও পরিণত হয়। ধর্মীয় পরিচয়, প্রেম, সামাজিক বাধা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে রিনা কোনো অসহায় প্রেমিকা নয়; সে নিজের সিদ্ধান্তের দায় বহনকারী এক স্বাধীন নারী। সুচিত্রা চরিত্রটিকে আবেগের সীমা অতিক্রম করে মানবিক মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।
‘সাত পাকে বাঁধা’-য় তাঁর অভিনয়ের কেন্দ্রে আসে দাম্পত্য ও নারীর আত্মপরিচয়। অর্চনা চরিত্রে তিনি দেখিয়েছিলেন, বিবাহিত জীবন একজন নারীর সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে নিতে পারে না। ব্যক্তিগত সম্মান ও স্বাধীনতার প্রশ্নও তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ছবির জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমঞ্চে তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি তাঁর অভিনয়ের গভীরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
‘উত্তর ফাল্গুনী’ সুচিত্রার অভিনয়-জীবনের আরেকটি অনন্য অধ্যায়। এখানে এক নারীর জীবনের বিভিন্ন পরিচয়, মাতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে তিনি বহুমাত্রিক চরিত্র নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে একই কাহিনি হিন্দিতে ‘মমতা’ নামে নির্মিত হলেও সুচিত্রার চরিত্রায়ণের শক্তি তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। একই শিল্পীর হাতে একটি চরিত্রের ভিন্ন বয়স, ভিন্ন সামাজিক পরিচয় এবং ভিন্ন মানসিক স্তর বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা তাঁর অভিনয়-দক্ষতার বড় প্রমাণ।
শরৎচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য থেকে নির্মিত চরিত্রগুলিতেও সুচিত্রা তাঁর স্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছেন। ‘দেবদাস’-এ পার্বতী, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-এ রাজলক্ষ্মী, ‘গৃহদাহ’-এ অচলা, ‘দত্তা’-য় বিজয়া এবং ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে প্রফুল্ল—এই চরিত্রগুলি একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সাহিত্যিক চরিত্রকে পর্দায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিনেত্রীর নিজস্ব তারকা-ইমেজ অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সুচিত্রা সেই ইমেজকে অনেক ক্ষেত্রেই চরিত্রের অন্তর্গত আবেগের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন।
‘দেবী চৌধুরাণী’-তে তাঁর অভিনয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে প্রেমের নায়িকার পরিচয় ছাপিয়ে উঠে আসে সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। আর ‘দত্তা’-য় দেখা যায় সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নারীর আত্মমর্যাদার অবস্থান। এই চরিত্রগুলি প্রমাণ করে, সুচিত্রার অভিনয় শুধু সৌন্দর্য ও রোমান্টিকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না।
হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতিও তাঁর শিল্পীসত্তাকে সর্বভারতীয় মাত্রা দেয়। ‘দেবদাস’-এর পার্বতী, ‘মমতা’-র দ্বৈত আবেগময় চরিত্র এবং সর্বোপরি ‘আঁধি’-র আরতি দেবী—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি বাংলা তারকার প্রচলিত পরিচয় অতিক্রম করেন। ‘আঁধি’-তে একজন পরিণত নারী, যিনি জনজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের দ্বন্দ্বে অবস্থান করছেন, তাঁর চরিত্রায়ণে সুচিত্রার অভিনয় একেবারে অন্য স্বর পায়। তাঁর চলন, পোশাক, কণ্ঠস্বর, সংলাপের গতি—সবকিছু মিলিয়ে তিনি আরতি দেবীকে একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে পরিণত করেন।
সুচিত্রার তারকা-ব্যক্তিত্বের আরেকটি রহস্য ছিল তাঁর অনুপস্থিতি। চলচ্চিত্রজীবন থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি জনসমক্ষে নিজেকে প্রায় সম্পূর্ণ আড়াল করে নেন। আজকের প্রচারনির্ভর তারকা-সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি যেন ঘোষণা করেছিলেন—শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন নয়, তাঁর শিল্পই শেষ পর্যন্ত কথা বলুক। ফলে তাঁর নীরবতাও তাঁর কিংবদন্তির অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’-র পর চলচ্চিত্র থেকে তাঁর অবসর এবং ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁর প্রয়াণ তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে, কিন্তু তাঁর সাংস্কৃতিক উপস্থিতির নয়। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর চলচ্চিত্রের পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা তত বেড়েছে।
সুচিত্রা সেনকে তাই নস্টালজিয়ার কাচের বাক্সে বন্দি করে রাখলে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে না। তাঁকে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র-দৃষ্টিতে পুনরায় দেখতে হবে—অভিনয়ের কৌশল, নারীচরিত্র নির্মাণ, নীরবতার ব্যবহার, তারকা-ইমেজ এবং সাহিত্যিক চরিত্রের রূপান্তরের দৃষ্টিকোণ থেকে। তখন স্পষ্ট হবে, তিনি শুধু তাঁর সময়ের জনপ্রিয়তম নায়িকা ছিলেন না; তিনি সেই সময়ের অভিনয়ভাষাকে বদলে দেওয়া এক শক্তিশালী শিল্পী।
বাঙালির কাছে তাই সুচিত্রা সেন শুধু একটি নাম নয়—একটি অনুভূতি, একটি যুগের নন্দনবোধ, একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি। তাঁর চোখে বাঙালি প্রেম দেখেছে, তাঁর নীরবতায় বেদনা শুনেছে, তাঁর চরিত্রে আত্মমর্যাদার শক্তি অনুভব করেছে। উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর রসায়ন কিংবদন্তি হয়ে আছে, কিন্তু সেই কিংবদন্তির বাইরেও সুচিত্রা সেনের নিজস্ব শিল্পীসত্তা অম্লান।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্র বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে। কিন্তু সত্যিকারের অভিনয় সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। সুচিত্রা সেনের অভিনয় সেই বিরল সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। তাই তিনি শুধু মহানায়িকা নন—তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের স্মৃতিতে এক অনিবার্য উপস্থিতি। তাঁকে ভোলা যায় না, কারণ তাঁর অভিনয় শেষ পর্যন্ত আমাদেরই কোনো না কোনো অনুভূতির মুখ হয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।
ই-মেল: profratanbhattacharjee@gmail.com