সংস্কৃতি ও সাহিত্যে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান: বঞ্চনা থেকে আত্মমর্যাদার সন্ধান

ফারুক আহমেদ পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান। অথচ শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব হতাশাজনক। সরকারি সাহিত্য একাডেমি থেদকে বাংলা একাডেমি পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতি....

ফারুক আহমেদ

পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান। অথচ শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব হতাশাজনক। সরকারি সাহিত্য একাডেমি থেদকে বাংলা একাডেমি পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে।

অথচ ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মুঘল যুগ পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের অবদান অনস্বীকার্য। দোভাষী সাহিত্য, প্রণয়োপাখ্যান, সুফি ও বাউল ধারায় হিন্দু-মুসলমান মিলনের যে সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়েছিল, তা বাংলার নিজস্ব সম্পদ। গৌড়ের আদিনা মসজিদ থেকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজের শায়রি—স্থাপত্য ও লোকজীবনের প্রতিটি স্তরে মুসলমানদের ছাপ স্পষ্ট। ঈদ, মুহররম আজও মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সমস্যার শুরু উনিশ শতকে। ১৭৫৭-পরবর্তী দেড়শো বছর ছিল বাংলার মুসলমানদের জন্য অন্ধকার কাল। মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে তাদের অংশীদারি ছিল না। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়ে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মপ্রতিষ্ঠার একটি পর্ব শুরু হলেও দেশভাগ সেই প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দেয়। বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।

বিভাগ-পরবর্তী সময়ে হুমায়ুন কবির, কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু সয়ীদ আইয়ুব ও রেজাউল করিম বাঙালি মুসলমানের মেধা ও মননের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘কম্পোজিট কালচার’-এর প্রতীক হয়ে ওঠেন। আবদুল আজীজ আল আমান ‘হরফ প্রকাশনী’র মাধ্যমে সাহিত্য চর্চায় অভিভাবকের ভূমিকা নেন। আবদুল জব্বার তুলে ধরেন গ্রামবাংলার খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন।

তবু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। মুসলমানদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ অনুপস্থিত। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে অফুরন্ত অবদান রাখার পরও প্রান্তিকতাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসবেত্তা খাজিম আহমেদ তাঁর ‘পশ্চিমবাঙলার বাঙালি মুসলমান: অন্তবিহীন সমস্যা’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তো দূরের কথা, ‘কওম’-গত আন্তরিক উদ্যোগও লক্ষ করা যায় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—একটি জাতিসত্তা কেন এত উপেক্ষিত, শিক্ষায় অনগ্রসর, কেন এত দরিদ্র? মুসলমান বুদ্ধিজীবী সমাজ কেন স্ব-সম্প্রদায়ের সমস্যার স্বরূপ উদঘাটনে আগ্রহী নন?

খাজিম আহমেদ মনে করিয়ে দেন, সঠিক ইতিহাস রচনা করতে গেলে কোনো পক্ষ বা মতবাদের প্রতি আনুগত্য চলে না। তাঁর মতে, শুধু মুসলমানদের নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা আত্মঘাতী। বরং মিশ্র সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতেই বাঁচতে হবে।

আজ প্রয়োজন তিনটি জিনিস: এক, বাঙালি মুসলমানের জন্য সরকারি একাডেমি ও গবেষণা কেন্দ্র। দুই, যাঁরা সাহিত্য-সংস্কৃতি সাধনায় মগ্ন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। তিন, উদ্যোগপতি ও সমাজকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

স্বাধীনতার সাত দশক পরেও আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা মূল স্রোতে উঠে আসতে পারেনি। কিছু মিশন স্কুলের ভূমিকা আশা জাগালেও সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি।

হাজী মুহম্মদ মোহসীন, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী থেকে হুমায়ুন কবির—এই মনীষীদের পথ ধরেই বাঙালি মুসলমানকে আপন ভুবনের সন্ধান করতে হবে। গুরুবাদ, অদৃষ্টবাদ আর অবতারবাদের অন্ধতার মধ্যে সেক্যুলারিজমের চর্চা সম্ভব নয়। ইউরোপীয় ধারণায় সেক্যুলারিজম মানে রাষ্ট্রের ধর্মহীনতা। আমাদের দেশে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে সব ধর্মকে তোষণের নীতি।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের জন্য নতুন সূর্য উঠুক। রক্তের দাগ মুছে ফেলে কম্পোজিট কালচারের পথেই এগোতে হবে। কারণ দেশ গঠনে মুসলমানরাও যে অবদান রাখতে পারে, সে সত্য প্রতিষ্ঠা করাই আজকের দাবি।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের অবদান অপরিসীম। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা সাহিত্য পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মুসলিম লেখকের নাম ও তাঁদের অবদানের তালিকা দেওয়া হলো:

মধ্যযুগ:
শাহ মুহম্মদ সগীর: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম কবি। তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘ইউসুফ-জোলেখা’।

আলাওল: সপ্তদশ শতকের শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘পদ্মাবতী’।

আবদুল হাকিম: মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য তিনি স্মরণীয় (যাঁহা সবিশেষে… দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি)।

উনিশ শতক ও আধুনিক যুগের সূচনা:

মীর মশাররফ হোসেন: বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’।

কায়কোবাদ: মহাকাব্য রচয়িতা। তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’।

বিশ শতক ও রেনেসাঁ:

কাজী নজরুল ইসলাম: বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’। প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের মেলবন্ধনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত ও নারীবাদী সাহিত্যিক। তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘সুলতানাস ড্রিম’ (Sultana’s Dream) এবং ‘অবরোধবাসিনী’।

ফররুখ আহমদ: ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক ও আধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’।

গোলাম মোস্তফা: বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিশ্বনবী’।

সমকালীন ও উত্তর-আধুনিক সাহিত্য:

শওকত ওসমান: কথাসাহিত্যিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘জননী’ ও ‘ক্রীতদাসের হাসি’।

শওকত আলী: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’।

আবু ইসহাক: ঔপন্যাসিক। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক উদার আকাশ।