মজিবুর রহমান
একটা কথা প্রায়ই বলা হয়– “শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব মুক্তি ঘটায়।” কিন্তু সুবিধাপ্রাপ্তদের (প্রিভিলেজড) কাছে সাধারণ মানুষের মুক্তি কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। কারণ, সাধারণ মানুষের চেতনার উন্মেষে সুবিধাপ্রাপ্তরা সমস্যায় পড়ে। শিক্ষিত মানুষের চাহিদা বেশি। অশিক্ষিত মানুষ অল্পেই সন্তুষ্ট। তাই শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে সদর্থক ভূমিকা পালন করার ব্যাপারে সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে একটা অনাগ্ৰহ কাজ করে। তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে চেষ্টা করে। চেষ্টা করে পাঠক্রমকে নিজেদের ভাবানুসারী করে সাজাতে। পাঠক্রমে অবৈজ্ঞানিক, অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, সেকেলে চিন্তাভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা করে। আর, চেষ্টা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ, খবরদারি ও দখলদারিত্ব কায়েম করতে। উল্লেখ্য, বিত্তশালী ও শাসক শ্রেণীর লোকেদেরই মূলত সুবিধাপ্রাপ্ত বলে ধরা হয়।
শিক্ষার প্রতি সরকার বা শাসকের মনোভাব বোঝাতে রুশ মনীষী লিও টলস্টয় (১৮২৮-১৯১০) বলেছেন,”জনগণের অজ্ঞতার মধ্যে সরকারের ক্ষমতা নিহিত রয়েছে। সরকার সেটা জানে এবং সেজন্য সে জ্ঞানচর্চার বিরোধিতা করে।” সত্যজিৎ রায়ের (১৯২১-১৯৯২) ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে রাজার নির্দেশে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বইপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কারণ, রাজার আশঙ্কা ছিল–“ওরা (প্রজারা) যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।” তাই মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য রাজার পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়–“লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে।”
ব্রিটিশ সরকার সরকারি কাজকর্ম পরিচালনা করার জন্য ভারতীয়দের যতটুকু লেখাপড়া শেখানোর দরকার ছিল সেটুকুর ব্যবস্থাই করেছিল। সেজন্য ব্রিটিশদের প্রায় দুশো বছরের শাসন শেষে ভারতে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। স্বাধীন ভারতের বয়স আশি বছর হয়ে গেল। কিন্তু সাক্ষরতার হার ৮০ শতাংশও হয়নি! অনেক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। ভালো ভালো সুপারিশ জমা পড়েছে। কিন্তু সেগুলোকে ভালো ভাবে কার্যকর করা হয়নি। শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্দ যতটা হওয়া উচিত তা কখনও করা হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্ৰহণ করা হয়নি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারতে উল্টোটা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে প্রায় ৯৪ হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ বা একীভূত (মার্জড) হয়েছে। গড়ে দৈনিক ২৫টি স্কুলের এই পরিণতি ঘটেছে। প্রথম শ্রেণিতে যতজন পড়ুয়া ভর্তি হয় তার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মাধ্যমিকের আঙ্গিনায় পৌঁছায় না। শেষ পর্যন্ত স্নাতক হয় ১০ শতাংশের মতো। পশ্চিমবঙ্গেও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে। নতুন স্কুল খোলার বদলে প্রতি বছর কিছু স্কুল শিক্ষার্থীর অভাবে উঠে যাচ্ছে। পূর্বোক্ত ৯৪ হাজারের মধ্যে এরাজ্যের স্কুল রয়েছে ৮ হাজার। সরকারি স্কুল ছেড়ে বেসরকারি স্কুলে পড়ুয়া ভর্তির প্রবণতা বাড়ছে। স্কুল শিক্ষার সংকোচন ও মানের অবনমন উচ্চ শিক্ষার ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইদানিং কলেজ ইউনিভার্সিটির আসন সংখ্যা পূরণ হচ্ছে না। যাদের পড়াশোনা করার কথা তারা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। আসলে কেন্দ্রীয় এবং অধিকাংশ রাজ্য সরকারের শিক্ষানীতির অন্যতম অভিমুখ হল শিক্ষার বেসরকারিকরণ এবং সস্তা শ্রমিক সৃষ্টি করা। সেজন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
পড়ুয়াদের জন্য প্রকল্প রয়েছে; কিন্তু পড়াশোনার পরিবেশ নেই। শিক্ষা বহির্ভূত কাজ বেড়েই চলেছে। স্কুলগুলো সরকারি প্রকল্প রূপায়ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ওই সব করে দিন কাটছে। এডমিশান, রেজিস্ট্রেশন, এগজামিনেশ হলেই হল! এডুকেশন বাদ থাকলে থাক! এই পরিস্থিতি। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি কোথাও পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী নেই। এখন চাকরিতে জয়েন করার চেয়ে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপারে সব জায়গাতেই জট পাকিয়ে রাখা হয়েছে। সময় এগিয়ে চলে, সরকার বদল হয় কিন্তু জট খোলে না। আন্দোলন অব্যাহত থাকে। আদালতের আঙ্গিনায় কোনো সমাধান পাওয়া যায় না।
বর্তমান রাজ্য সরকার আগের সরকারের মতোই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব কায়েম করতে চাইছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সমিতি গঠন বন্ধ হয়ে রয়েছে। ইউনিভার্সিটির স্বশাসনের অধিকারকে খর্ব করা হচ্ছে। মুক্তচিন্তার চর্চার ঐতিহ্য বহনকারী ও পড়াশোনায় উচ্চ গুণমান সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করা হচ্ছে। বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে নজিরবিহীন ভাবে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের বদলি করার সংস্থান রেখে বিল পাস করা হয়েছে। বার্তা স্পষ্ট, সরকার বা শাসকদলের বিরোধিতা করা চলবে না; করলে শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের পানিশমেন্ট ট্রান্সফার পেতে হবে।
শাসকদলের সাংসদ-বিধায়ক ও অন্যান্য নেতানেত্রী বিভিন্ন কলেজের গভর্নিং কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হচ্ছেন। প্রিন্সিপালরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে না। শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন করে সাম্প্রদায়িক ভাবধারা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিহাসের সিলেবাসে অনেক বদল ঘটতে চলেছে। দলীয় ধারণার ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ঘটনার বিকৃত আখ্যান নির্মাণ করা হচ্ছে।
নতুন করে কাউকে ‘হিরো’ অথবা কাউকে ‘ভিলেন’ বানানো হবে।সাহিত্যের মাধ্যমেও সাম্প্রদায়িকতায় শান দেওয়া হবে। বিতর্কিত লেখাগুলো বাড়তি গুরুত্ব পাবে। বিজ্ঞানের যে অধ্যায়ের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের সংঘাত আছে, সেই অধ্যায় পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ পড়বে। শিক্ষার্থীরা যুক্তিনির্ভর শিক্ষার বদলে বিশ্বাসনির্ভর শিক্ষা লাভ করবে। সরকার একদিকে বলছে ‘মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ মাদ্রাসা তুলে দেওয়া হবে; অন্যদিকে ‘হিন্দু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ বিদ্যাভারতী বিদ্যালয় স্থাপন করার কথা ঘোষণা করছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কোনো সরকার কি এমন পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ করতে পারে? সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পাঠক্রম ধর্মভিত্তিক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার পাঠ দেওয়ার সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক বিষয় পড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের পথ ধরলে ভারতের লাভ হবে না।
শিক্ষা সমাজকে আলোকিত করে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে পড়ে শিক্ষার আলোক বিচ্ছুরণের ক্ষমতা নষ্ট হয়। ছুরি দিয়ে ফল কাটলে ঠিক আছে, কিন্তু ছুরি দিয়ে মানুষকে আঘাত করলে অনর্থ ঘটে। তবে এটাও ঠিক মানুষকে রক্তাক্ত করার ঘটনা ছুরির স্বাভাবিক কর্ম নয়। ওটা একটি ব্যতিক্রমমূলক ঘটনা। শিক্ষা স্বাভাবিক নিয়মে সত্যকেই উন্মোচন করে। শিক্ষা সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ চিনতেও সাহায্য করে। শিক্ষা সংকট থেকে উত্তরণের পথও দেখায়।