৬ শব্দের পোস্ট থেকে ভারতের জনপ্রিয় মুখ, কে এই অভিজিৎ দীপকে

সমাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাত্র ছয় শব্দের এই পোস্টই বদলে দেয় অভিজিৎ দীপকের জীবন। মে মাসে হতাশা থেকে দেওয়া ওই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট কয়েক দিনের মধ্যেই রূপ নেয় বড় এক রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে।....

সমাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাত্র ছয় শব্দের এই পোস্টই বদলে দেয় অভিজিৎ দীপকের জীবন। মে মাসে হতাশা থেকে দেওয়া ওই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট কয়েক দিনের মধ্যেই রূপ নেয় বড় এক রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে। সেই আন্দোলনের নাম- ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

২০২৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের অন্যতম বড় রাজপথের আন্দোলনের মুখ এখন ৩০ বছর বয়সী দীপকে। বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এরই মধ্যে দিল্লির রাজপথ ছাড়িয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

 

 

একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট

ঘটনার শুরু মে মাসে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক বক্তব্যে বেকার তরুণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু মানুষকে ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই ১৬ মে দীপকে এক্সে লেখেন- ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে হয়?’

ব্যঙ্গাত্মক ওই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়। দিল্লির ইউটিউবার মেঘনাদ এসসহ কয়েকজন সেটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট। অনলাইনে শুরু হয় সদস্য সংগ্রহ।

কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। আন্দোলনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও গণমাধ্যমের মালিকানার মতো বিষয় সামনে আসে।

দীপকের ভাষায়, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা না পাওয়া তরুণদের জন্য একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।

 

 

কে এই অভিজিৎ দীপকে?

অভিজিৎ দীপকের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে। দলিত সম্প্রদায়ের একটি নিও-বৌদ্ধ পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা ভগবানরাও দীপকে মহারাষ্ট্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী। মা অনিতা দীপকে গৃহিণী।

ছাত্রজীবনের শুরুতে প্রকৌশল পড়লেও সেই পথ বেশিদিন অনুসরণ করেননি দীপকে। পরে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ নিয়ে পড়াশোনা করেন পুনেতে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বোস্টন ইউনিভার্সিটির কলেজ অব কমিউনিকেশন থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

তার রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষা তৈরি হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে মিম, ব্যঙ্গ, রসিকতা ও সহজ ভাষায় রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশল তাকে তরুণদের কাছে পরিচিত করে তোলে।

 

 

আম আদমি পার্টির সঙ্গে পথচলা

২০২০ সালে দীপকে আম আদমি পার্টির (এএপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে তিনি মিমনির্ভর ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

পরে দিল্লি সরকারের শিক্ষা বিভাগের যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। ২০২৩ সালে এএপির মিডিয়া টিম থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান। যদিও এখন তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তার নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টিও নিজেদের স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে।

 

 

বোস্টন থেকে দিল্লির রাজপথে

অনলাইনে আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। হুমকির কথা জানালেও দীপকে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। জুনে বোস্টন থেকে ভারতে ফিরে আসেন।

গত ৬ জুন দিল্লিতে পৌঁছে হাতে তুলে নেন বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনী। দলিত অধিকার ও সামাজিক সমতার প্রবক্তা আম্বেদকর তার রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

এরপর দিল্লির জন্তর মন্তরে শুরু হয় ককরোচ জনতা পার্টির রাজপথের কর্মসূচি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নির্ধারণ এবং সরকারের জবাবদিহির দাবি সামনে আসে।

আন্দোলন বড় হতে থাকলে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে গড়ে ওঠে প্রতিবাদ শিবির। দীপকে কখনো মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছেন, কখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন, আবার কখনো আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

 

রাজপথে সংঘাত

গত ২০ জুলাই হাজারো আন্দোলনকারী সংসদের দিকে মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য- দুই পক্ষেই আহত হওয়ার খবর আসে।

এরপর দীপকে ঘোষণা দেন, আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচি চলবে, তবে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নতুন করে রাজপথের মিছিল স্থগিত রাখা হবে।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই আসে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আন্দোলনকারীরা এটিকে নিজেদের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেন।

 

 

শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে। পরে এর পরিধি বাড়ে। তরুণদের কর্মসংস্থান, রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব, বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজনৈতিক নিয়োগ, গণমাধ্যমের মালিকানা ও সরকারের জবাবদিহির মতো বিষয়ও আলোচনায় আসে।

দীপকে বারবার বলেছেন, তাদের লক্ষ্য কোনো সরকার পরিবর্তন নয়; বরং ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় তরুণদের জন্য জায়গা তৈরি করা। তিনি আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন।

 

 

হুমকি, সমালোচনা ও বিতর্ক

আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়ার পর দীপকে ও তার পরিবারের কাছে হুমকির বার্তা আসার অভিযোগ ওঠে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বার্তার স্ক্রিনশটও প্রকাশ করেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাইয়ে এক নারী প্রতিবাদ কর্মসূচির মঞ্চে দীপকের দিকে নীল কালি ছুড়ে দেন। ওই নারী অভিযোগ করেন, ককরোচ জনতা পার্টির কর্মকাণ্ডে হিন্দু দেবতা রামের প্রতি অসম্মান করা হয়েছে। দীপকের পক্ষ থেকে অবশ্য আন্দোলনের রাজনৈতিক ও ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রের কথা তুলে ধরা হয়।

এদিকে আন্দোলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন দীপকে। এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।