SIR-এর ছায়ায় গোটা দেশ, নাগরিকের ভোটাধিকার নিয়ে বাড়ছে গভীর উদ্বেগ

কানাই দাস ভোটার তালিকায় একটি নাম, দেখতে খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের নাগরিক পরিচয়, তাঁর ভোট দেওয়ার অধিকার এবং গণতন্ত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ।....

কানাই দাস

ভোটার তালিকায় একটি নাম, দেখতে খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের নাগরিক পরিচয়, তাঁর ভোট দেওয়ার অধিকার এবং গণতন্ত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ। সেই হিসাবে ভোটার তালিকায় একটি নাম শুধু একটি নাম নয় , সেটি রাষ্ট্রের নথিতে একজন নাগরিকের উপস্থিতির স্বীকৃতি। তাই ভোটার তালিকা নিয়ে সামান্য পরিবর্তনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তালিকায় নাম থাকলে ভোট দেওয়া যায়, নাম না থাকলে যায় না।
এই কারণেই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত এবং কমিশনের ভিতরের মতপার্থক্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা শুধু নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়, বিষয়টি প্রত্যেক ভোটারের। যেখানে জড়িয়ে রয়েছে দেশের কোটি কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা।

 

২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দশ মাসে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য–সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী– কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কাজ নিয়ে বেশ কয়েক বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারদের ফর্ম, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, ভোটার তালিকার ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের নাম নিয়ে করা আপিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে–তিন সদস্যের কমিশনে দু’জন সদস্য যদি কোনও বিষয়ে লিখিত আপত্তি জানান, তাহলে সেই আপত্তির অবস্থান, বা ভিত্তিমূল কী?

 

২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act -এর ১৮(২) ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। আবার আইনে বলা হয়েছে, যতটা সম্ভব কমিশনের কাজ সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে।
এই দুই কথার মধ্যেই বর্তমান প্রশ্নটির গুরুত্ব।
ধরা যাক, ফর্ম ৬-এর কথা। নতুন ভোটার হওয়ার জন্য যে ফর্ম পূরণ করতে হয়, সেই ফর্মে নতুন একটি প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, আবেদনকারী বা তার বাবা-মা কিংবা দাদা-দিদা আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিলেন কি, ছিলেন না !

 

বিবেক যোশী এই পরিবর্তনের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–যা এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে সুখবীর সিং সান্ধুও লিখিতভাবে এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলে তা সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই প্রশ্নটি ফর্মে ছিল।তাহলে প্রশ্ন খুব সহজ–একজন সদস্য নয়, দুই সদস্য আপত্তি জানানোর পরও পরিবর্তনটি কেন চলল?এর উত্তর নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকেই আসা দরকার।
কমিশনের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। কমিশন বলেছে, সদস্যদের মধ্যে কোনও বিষয়ে প্রশ্ন, মতামত বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। এগুলিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মতপার্থক্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কমিশনের দাবি, শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি আইন মেনেই এবং সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।

 

এই বক্তব্যের পরেও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকে যায়–লিখিত আপত্তি যদি সিদ্ধান্তের আগের স্বাভাবিক আলোচনা হয়, তাহলে সেই আলোচনার শেষ সিদ্ধান্তটি কীভাবে হল, সেটি কি আরও পরিষ্কার করে জানানো যায় না?
আর একটি বড় প্রশ্ন ভোটার তালিকার ডিজিটাল ব্যবস্থাকে নিয়ে।আজকের দিনে ভোটার তালিকা শুধু কাগজে রাখা হয় না। কম্পিউটার, সফটওয়্যার এবং অনলাইন ব্যবস্থার উপর তার বড় অংশ নির্ভরশীল। কিন্তু এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে। বিবেক যোশী এ বিষয়ে স্বাধীন প্রযুক্তিগত অডিটের কথাও বলেছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল–যে আধিকারিকদের আইন ভোটার তালিকা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার কি ঠিকভাবে রয়েছে?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব বোঝা কঠিন নয়।
কারণ একটি সফটওয়্যার ভুল করতে পারে। একটি তথ্য ভুলভাবে মিলতে পারে। কোনও নামের বানান ভুল হতে পারে। বয়সের হিসাব না মিলতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভুলের কারণে যদি একজন প্রকৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান, তখন তার কাছে সেই ভুল আর শুধু ‘সফটওয়্যার সমস্যা’ থাকে না। সেটি হয়ে যায় তার ভোটাধিকার নিয়ে সমস্যা। নিজের আইডেন্টিটি এসে যায় সংকটের মুখে।

 

পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
পশ্চিমবঙ্গে ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে এমন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে, অর্থাৎ তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে। সুখবীর সিং সান্ধু লিখিতভাবে জানতে চেয়েছিলেন–এই আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিল? কারা কমিশনের হয়ে সেই আপিল করেছিল? তাঁর নোট অনুযায়ী, তিনি এবং বিবেক যোশী এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।বিষয়টি যেন প্রাচীন যুগের চর্যাপদের সন্ধ্যাভাষার মতো –কিছুটা জানা, কিছুটা অজানা, কোথাও আলো, কোথাও আঁধারি।
এখন একটি সাধারণ প্রশ্ন –যদি নির্বাচন কমিশনের নামে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে কমিশনের প্রত্যেক সদস্য কি সেই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানবেন না?

 

এমন প্রশ্ন ওঠা মানেই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু গণতন্ত্রে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
নির্বাচন কমিশন দেশের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তার কাজের প্রতি মানুষের আস্থা থাকা প্রয়োজন। সেই আস্থা শুধু নির্বাচনের ফলাফলের উপর তৈরি হয় না, তৈরি হয় কাজের পদ্ধতি, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার উপরও।
তাই আজ প্রয়োজন কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানো নয়। প্রয়োজন কয়েকটি সহজ প্রশ্নের উত্তর জানা।
ফর্ম ৬-এ পরিবর্তনটি কে করেছিল? দুই কমিশনার আপত্তি জানানোর পরও সেটি কেন চলল? কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তার নামে কোনও নির্দেশ জারি হয়েছিল কি না? ভোটার তালিকার ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে কার কী ক্ষমতা? পশ্চিমবঙ্গের ১৬.১০ লক্ষ ভোটারের বিরুদ্ধে করা আপিলের অনুমতি কে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলির পরিষ্কার উত্তর যত দ্রুত সামনে আসবে, ততই মানুষের আস্থা বাড়বে।

 

কারণ, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন শুধু তিনজন মানুষের প্রতিষ্ঠান নয়। ভোটার তালিকাও শুধু সরকারি কাগজ নয়। তালিকায় থাকা নামটি আমার, তোমার, তারও। আমি, তুমি, সে–মিলেই আমরা।
আর সেই ‘আমরা’ই ভোটার। সেই ভোটারই নাগরিক। তাই ভোটার তালিকায় কোনও প্রকৃত নাগরিকের নাম যেন অন্যায়ভাবে বাদ না যায়, আবার কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর নামও যেন আইনবহির্ভূতভাবে থেকে না যায়–দুই দিকের দায়িত্বই সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নির্ভরযোগ্য নথি ও আইনের ভিত্তিতেই এই যাচাই হওয়া উচিত।
ভোটার তালিকার প্রতিটি নামের নিরাপত্তা, প্রতিটি সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি ভোটের মর্যাদা রক্ষা করা শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়-এটি গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

 

আমি, তুমি, সে-আমরা। আমরা ভোটার। আর ভোটারের আস্থাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই কয়েকজন মানুষের ভুলের মাশুল যেন সকলকে দিতে না হয়-সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত আপামর জনতার।

তথ্যসূত্র:
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট নথি ।নির্বাচন কমিশনের ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রেস নোট । প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২৩, ধারা ১৮(২)। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০, ভোটার নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০।