উত্তাল ঘোষ
প্রশ্ন ঘোরে আমার মধ্যে। কেন আলাদা করে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে? সব সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব রকম ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় আচার কেন বন্ধ হবে না? লেখাটি পড়ে আপনার মতামত জানালে ভাল লাগবে।
একটা কথা বলেনি লেখার দৈর্ঘ্য কম রাখতে কিছুটা সরলীকরণ থাকবে। কোনও ভুল থাকলে ধরিয়ে দেবেন।
*
রাজ্যে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। আরও ১০০টি মাদ্রাসাকে শো কজ করা হয়েছে। কারণ ওই মাদ্রাসাগুলো অনুমোদনহীন। স্বাগত জানাই। অনুমোদন না থাকলে চলতে দেওয়া হবে কেন?
আশা করি, সরকার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-কেও একই ভাবে বন্ধ করতে বলবে কারণ তাদেরও কোনও সরকারি অনুমোদন নেই, কোনও রকম রেজিস্ট্রেশন নেই।
*
সরকারের হিসেব বলছে রাজ্যে ২,১৩০২ অনুমোদিত এবং অনুমোদনহীন ২,৩৯৬ মাদ্রাসা আছে।
প্রশ্ন হল, ২,৩৯৬ মাদ্রাসার মধ্যে মাত্র ২৫২+১০০ মাদ্রাসার ওপর খাঁড়া নামল কেন? যে মাদ্রাসাগুলো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগই বহু বহু বছর আগে উঠে গেছে। মরাকে আবার মেরে হাততালি পাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি?
শোনা যাচ্ছে, রেজিস্ট্রি অফিসে অনেক মাদ্রাসা ট্রাস্ট তৈরির ভিড়। কেন? একদিকে অনুমোদনহীন মাদ্রাসা বন্ধ অন্যদিকে পিছন দরজা দিয়ে অনুমোদনহীন মাদ্রাসাকে অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে? আগেই বললাম, বিভিন্ন মিডিয়া দেখা হচ্ছে, যে সব মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার বেশির ভাগই অস্তিত্বহীন। অস্তিত্ব আছে এরকম অনুমোদনহীন মাদ্রাসাকে কি ঘুরপথে আইনি করার ব্যবস্থা হচ্ছে? ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে না।
*
অনেকেরই মাদ্রাসা সম্পর্কে আজেবাজে ধারণা তৈরি হয়েছে নেতাদের কথা শুনে। ধারণা তৈরি হয়েছে, মাদ্রাসায় শুধু মুসলমানরাই পড়ে, মাদ্রাসায় কেবল ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয়, মাধ্যমিক বোর্ডে যা লেখাপড়া হয় সেগুলো মাদ্রাসা বোর্ডে পড়ায় না এবং মাদ্রাসায় জঙ্গি কাজকর্ম হয়। তাদের এক কথায় আকাট বলাই ভাল।
আমাদের রাজ্যে মাদ্রাসা বোর্ড অনেক পুরোনো হলেও তার আইনি স্বীকৃতি মেলে ১৯৯৪ সালে বামফ্রন্ট সরকারের সময়। রাজ্যের হাই মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের ১৭% এবং শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ১১% অমুসলিম। ফলে অকারণে ধর্মকে টেনে আনা হয় শিক্ষার সঙ্গেও বিষ মেশাতে। মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা হয়, তার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাও হয়।
*
মাদ্রাসা বোর্ডের হিসেবে অনুমোদিত ও সরকারি অনুদান পায় এরকম মাদ্রাসার সংখ্যা ৬১৪। ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসা ১৪। এগুলোকে সরকারি মাদ্রাসা বলা যায়। অনুমোদিত কিন্তু সরকারি অনুদান পায় না এরকম মাদ্রাসার সংখ্যা ৬০১। এগুলোকে বেসরকারি মাদ্রাসা বলা যায়। এরসঙ্গে SSK MSK প্রকল্পের মাদ্রসাগুলোকে যোগ করে সরকার বলছে ২,১৩০২ অনুমোদিত মাদ্রাসা এবং অনুমোদনহীন ২,৩৯৬ মাদ্রাসা।
অনুমোদনহীন স্কুল যেমন আছে তেমনই অনুমোদনহীন মাদ্রাসাও আছে। অনেকেই শিক্ষার প্রসারে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত ভাবে মাদ্রাসা তৈরি করেন। সরকার পরিদর্শন করে প্রয়োজনে অনুমতি দিতে। আমার যদ্দূর জানা, গত ১৫ বছরে এরকম কোনও মাদ্রাসাকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সেরকম কিছু মাদ্রাসায় এখনও লেখাপড়া হয়। ছাত্রছাত্রীরা অন্য মাদ্রাসার নামে পরীক্ষা দেয়। এরকম অনেক স্কুলও আছে রাজ্যে।
*
আরেক রকম মাদ্রাসা দেখা যায়। চলতি কথায় বলে, খারিজি মাদ্রাসা। এগুলো অবশ্যই অনুমোদনহীন। অন্য অনুমোদনহীন মাদ্রাসাগুলোর মতো খারিজি মাদ্রাসায় সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকে না। শুধুই ধর্মীয় শিক্ষা। এদের কোথাও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে কিনা, আমার জানা নেই। আমাদের রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি কাজকর্মে যোগাযোগের অভিযোগ এরকম কিছু খারিজি মাদ্রাসার সম্পর্কে উঠেছে। সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয় এরকম কোনও সরকার অনুমোদিত বা অনুমোদিত নয় এরকম কোনও মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ওঠেনি। যারা মাদ্রাসা মানেই জঙ্গি ডেরা বলে প্রচার করে এবং যারা বিশ্বাস করে তারা অত্যন্ত নোংরা মনের মানুষ। নিজেদের মতলব হাসিল করতে আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গায়েও কালি লাগাতে তাদের বাঁধে না।
রাজ্যে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারমধ্যে খারিজি মাদ্রাসা কটি? আদৌ ২৫২টির মধ্যে একটিও আছে? সরকার কিছু জানায়নি। মিডিয়াও এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে চায় না। মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে…।
*
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে আমি সহমত নই। কিন্তু ২০০২ সালে খারিজি মাদ্রাসা সম্পর্কে তাঁর কথাকে আমি সম্পূর্ণ সমর্থন করি। মনে করি, বুদ্ধবাবুকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে সিপিএম, বামফ্রন্টের অন্য শরিক দলগুলো রাজ্যের এবং বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট করেছে। খারিজি মাদ্রাসা কখনওই সুস্থ সমাজের অংশ হতে পারে না।
মুসলিমরা আমাদের এখানে সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করাটা গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে এটা নয় যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যা বলবে তাই শুনতে হবে। কারণ তাদের মধ্যেও বহু খারাপ মতলবের লোক থাকে। CAA-এর বিরোধিতা করা আর ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়া এক নয়। ওয়াকফ আইনের বিরোধিতা করা আর সামসেরগঞ্জে দুজনকে কুপিয়ে খুন করা এক জিনিস নয়। সেখানে সংস্কারের দরকার আছে এবং আমি ওই সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাকে সমর্থন করবেন। আলাদা করে মাদ্রাসা বা অন্য কোনও ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা না থাকলে ওই সম্প্রদায়ের মানুষেরই উপকার। তাঁদের সামনে বিরাট সমুদ্রে মেশার সুযোগ তৈরি হবে। ভোটের রাজনীতি সেটা হতে দিতে চায়নি, হতে দিতে চায় না, হতে দিতে চাইবে না বলেই আমার মনে হয়।
*
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, কোনও শিক্ষার সঙ্গেই ধর্মের যোগ থাকা উচিত নয়। সরকারি বেসরকারি সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সাধারণ শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত, যেখানে কোনও ধর্মীয় শিক্ষা বা ধর্মীয় আচারের যোগ থাকবে না। কৃষ্ণ-নবী-যীশু-নানক সহ নানা ধর্মগুরুদের জীবন, বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া থাকবে পাঠ্যক্রমে। কারণ সেগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তার বাইরে কেউ ধর্মশিক্ষা করতে চাইলে সেটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে করতেই পারেন। স্কুলে সরস্বতী পুজো ক্রিস্টমাস নবী দিবসের মতো কোনও রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হবে না। কেউ করতে চাইলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে করবেন।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের বিরোধিতা নয় বরং মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ধর্মাচরণের অধিকারকে নিশ্চিত করা কিন্তু রাষ্ট্র কোনও ধর্মীয় পরিসরে থাকবে না, নিস্পৃহ অবস্থান নেবে।
সেটা নিশ্চিত করা না গেলে কখনও কেউ বলবে কংগ্রেস হিন্দুদের সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চাইছে, কখনও কেউ বলবে হিন্দুদের কেটে ভাগীরথীতে ভাসিয়ে দেব ইত্যাদি। এই সব ধর্মব্যবসায়ী পাষন্ড ভণ্ডদের খেলা শেষ করার কাজটা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাক্ষেত্র তৈরির মধ্যে দিয়েই শুরু হতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতিতেই আছে। তার জন্য পাশ্চাত্যের দিকে তাকানোর দরকার নেই।
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য
হেথায় দ্রাবিড়, চীন–
শক-হুন-দল পাঠান মোগল
এক দেহে হল লীন।
পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার,
সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
যাবে না ফিরে,
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
ধর্মনিরপেক্ষতার এই ধারণাটাই হাজার হাজার বছর ধরে ভারত সারা পৃথিবীকে শিখিয়েছে। কিছু রাজনীতিকের ভন্ডামির জন্য তো তা ফেলে দেওয়া যাবে না, বৃথাও যাবে না।