ড. রতন ভট্টাচার্য
ভারতীয় রেনেসাঁর ইতিহাসে কয়েকজন মানুষের নাম উচ্চারণ করলেই একটি যুগের মানসিক পরিবর্তনের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাজা রামমোহন রায় ধর্মীয় কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে যুক্তির মশাল জ্বালিয়েছিলেন; ডিরোজিও তরুণ সমাজকে স্বাধীন চিন্তার সাহস দিয়েছিলেন; বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা গদ্য ও জাতীয় চেতনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু এই ধারার মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবস্থান অনন্য। কারণ তিনি শুধু চিন্তার জগতে পরিবর্তনের কথা বলেননি, বাস্তব সমাজে সেই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। তাই তাঁকে ভারতীয় রেনেসাঁর প্রাণপুরুষ বলা শুধু আবেগের কথা নয়; তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্যেই এই অভিধার যথার্থতা নিহিত।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম। অতি সাধারণ আর্থিক পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি যে অসাধারণ শিক্ষাগত সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তা উনিশ শতকের ভারতীয় সমাজে প্রায় অভাবনীয়। সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নকালে তাঁর অসামান্য মেধার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব ছিল কেবল পাণ্ডিত্য অর্জনে নয়; সেই জ্ঞানকে তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছিলেন।
‘বিদ্যাসাগর’ নামটির মধ্যে যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের দুটি দিক একসঙ্গে ধরা পড়ে—একদিকে গভীর বিদ্যা, অন্যদিকে অসীম মানবিকতা। সংস্কৃত শাস্ত্রের পণ্ডিত হয়েও তিনি অন্ধ শাস্ত্রানুগতার সমর্থক ছিলেন না। তিনি শাস্ত্র পড়েছিলেন প্রশ্ন করার জন্য, সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার সম্পর্ক বিচার করার জন্য। তাঁর যুক্তিবাদী মন তাঁকে বুঝিয়েছিল যে কোনো প্রথা কেবল প্রাচীন হলেই তা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না।
এই যুক্তিবাদ সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছিল বিধবা বিবাহ আন্দোলনে। উনিশ শতকের হিন্দু সমাজে বিধবার জীবন ছিল ভয়াবহ সামাজিক বঞ্চনার প্রতীক। অল্প বয়সে স্বামী মারা গেলে একজন নারীকে প্রায় সারাজীবন সামাজিক নিষেধ, অপমান এবং একাকিত্বের মধ্যে থাকতে হতো। বিদ্যাসাগর এই অন্যায়কে শুধু নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি; তিনি ধর্মশাস্ত্রের মধ্য থেকেই বিধবা বিবাহের সমর্থনে যুক্তি খুঁজে বের করেন। তাঁর গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফলেই ১৮৫৬ সালে Hindu Widows’ Remarriage Act পাশ হয়।
এই ঘটনাকে ভারতীয় রেনেসাঁর ইতিহাসে একটি মাইলফলক বলা যায়। কারণ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল—সামাজিক সংস্কার কেবল বক্তৃতা বা আবেগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, যুক্তি, সংগঠন, জনমত এবং আইনগত পরিবর্তনের সমন্বয়। বিদ্যাসাগর এই সমস্ত দিক একত্র করেছিলেন।
তবে তাঁর সমাজসংস্কারের পরিসর বিধবা বিবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসারকে তিনি সামাজিক মুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত মনে করতেন। তাঁর কাছে শিক্ষিত নারী মানে শুধু একজন শিক্ষিত ব্যক্তি নয়; একটি শিক্ষিত পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। বেথুন স্কুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং বাংলায় মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। বিভিন্ন স্থানে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্যোগ নেন। সেই সময়ে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে সমাজের একটি বড় অংশের আপত্তি ছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর পিছিয়ে যাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার অধিকার লিঙ্গভেদে বিভক্ত হতে পারে না।
সমকালীন ভারতেও বিদ্যাসাগরের প্রাসঙ্গিকতা গভীর। নারীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, নারীর মর্যাদা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন এখনও সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি। ডিজিটাল যুগে ভুয়ো তথ্য, কুসংস্কার ও
বিজ্ঞানবিরোধী ধারণার দ্রুত বিস্তার বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদী চিন্তার প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সময়ে তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল চাকরির প্রস্তুতি নয়, স্বাধীন বিচারবুদ্ধি ও মানবিক চরিত্র গঠনের মাধ্যম। ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের বিভাজনের মধ্যেও তাঁর মানবতাবাদ স্মরণীয়। সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর সংলাপ, অন্ধ অনুসরণের পরিবর্তে প্রশ্ন করার সাহস এবং ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে মানুষের কল্যাণ—এই মূল্যবোধগুলিই আজকের সমাজে বিদ্যাসাগর-চেতনার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রকাশ।
তাঁর শিক্ষা-ভাবনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সমন্বয়। তিনি সংস্কৃত কলেজে পাশ্চাত্য জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারের পক্ষে ছিলেন। একই সঙ্গে ভারতীয় ভাষা ও শাস্ত্রীয় শিক্ষার গুরুত্বও তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের বুদ্ধিকে মুক্ত করার একটি উপায়।
বাংলা ভাষার বিকাশেও বিদ্যাসাগরের অবদান অসামান্য। তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ শুধু একটি প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক নয়; এটি বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ। শিশুর কাছে অক্ষর, শব্দ ও বাক্যকে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার যে পদ্ধতি তিনি তৈরি করেছিলেন, তার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলেছে। বাংলা গদ্যকে তিনি সুসংবদ্ধ, পরিষ্কার এবং যুক্তিনির্ভর রূপ দিতে সাহায্য করেন। তাঁর গদ্যে অপ্রয়োজনীয় অলংকারের চেয়ে স্পষ্টতা ও বক্তব্যের শক্তি বেশি।
‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর ভাষাশৈলী বাংলা গদ্যের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁর গদ্যের মধ্যে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের ব্যবহার থাকলেও বাক্যগঠন ছিল সুসংহত ও অর্থবহ। পরবর্তী বাংলা গদ্যের বিকাশে এই ভাষাশৈলীর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তাঁর মানবতাবাদ। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল তার জাতি, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে বড়। দরিদ্র ছাত্রদের সাহায্য করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দুর্ভিক্ষের সময়ে মানুষের জন্য কাজ করা—এসব তাঁর জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ ছিল। তিনি যে পরিমাণ ব্যক্তিগত অর্থ ও শ্রম জনকল্যাণে ব্যয় করেছিলেন, তা তাঁর মানবিকতার গভীরতা বোঝায়।
তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তাও ছিল অসাধারণ। সমাজের প্রবল বিরোধিতা, কটুক্তি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। তিনি জানতেন, সামাজিক সংস্কারের পথে জনপ্রিয়তা সবসময় পাওয়া যায় না। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে কখনও কখনও একা দাঁড়াতে হয়। তাঁর জীবন এই নৈতিক সাহসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
বিদ্যাসাগরের রেনেসাঁ-চেতনার মূল ভিত্তি ছিল মানবিক যুক্তিবাদ। ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন মানুষের বুদ্ধি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জ্ঞানচর্চাকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছিল, বাংলার নবজাগরণও ভারতীয় সমাজে অনুরূপ প্রশ্ন তুলেছিল। তবে ভারতীয় বাস্তবতায় এই রেনেসাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ঔপনিবেশিক শাসন, নারী-অবমাননা এবং অশিক্ষার মতো বহু সমস্যাকে। বিদ্যাসাগর সেই বাস্তবতার মধ্যেই তাঁর সংস্কার-আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন।
এখানেই তাঁর সঙ্গে ইউরোপীয় রেনেসাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। তিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ করেননি। আবার প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতিটি বিষয়কেও প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেননি। তিনি গ্রহণ করেছিলেন যুক্তিসঙ্গত ও মানবিক মূল্যবোধকে। তাঁর আধুনিকতা ছিল ভারতীয় সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত।
বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ পর্বেও এই মানবিকতা অটুট ছিল। কলকাতার শিক্ষিত সমাজ থেকে দূরে সরে তিনি কার্মাটারে সাঁওতাল ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে সময় কাটিয়েছেন। সেখানে তাঁর জীবনযাপন তাঁর অন্তর্গত মানবতাবাদের আর একটি পরিচয় বহন করে। ক্ষমতা, খ্যাতি বা সামাজিক মর্যাদার চেয়ে মানুষের কাছে থাকা তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
আজকের ভারতেও বিদ্যাসাগর তাই প্রাসঙ্গিক। নারীশিক্ষা, নারী-অধিকার, শিশুশিক্ষা, যুক্তিবাদ, সামাজিক সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা—এই প্রতিটি প্রশ্ন এখনও আমাদের সমাজে আলোচনার বিষয়। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, সামাজিক কাঠামো বদলেছে; কিন্তু কুসংস্কার, বৈষম্য ও সামাজিক অসহিষ্ণুতার নানা রূপ এখনও রয়েছে। ফলে বিদ্যাসাগরের মানবিক যুক্তিবাদ আজও প্রয়োজনীয়।
তাঁকে শুধু ‘দয়ার সাগর’ হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি দিকই দেখা হয়। তিনি ছিলেন প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী, কঠোর প্রশাসক, শিক্ষাবিদ, ভাষানির্মাতা এবং সামাজিক বিপ্লবী। তাঁর দয়া ছিল দুর্বলতার প্রকাশ নয়; তা ছিল ন্যায়বোধের সঙ্গে যুক্ত মানবিক শক্তি। তিনি অন্যায়ের সামনে আপস করেননি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন তাই ভারতীয় রেনেসাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। তাঁর হাতে শিক্ষা হয়েছিল মুক্তির অস্ত্র, ভাষা হয়েছিল জ্ঞানপ্রসারের মাধ্যম, যুক্তি হয়েছিল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অস্ত্র এবং মানবতা হয়েছিল সমাজসংস্কারের চূড়ান্ত ভিত্তি। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রও একটি যুগের সামাজিক বিবেক হয়ে উঠতে পারে।
ভারতীয় নবজাগরণের ইতিহাসে অনেক মনীষী এসেছেন, কিন্তু বিদ্যাসাগরের বিশেষত্ব তাঁর চিন্তা ও কর্মের ঐক্যে। তিনি যা বিশ্বাস করেছেন, তার জন্য কাজ করেছেন; যা অন্যায় মনে করেছেন, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; এবং যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, তার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেবল উনিশ শতকের বাংলার সংস্কারক নন—তিনি ভারতীয় আধুনিকতার অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং ভারতীয় রেনেসাঁর সত্যিই এক প্রাণপুরুষ।
আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।
ই-মেল: profratanbhattacharjee@gmail.com