সার্ধশতবর্ষে শরৎসাহিত্যে নারীর প্রেম ও যৌনতার পাঠ: বিধবা থেকে পতিতা

কানাই দাস   একবিংশ শতকের তৃতীয় দশক । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের(জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬, মৃত্যু ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) সার্ধশতবর্ষে তাঁর সাহিত্যকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আরও একবার অনুভূত হচ্ছে। সময় বদলেছে,....

কানাই দাস

 

একবিংশ শতকের তৃতীয় দশক । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের(জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬, মৃত্যু ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) সার্ধশতবর্ষে তাঁর সাহিত্যকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আরও একবার অনুভূত হচ্ছে। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভাষাও বদলেছে। বদলেছে প্রেমের পদ্ধতি । কিন্তু শরৎসাহিত্যে নারী, প্রেম, বিবাহ, বৈধব্য, সতীত্ব এবং যৌনতার যে জটিল প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, সেগুলি আজও আমাদের ভাবায়। বিশেষ করে বিধবা থেকে পতিতা- নারীজীবনের এই দুই সামাজিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র আসলে তাঁর সময়ের সমাজব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করেছেন।

 

শরৎ-সাহিত্যে বিধবা চরিত্রের সংখ্যাও কম নয়। অপর্ণা (মন্দির ), মাধবী (বড়দিদি), রমা (পল্লীসমাজ), সুরমা (আলো ও ছায়া), মৃণাল (গৃহদাহ), স্বর্ণমঞ্জরী ও দুর্গামণি (অরক্ষণীয়া), জ্ঞানদা (বামুনের মেয়ে), সুলোচনা ও হেমনলিনী (পথ-নির্দেশ), কিরণময়ী ও সাবিত্রী (চরিত্রহীন), কমল ও নীলিমা (শেষ প্রশ্ন), রাজলক্ষ্মী (শ্রীকান্ত), সরযুর মা (চন্দ্রনাথ) এবং ললিতার মা (পরিণীতা)—সব মিলিয়ে ১৭টি বিধবা চরিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলির প্রায় সবকটিতেই বিধবা নারী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। ফলে বৈধব্যের সমস্যা শরৎচন্দ্রের দেশকালের অন্যতম সংবেদনশীল সামাজিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

 

যে সময়ে অল্পবয়সী মেয়েদের অনেক সময় পঞ্চাশ-ষাট বছরের কুলীন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হতো, সেই বর্ণহিন্দু সমাজে বিধবার সংখ্যা ছিল অত্যন্ত বেশি। সেই বাস্তবতার মধ্যেই শরৎচন্দ্র বিধবা কিশোরী ও যুবতীর প্রেম, বিবাহ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার সম্পর্কে পাঠকের মধ্যে নতুন অনুভূতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য বিধবা-বিবাহের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়েছে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিধবার সঙ্গে নায়কের মিলন ঘটিয়ে পাঠকের সহজ ইচ্ছাপূরণ করেনি।

 

এই জায়গাতেই শরৎচন্দ্রের শিল্পীসত্তার বিশেষত্ব। তাঁকে নিয়ে কটাক্ষও হয়েছে– শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসে যেন একটি বিধবা না থাকলেই নয় , আর সেই বিধবাটি সংযম, আচারনিষ্ঠা, সেবাপরায়ণতা ও করুণার প্রতিমূর্তি। কিন্তু তাঁর বিধবা চরিত্রগুলিকে শুধু আদর্শ নারীর ছাঁচে দেখলে শরৎচন্দ্রকে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। তাঁর নারীচরিত্রের মধ্যে কামনা, আকাঙ্ক্ষা, ভুল, অপরাধ, অসহায়তা এবং সামাজিক নিপীড়নও আছে।

 

জ্ঞানদার কথা এখানে বিশেষভাবে মনে পড়ে। বামুনের মেয়ে-র বিধবা জ্ঞানদা সমাজপতি-জমিদার ভগিনীপতি গোলোক চাটুজ্যের দ্বারা প্রতারিত হয়ে গর্ভবতী হয়। অবৈধ সন্তানকে গর্ভে নিয়ে নিঃস্ব, লাঞ্ছিতা ও পরিত্যক্ত জ্ঞানদা শেষ পর্যন্ত পথে নামে। চন্দ্রনাথ-এর সরযুর মা বিধবা হওয়ার পর প্রেমাস্পদ রাখালের সংসর্গে নষ্ট হন এবং পরবর্তীকালে সেই রাখালের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন। এমনকি নিষ্পাপ সরযুর জীবনও তার কারণে বিপর্যস্ত হয়। অর্থাৎ শরৎচন্দ্র বিধবাকে শুধু পবিত্রতার প্রতিমা করেননি; সামাজিক বাস্তবতার অন্ধকার দিকও দেখিয়েছেন।

 

আলো ও ছায়া – র সুরমা, শেষ প্রশ্ন – এর কমল ও নীলিমা, চরিত্রহীন-এর কিরণময়ী – এই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে বিধবার প্রেম ও যৌনতার প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। কমল বিধবা হওয়ার পর নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। নীলিমা বিবাহের প্রস্তাব দেয়। কিরণময়ী দিবাকরকে নিয়ে ঘর করে, যদিও দেহ দেয় না। এখানে শরৎচন্দ্রের প্রশ্নটি সরল নয় — বিধবা নারী কি প্রেম করতে পারে? সে কি নিজের শরীর ও জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে? সমাজের বিধিনিষেধের বাইরে গিয়ে তার মানবিক অস্তিত্বকে কি স্বীকৃতি দেওয়া হবে?

 

এই কারণেই রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত কিংবা রমা-রমেশকে মিলিয়ে দিয়ে সহজ সুখসমাপ্তির পথে শরৎচন্দ্র যাননি। তাঁর কাছে প্রেমের মূল্য শুধু বিবাহে নয়। প্রেমের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার বঞ্চনাও আছে। মিলন না ঘটলেও প্রেমের অনুভূতি তার মর্যাদা হারায় না। “বড় প্রেম কেবল কাছেই টানে না, দূরেও ফেলে”– এই উপলব্ধির মধ্যেই তাঁর প্রেমভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে। অতৃপ্ত কামনাও তাঁর কাছে মহৎ প্রেমের প্রাণ হতে পারে।

 

বিধবার পাশাপাশি পতিতা নারীও শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। তিনটি উল্লেখযোগ্য পতিতা চরিত্রের মধ্যে বিজলী (আঁধারে আলো) নায়িকার মর্যাদা পেয়েছে এবং চন্দ্রমুখী (দেবদাস) উপনায়িকা। তাঁদের জীবনের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন, পতিতাবৃত্তির পরিচয়ের আড়ালেও একজন নারী প্রেম করতে পারে, মাতৃত্ব অনুভব করতে পারে, বধূ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখতে পারে এবং সম্মানজনক জীবনে ফিরে যেতে চাইতে পারে।
শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে কখনও ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছে –তাঁর বেশ্যাও শেষ পর্যন্ত সতী! কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিতে পতিতাবৃত্তি নারীর স্বাভাবিক নিয়তি নয় , অভাব, অত্যাচার, প্রতারণা ও অসহায়তা অনেক নারীকে সেই জীবনে ঠেলে দেয়। তাই বিজলী বা চন্দ্রমুখীর মধ্যে তিনি সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার চরিত্রহীন-এর কামিনী দেখিয়ে দিয়েছেন, সব পতিতা এক রকম নয়। অর্থাৎ পতিতার ক্ষেত্রেও তিনি একমাত্রিক চরিত্র নির্মাণ করেননি।

 

 

শরৎচন্দ্রের নারীভাবনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সতীত্ব ও পতিব্রত্যের প্রশ্ন। দর্পচূর্ণ, কাশীনাথ, স্বামী, সতী, শুভদা, পণ্ডিতমশাই, বিপ্রদাস—বিভিন্ন রচনায় পাতিব্রত্যের আদর্শ নানা ভাবে এসেছে। সতী গল্পে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর চরম একনিষ্ঠতা যখন স্বামীর জীবনকে অসহনীয় করে তোলে, তখন শরৎচন্দ্র প্রশ্ন তোলেন– শুধু একনিষ্ঠতার নামই কি সতীত্ব? শুভদা-য় নিদারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে অপদার্থ স্বামীকে লালন – পালন করতে করতে স্ত্রীর মৃত্যুও সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করে।
গৃহদাহ – এর মৃণাল, চরিত্রহীন-এর সুরবালা, শ্রীকান্ত -এর অন্নদা দিদি ও সুনন্দা, দেনা-পাওনা-র হৈম—এই চরিত্রগুলির মধ্যেও সতীত্ব ও দাম্পত্যের নানা টানাপোড়েন রয়েছে। শরৎচন্দ্র একদিকে পতিব্রতার মহিমা দেখিয়েছেন, অন্যদিকে সেই আদর্শের সীমাবদ্ধতাও পাঠকের সামনে এনেছেন।

 

তাঁর যৌথ পরিবারভিত্তিক কাহিনিগুলিও নারীকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রামের সুমতি, বিন্দুর ছেলে, মেজদিদি, নিষ্কৃতি, মামলার ফল, পরেশ, বিপ্রদাস, বৈকুণ্ঠের উইল, অরক্ষণীয়া, বিরাজ – বৌ — এই কাহিনিগুলিতে মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও পারিবারিক সম্পর্কের নতুন অর্থ তৈরি হয়। নিজের সন্তানের বাইরে জায়ের সন্তান, দেবর, বৈমাত্র ভাই বা দূরসম্পর্কের মানুষকেও আপন করে নেওয়ার মধ্যে শরৎচন্দ্র এক ধরনের নৈতিক মাতৃত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

বিন্দু অমূল্যকে পুত্রের মতো ভালোবাসে, নারায়ণী বৈমাত্র দেবরকে পুত্রতুল্য মনে করেন, হেমাঙ্গিনী কেষ্টকে নিজের সন্তানের মর্যাদা দেন। এই সম্পর্কগুলি রক্তের সম্পর্কের সীমা অতিক্রম করে মানবিক সম্পর্কের দিকে যায়। শরৎচন্দ্রের কাছে এখানেই মানুষের ‘বড় আমি’–র প্রকাশ।
তাহলে শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায় — নারীকে এতটা মর্যাদা দিতে গিয়ে শরৎচন্দ্র কি তাঁর সাহিত্যে যৌনতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচ্ছন্ন রেখেছিলেন? হয়তো তাঁর সময়, সমাজ এবং পাঠক-সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতা তাঁকে অনেক কিছু সরাসরি বলার সুযোগ দেয়নি। কিন্তু তাঁর চরিত্রগুলির প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, দাম্পত্য, বৈধব্য, মাতৃত্ব, পতিতাবৃত্তি ও শরীরের প্রশ্নের ভিতর দিয়ে যৌনতার উপস্থিতি কখনও অনুপস্থিত নয় , বরং তা অনেক সময় আড়ালে থেকেও প্রবলভাবে অনুভূত হয়।

 

সার্ধশতবর্ষে তাই শরৎচন্দ্রকে শুধু ‘নারীর দরদী লেখক’ বলে থামিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। বিধবা থেকে পতিতা, স্ত্রী থেকে জননী — নারীর নানা সামাজিক পরিচয়ের ভিতর দিয়ে তিনি আসলে নারীর মানুষ হয়ে ওঠার অধিকারকেই সামনে এনেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীকে মর্যাদা দেওয়া মানে শুধু তাকে পবিত্রতার আসনে বসানো নয়, তার প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, ভুল, শরীর, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তকেও মানুষ হিসেবে স্বীকার করা। একটু সহজ করে বলা যেতে পারে –শরৎচন্দ্রের নারীরা কেবল সেকালের নয়, এ কালেরও এবং আগামীকালেরও । সমাজের শত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে তারা আজও বেঁচে আছেন আমাদের সাহিত্যের পাতায়।

 

তথ্যসূত্র:
১.অনির্বাণ রায় চৌধুরী , শরৎ সাহিত্যে আধুনিকতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ।
৩. শরৎচন্দ্রের জীবন ও সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন সমালোচনামূলক গ্রন্থ।
৪. শরৎচন্দ্র সংক্রান্ত বিভিন্ন চড়ুই–পত্রপত্রিকা ও প্রবন্ধ।
৫. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ও গল্পের মূল পাঠ।