অনিন্দ্য চৌধুরী
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ স্তম্ভ হিসেবে যাকে গণ্য করা হয়, সেই নির্বাচন কমিশনের অন্তর্মহলে এখন তীব্র ও নজিরবিহীন এক বিতর্ক। ‘ইনডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিক বিস্ফোরক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন এবং ‘দ্য ওয়্যার’-এর সচিত্র পর্যালোচনা দেশের স্বাধীন নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্ফোরক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সত্য.. গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন কমিশনেরই দুই কমিশনার, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। তাঁদের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও কমিশনের আইটি বিভাগ তাঁদের অজান্তে এবং অজ্ঞাতে একের পর এক ‘আইনবহির্ভূত’ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।
কী উঠে এসেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে?
১. ১৩ কোটি ভোটারের নাম ছাঁটাই ও ভোটার তালিকায় নজিরবিহীন কোপ:
কমিশনের ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ প্রক্রিয়ার অধীনে দেশজুড়ে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিতে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা নিয়ে আগেই বিতর্ক দানা বেঁধেছিল।
২. ‘বেআইনি ও অননুমোদিত’ ফর্ম-৬ পরিবর্তন:
নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ‘ফর্ম-৬’-এ হঠাৎ করেই একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা হয়, যেখানে আবেদনকারীকে জানাতে বলা হয়, তিনি বা তাঁর পিতা/পিতামহ পূর্ববর্তী SIR প্রক্রিয়ার তালিকায় ছিলেন কি না। কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সান্ধু স্পষ্ট লিখিত আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টরস রুলস, ১৯৬০’ সংশোধন না করে কেন্দ্রীয় সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এই ফর্ম বদল করা সম্পূর্ণ বেআইনি, একতরফা ও অসাংবিধানিক।
৩. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ছিনতাই:
কমিশনাররা অভিযোগ তুলেছেন যে, এতদিন স্থানীয় স্তরে ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের হাতে যে ক্ষমতা ছিল, তা সরিয়ে এনে দিল্লিতে ইআরডিজি/আইটি বিভাগের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। গোয়ায় দেখা গেছে, স্থানীয় অফিসার বা ERO কোনো ব্যক্তির নথিপত্র পরীক্ষা করে তাঁকে যোগ্য বললেও দিল্লির কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। ফলে সরকারিভাবে যোগ্য বিবেচিত হয়েও বহু নাগরিক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
৪. ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারে দুই কমিশনার:
পরিস্থিতি এতটাই নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিজেদের অজ্ঞাতে ডিজিটাল সিস্টেমের তদারকি ব্যবস্থা ও কাজের বণ্টন বদলে ফেলার প্রতিবাদে দুই নির্বাচন কমিশনার সরাসরি ক্যাবিনেট সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠান।
৫. আইনের অবমাননা:
কমিশন আইন ২০২৩ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া বাধ্যবাধকতামূলক। অথচ তিন সদস্যের কমিশনের দু’জনকেই অন্ধকারে রেখে দিনের পর দিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই নজিরবিহীন অন্তর্ঘাত ও অচলাবস্থার পর কিছু প্রশ্ন আজ আর চেপে রাখা সম্ভব নয়:
কার স্বার্থে ও কার নির্দেশে দুই কমিশনারের মতামতকে তোয়াক্কা না করে ১৩ কোটি ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণ করা হলো?
সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশন কি শুধুই একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গা, না কি এটি একটি যৌথ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান?
ভোটার তালিকার কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ক্ষমতার এই রহস্যজনক কেন্দ্রীকরণ কি তবে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুপরিকল্পিত ছক?
আইন ভেঙে ‘ফর্ম-৬’ পরিবর্তন করার পেছনের অদৃশ্য হাতটি কার? সাধারণ নাগরিককে নিজ দেশে ভোটাধিকার প্রমাণে কেন অযৌক্তিক নথির জটিলতায় ফেলা হচ্ছে?
সংবিধান রক্ষা ও মুক্ত-নিরপেক্ষ নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কি এবার এই গুরুতর অসঙ্গতির বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেবে?
গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বস্তু নয় আর ভোটাধিকার কোনো চ্যারিটি নয়। নির্বাচন কমিশনের ভেতরে থাকা এই অভূতপূর্ব ফাটল ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের স্বাধীন নির্বাচনী কাঠামো আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দেশের নাগরিক হিসেবে এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট ও স্বচ্ছ জবাব পাওয়া আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।