মধুমিতা দত্ত
ভিয়েতনামের মানচিত্রের মাঝ বরাবর সমুদ্রের ধার ঘেঁষা হোই আন। এক দিকে সাউথ চায়না সি’র অপার সৌন্দর্য। অন্য দিকে লণ্ঠন দিয়ে ঘেরা জনপদ। আর তার সঙ্গে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন।
পৃথিবীর নিরাপদতম পর্যটনকেন্দ্রের তালিকায় হোই আন রয়েছে বেশ ওপরের দিকে। বিশেষ করে একক পর্যটকদের স্বর্গ ভিয়েতনামের এই ছোট্ট শহর। হোই আনে গেলে যেতেই হবে হোয়াই নদীর ধারে। নদীর দুই ধার রঙিন লণ্ঠনের আলোয় আলোকিত। নদীতে হয় নৌকা ভ্রমণ। শ’য়ে শ’য়ে নৌকো লণ্ঠন দিয়ে সাজানো। সূর্য ডুবলে মনে হয় সারি সারি চলমান আলোর মালা। জলেও কাগজের ফুলের মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মোমবাতি। আর নদীর দু’ধারে সাজানো গোছানো লণ্ঠন শোভিত রাশি রাশি দোকান। আর প্রচুর রেস্তোরাঁ।

এই প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে একটু বলা যাক।
এই দেশের প্রায় জাতীয় খাদ্য হল ‘ফ্’ (Pho)। সর্বত্রই ছোট বড় ফ্-এর দোকান। সে একেবারে ফুটপাথে টুল পেতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা হোক অথবা গোছানো রেস্তোরাঁয়। ফ্ হল আমাদের চেনা থুকপার লাইটার ভার্সন। পাতলা স্যুপের মধ্যে নুডলস। সঙ্গে পছন্দের মাংস দেওয়া। পাশে থাকবে পাতি লেবুর টুকরো আর এক প্লেট বিভিন্ন শাক। আর সস তো রয়েছেই। মিলিয়ে মিশিয়ে খাও।

ফ্-র পরেই দেখলাম এখানে তুমুল জনপ্রিয় খাদ্য ‘বান মি’ (Banh mi)। আমাদের পরিচিত সাব-এর ছোট সংস্করণ। রাস্তার ধারে ধারে বান মি-র অজস্র দোকান। নৌকোর মতো পাউরুটির পেট চিরে তাতে লেটুস, বাঁধা কপি, বোক চয় দিয়ে তার মধ্যে বিভিন্ন সস ঢেলে সঙ্গে পছন্দের মাংস দিয়ে দেওয়া হয়। এর পর তা টোস্ট করা হয়। তৈরি হয়ে গেল বান মি। এর পাশাপাশি ভিয়েতনামিজ বহু উপাদেয় ডিশ রয়েছে। হোই আনের এই অঞ্চলে বলা বাহুল্য প্রায় সব রেস্তোরাঁয় মেলে ফ্। আর রাস্তার ধারে ধারে স্টলে তৈরি হচ্ছে বান মি।

সন্ধ্যার আলো ঝলমল হোই আনে পর্যটকও আসেন প্রচুর। রেস্তোরাঁ, ফুড স্টলেও প্রচুর ভিড়। রয়েছে স্থায়ী দোকানের পাশপাশি অস্থায়ী নাইট মার্কেট। সেখানে দরাদরিও চলে খুব। স্যুভেনির থেকে শুরু করে ব্যাগ, ঝুটো গয়নার বিকিকিনি চলে। পর্যটকেরা কেনাকাটায় ব্যস্ত। কেউ বা নৌকা ভ্রমণ করেন। এখানে চামড়াজাত পণ্যও তৈরি হয়। তাই চামড়ার ব্যাগ, জুতো, চপ্পলের দোকানও রয়েছে অসংখ্য। যদি কেউ জুতো অথবা চপ্পল কিনতে চায়, ইচ্ছে করলে নিজের পছন্দ মাফিক ডিজাইনে বানিয়েও নিতে পারে। তাঁর জন্য এই সব দোকান সময় নেয় দুই থেকে তিন দিন। এছাড়াও এই শহরে রয়েছে প্রচুর রেডিমেড পোশাকের দোকান। সঙ্গে প্রচুর টেলারিং শপ। জুতোর মতোই সেই সব শপে নিজের পছন্দ মতো পোশাক বানিয়ে নেওয়া যায়। সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা।
পনের’শ থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত হোই আন ছিল সাউথ চায়না সি-র ধারে এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বন্দর। চিন, জাপান, পর্তুগালের বণিকদের ছিল এখানে নিয়মিত যাতায়াত। ওল্ড টাউনের স্থাপত্য এখনও প্রমাণ দেয় সেই সব দেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের।

হোই আনের আর-এক আকর্ষণ এখানকার সমুদ্র তীর। নির্জন সমুদ্র তীরে রাত ১০টা-১১টা অবধি পর্যটকরা যাচ্ছেন, এই দৃশ্য বিরল নয়। হোই আন বাসীরা তাঁদের শহরের এই নিরাপত্তা নিয়ে বেশ গর্বও করেন। দূরে দেখা যায় নীল সমুদ্রের মাঝে ছোট ছোট টিলা। সেখানেও আছে মানুষের বাস। ভেসে চলা জেলে নৌকা আর ঢেউ ভাঙার শব্দ। আর সমুদ্র তীরের রেস্তোরাঁয় সি ফুডের চমৎকার সব খাবার।

হোই আনের পাশের শহর দা নাং। আসলে হোই আন যেতে গেলে দা নাং আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নামতে হয়। সেখান থেকে হোই আন যেতে পেরোতে হয় ড্রাগন ব্রিজ। ব্রিজের নকশা করা হয়েছে বিশাল ড্রাগনের আকৃতিতে। উইকেন্ড-এর রাতে সেই ড্রাগনের মুখ থেকে বেরোয় আগুন। সেই সময় যানবাহন থামিয়ে দেওয়া হয়। এই দৃশ্য দেখতে পর্যটকরাও প্রচুর ভিড় করেন।

হোই আন থেকে দা নাং হয়ে চলে যাওয়া যায় বানা হিলস-এ। পাহাড়ের ওপর চমৎকার সাজানো গোছানো পর্যটন কেন্দ্র। কেবল্ কারে প্রায় ২০ মিনিট চড়ে পৌঁছতে হয় বানা হিলস-এ। এখানেই আছে দু’হাত দিয়ে ধরা স্থাপত্যের গোল্ডেন ব্রিজ। রয়েছে ফরাসি গ্রাম। এক সময় ভিয়েতনাম ছিল ফরাসিদের অধীনে। সেই সময় ফরাসিরা বানায় এই গ্রাম।

তাই ভিয়েতনামে হ্যানয়, হো চি মিন সিটি গেলে মাঝখানে হোই আনে কয়েক দিন থাকতেই হয়। আলোয় ভরা পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, মানুষের আন্তরিকতা এবং প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্যের জন্য ভিয়েতনাম গেলে হোই আন যাওয়া মিস করা যাবে না কখনই।