বি কেতকী কুশারী ডাইসন হলেন বাংলা কবিতার সুনীতা উইলিয়ামস। সুনীতা চাঁদে গিয়ে বিশ্ব জয় করেছিলেন, আর কেতকী অক্সফোর্ডে গিয়ে বিশ্বজয় করলেন। যেমন চাঁদ এবং মাটির পৃথিবীর মধ্যে সেতু হয়ে উঠলেন সুনীতা, তেমনই কেতকী কুশারী কলকাতাকে নিয়ে গেলেন অক্সফোর্ডে আর অক্সফোর্ডকে নিয়ে এলেন কলকাতায়।
এটাকেই পরিভাষায় বলে ‘হাইফিনেটেড আইডেন্টিটি’। ভাগ্যিস পৃথিবীতে একটা ‘হাইফেন’ ছিল, তা না হলে মানুষ বিপদে পড়ে যেত। সব ভাষাতেই হাইফেন আছে। ওই পুঁচকে একটা ভাষাচিহ্ন, তার যে এত জোর, সে যে গত ৫০ বছর মানুষের নতুন ইতিহাসকে ধরে রেখেছে, সেটা ভাবলে অবাক হতে হয়। অভিবাসনের ইতিহাস মানুষের নতুন ইতিহাস। আমেরিকা দাঁড়িয়ে আছে অভিবাসনের ওপর। অভিবাসন সরিয়ে নিন, কালকেই হোয়াইট হাউস পড়ে যাবে। পাশ্চাত্য সভ্যতাটাই দাঁড়িয়ে আছে এশিয়া-আফ্রিকার ওপর।
শুধু সিলিকন ভ্যালিতেই নয়, সাহিত্যের উপত্যকাতেও এশিয়া ছাড়া গতি নেই। ইংরেজি সাহিত্য এখন আর ইংরেজরা লেখেন না, লেখেন ভারতীয়রা, লেখেন আমেরিকানরা, লেখেন চাইনিজরা, লেখেন আফ্রিকানরা। কেতকী কুশারী ডাইসন কিন্তু সরাসরি একটা হাইফেন নন। তিনি রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের মেয়ে হয়েও, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের মেয়ে হয়েও, প্রেসিডেন্সি কলেজের মেয়ে হয়েও, শুক্তো-মৌরলা-লাউচিংড়ি খেয়ে বড় হলেও, অক্সফোর্ডে গিয়ে ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েও— বাংলা কবিতা লিখেছেন, বাংলায় উপন্যাস লিখেছেন, বাংলায় হাজার পৃষ্ঠার প্রবন্ধের বই লিখেছেন, বাংলায় নাটক করেছেন। আবার অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ করে আটলান্টিকের দু’পারেই যশ পেয়েছেন। বাঙালি মেয়ের এরকম বিশ্বায়ন সেই যুগে, অর্থাৎ গত শতকের ছয়ের দশকে কল্পনার বাইরে ছিল। এবং বলাই বাহুল্য, আরেক অক্সফোর্ড-নিবাসী বাঙালি লেখক নীরদ সি চৌধুরীকে নিয়ে যত আদিখ্যেতা ও উল্লম্ফন লক্ষ করা যায়, সেখানে কেতকী কুশারীকে নিয়ে কিন্তু একটা ‘চেপে দাও’ মনোভাব কাজ করে গেছে। মেয়েরা ভাল লিখলে সেটা হওয়ার কথা যদিও। আশাপূর্ণা দেবী থেকে মল্লিকা সেনগুপ্ত পর্যন্ত এই বিষন্ন ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে বাংলায়।
কেতকী কুশারী ঠিক করলেন অক্সফোর্ডে বসেই তিনি বাংলায় লিখবেন। সবচেয়ে কঠিন কাজ হল বিদেশে বসে নিজের ভাষায় লিখে যাওয়া। যার হাতে ইংরেজি ভাষা আছে, যার মস্তিষ্কে ইংরেজি ভাষা আছে, যার মুখে ইংরেজি ভাষা আছে, যার প্রতিদিনের জীবনে ইংরেজি ভাষা আছে, সে কেন কলকাতার ভাষায় লিখবে? তার হাতে ইংরেজি আছে মানে তার হাতে ভুবনডাঙা আছে। কেতকী কুশারী হয়ে উঠলেন বাই-লিঙ্গুয়াল। বাংলার রেনেসাঁ— সে তো দাঁড়িয়ে আছে বাংলা এবং ইংরেজি লেখার ওপর। বাঙালিরা যে কত ভাল ইংরেজি লিখতে পারে এবং ভারতবর্ষে তারাই প্রথম ইংরেজি লিখে দেখিয়েছে, সেটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। কেতকী অক্সফোর্ডে বসে সেই বাই-লিঙ্গুয়াল রেনেসাঁর বাঙালিকে আরও একবার সামনে তুলে আনলেন।

তিনি একটা জিনিস ভেঙে ফেললেন। সেটা ভাঙতে কোনও বুলডোজার লাগেনি। লেগেছিল একটা দু’টাকার কলম। সাহিত্যে একটা দেওয়াল আছে, সেই দেওয়ালের এপারে লেখা ‘পাণ্ডিত্য’, ওপারে লেখা ‘প্রতিভা’। মধ্যে যে-সম্পর্ক, সেটা অনেকটা ভাসুর-ভাদ্র বউয়ের সম্পর্কের মতো। সেই সম্পর্কটাকে কেতকী কুশারী মোলায়েম করতে চেয়েছিলেন। করেও ছিলেন, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন ‘নোটন নোটন পায়রাগুলো’ পড়ি। আমরা যখন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে বিরাট গবেষণা পাঠ করি, তখন বুঝতে পারি তিনি কী করে গেছেন।
আমি তখন খুব ছোট, যখন শনিবার সকালেই ‘দেশ’ পত্রিকা হাতে চলে আসত, আর সেই পত্রিকা খুলে প্রথমেই পড়তাম ‘নোটন নোটন…’। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এবং রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম বই লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ, কিন্তু তারপরে কেতকীর গবেষণা আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে আর্জেন্টিনা থেকে কলকাতা বা আর্জেন্টিনা থেকে শান্তিনিকেতন হয়ে ফের আর্জেন্টিনা— এক বিরাট ভুবন ছড়িয়ে রয়েছে, যা হাতের মুঠোয় ধরে ফেলেছিলেন তিনি। একটা জিনিস লক্ষ করতে হয় যে, যে-বই তিনি ইংরেজিতে লিখতে পারতেন, সে-বই তিনি লিখলেন বাংলায়। এখানেই তিনি হয়ে উঠলেন অনন্যা। ভেঙে ফেললেন সেই দেওয়ালটাকে, যা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা দেওয়ালটা টপকাতে পারছিলাম না, কেতকী কুশারী সেই দেওয়াল সরিয়ে আমাদের হাত ধরে ওপারে নিয়ে গেলেন।

গত শতকের সাত-আটের দশকজুড়ে, একজন নবীন লেখক হিসাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় নিয়মিতভাবে কেতকী কুশারীর কবিতা পড়তাম। আর সেই সব কবিতা নিয়ে নবীন লেখক-কবিদের মধ্যে তর্ক হত, সে-তর্কে আমিও অংশ নিতাম। সব সময়ে যে তাঁর কবিতা খুব আধুনিক মনে হত, তা কিন্তু নয়। সে-সময়ে বহু ভাল কবি তখন সাহিত্যমহলে বিখ্যাত— দেবারতি মিত্র, ভাস্কর চক্রবর্তী, কালীকৃষ্ণ গুহ, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, শামশের আনোয়ার, সুব্রত চক্রবর্তী-সহ অনেকের কবিতাই ছয় দশকের মাটি থেকে উঠে এসেছিল। সময়ের হিসেব করলে কেতকী কুশারী ষাটের সমসাময়িক। লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে কেতকী কুশারীর কথা খুব একটা শোনা যেত না, বরঞ্চ এলিট শ্রেণির লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা দেখা যেত; যেমন শিবনারায়ণ রায়ের ‘জিজ্ঞাসা’য়। যেরকম জগদীশ ভট্টচার্যের ‘কবি ও কবিতা’য় দেখা যেত কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। কবি হিসেবে কেতকী কুশারী ছিলেন গীতা চট্টোপাধ্যায়ের একেবারে বিপরীত মেরুতে। দেবারতি মিত্র কিংবা ভাস্কর চক্রবর্তীর দুই কাব্যজগৎ থেকে কয়েকশো মাইল দূরে। হবে নাই-বা কেন, তিনি তো অক্সফোর্ডে বসে লিখতেন! আর তো কোনও বাঙালি কবি অক্সফোর্ডে বসে বাংলা কবিতা লেখেননি! কবিতা সিংহের ধারালো বিন্যাস, ঝাঁ-চকচকে উচ্চবর্ণের কবিতাকে বর্জন করে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজস্ব ভাষা, এবং সেটা ছিল পাণ্ডিত্য ও প্রতিভার যুগলবন্দি।