মুশাল হুসেন মালিক : প্রেম, রাজনীতি আর রঙিন ক্যানভাসের বর্ণময় জীবন

মৃনাল কান্তি দাস ইসলামাবাদে তখন ক্ষমতার পালাবদল চলছে! প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পদ ছেড়েছেন। তৈরি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন প্রধানমন্ত্রী আনওয়ার উল হক কাকরের নেতৃত্বে পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নতুন করে নিজেদের....

মৃনাল কান্তি দাস

ইসলামাবাদে তখন ক্ষমতার পালাবদল চলছে! প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পদ ছেড়েছেন। তৈরি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন প্রধানমন্ত্রী আনওয়ার উল হক কাকরের নেতৃত্বে পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নতুন করে নিজেদের সাজাচ্ছে, ঠিক তখনই সামনে আসে একটি নাম— মুশাল হুসেন মালিক। সালটা ২০২৩-এর আগস্ট।

 

খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন ওঠে— কেন? মুশাল তো শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন। তিনি এমন একজন ব্যক্তির স্ত্রী, যিনি ভারতের কাছে জম্মু ও কাশ্মীরের অন্যতম পরিচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা— ইয়াসিন মালিক। আর সেই ইয়াসিন মালিক ভারতের তিহাড় জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা খাটছেন। একদিকে দিল্লির তিহাড়ের কারাগার। অন্যদিকে ইসলামাবাদের ক্ষমতার কেন্দ্র। এই দুই প্রান্তকে যেন একটি অদৃশ্য সুতোয় জুড়ে রেখেছে একটি নাম— মুশাল হুসেন মালিক।
শুরুটা কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে নয়! ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম মুশালের। রাজনীতি তাঁর পরিবারের কাছে অপরিচিত ছিল না। তাঁর মা রেহানা হুসেন পাকিস্তান মুসলিম লিগের মহিলা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেন। বাবা এম এ হুসেন ছিলেন অর্থনীতির অধ্যাপক। প্রথম কোনো পাকিস্তানি হিসেবে নোবেল পুরস্কারের জুরি কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান। দাদাও ছিলেন অধ্যাপক। অর্থাৎ মুশালের বেড়ে ওঠা হয়েছিল শিক্ষা, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে। তবে তাঁর নিজের পথ প্রথমে অন্য রকম ছিল।

 

অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে স্নাতক হন। কিন্তু সংখ্যার জগতের চেয়ে তাঁকে বেশি টানত রং ও ক্যানভাস। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই ছবি আঁকা শুরু। ক্রমে চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেন মুশাল। তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে এসেছে নারী। বিশেষ করে নারীদেহ। প্যাস্টেল, কাঠকয়লা, ক্যানভাস—বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। করেছেন গ্লাস পেন্টিংও। আর তাঁর শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল কাশ্মীর। কিন্তু শিল্পীর ক্যানভাসের বাইরে আরেকটি কাশ্মীর তখন তাঁর জীবনে ঢুকে পড়েছে। সেটি রাজনীতির কাশ্মীর। আর সেই দরজা খুলেছিলেন ইয়াসিন মালিক।

 

২০০৫ সাল। পাকিস্তানে এসেছিলেন ইয়াসিন মালিক। সেই সময় মুশাল তাঁর একটি বক্তৃতা শুনেছিলেন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর মুশাল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে যান। উদ্দেশ্য—অটোগ্রাফ নেওয়া। একটি অটোগ্রাফ। একটি সাক্ষাৎ। তারপর? সেখান থেকেই শুরু হয় ঘনিষ্ঠতা। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হয়। দু’জনের বয়সের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। মুশালের বয়স তখন কুড়ির কোঠায়। ইয়াসিন চল্লিশ পেরিয়েছেন। কিন্তু বয়স সেই সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ২০০৯ সালে ইসলামাবাদে বিয়ে করেন তাঁরা। মুশালের বয়স তখন ২৩। ইয়াসিনের ৪২। বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলের বহু পরিচিত মুখ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান হয়।

 

কিন্তু মুশালের ব্যক্তিগত জীবনের এই রোম্যান্টিক অধ্যায়ের আড়ালে তখন আরও বড় একটি বাস্তবতা তৈরি হচ্ছিল। ইয়াসিন মালিকের বিরুদ্ধে ভারতের তদন্ত এগোচ্ছিল। এবং একদিন সেই গল্প পৌঁছে যায় আদালতে। ইয়াসিন মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সন্ত্রাসে অর্থায়ন, বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ এবং ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার। ২০২২ সালের ২৪ মে দিল্লির আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। মামলায় ইয়াসিন বিভিন্ন অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। আদালত অবশ্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, তাঁর মামলা ‘বিরলতমের মধ্যে বিরলতম’ শ্রেণিতে পড়ে না। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ সেখানেই থামেনি। তারা সাজা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। তাদের দাবি— ইয়াসিন কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির মুখ ছিলেন না, সন্ত্রাসের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও নাশকতায় প্রত্যক্ষ ভূমিকারও প্রমাণ রয়েছে।

 

আর মুশাল? তিনি মেয়েকে নিয়ে ইসলামাবাদে থেকে গেলেন। কিন্তু এখানেই গল্পটি নতুন মোড় নেয়। ইয়াসিনের স্ত্রী হওয়ার কারণে মুশালের পাকিস্তানি রাজনৈতিক মহলে যোগাযোগ ছিলই। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কাশ্মীর নিয়ে নিয়মিত কথা বলতেন। ভারতবিরোধী মন্তব্য করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যও আলোচনায় আসত। ক্রমে তিনি শুধু ‘ইয়াসিন মালিকের স্ত্রী’ রইলেন না। তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের একটি পরিচিত মুখ। আনওয়ার উল হক কাকরের অন্তর্বর্তী সরকারে মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরের উপদেষ্টা হিসেবে মুশাল হুসেন মালিককে নিয়োগ করা হল। পদটি কার্যত তদারকি সরকারের মন্ত্রিসভার অংশ। অর্থাৎ ভারতের কারাগারে বন্দি এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার স্ত্রী এবার পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতার আনুষ্ঠানিক পরিসরে। দিল্লির প্রতিক্রিয়া এল দ্রুত। প্রশ্ন উঠল— যে ব্যক্তির স্বামী ভারতের আদালতে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ সংক্রান্ত মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, তাঁর স্ত্রীকে পাকিস্তান সরকার কেন মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার দায়িত্ব দিচ্ছে? কিন্তু গল্পের আসল নাটক তখনও বাকি। এবার মঞ্চ বদলাল— পিওকে।

 

কয়েক বছর পর মুশালের সামনে এল আরও অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। এবার বিতর্কের কেন্দ্র পাক অধিকৃত কাশ্মীর। সেখানে বিক্ষোভ। ক্ষোভ। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলন। জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি বা জেএএসি বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নামে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ— দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মৌলিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। পানীয় জল, রাস্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, অর্থনৈতিক সুবিধা— একাধিক প্রশ্নে ক্ষোভ জমছিল। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়। মুজফ্‌ফরাবাদের দিকে পদযাত্রার ডাক আসে। অভিযোগ ওঠে, আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শক্তি প্রয়োগ করছে।

 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে সংঘর্ষে বহু মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে আসে। আর তখনই মুশাল হুসেন মালিক আবার সামনে এলেন। কিন্তু এবার তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য ভারত নয়। পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী। মুশাল প্রস্তাব দিলেন—সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতা করা হোক। আলোচনায় বসুক দুই পক্ষ। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, শান্তিপূর্ণ আলোচনাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পথ। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির-সহ সামরিক নেতৃত্বের কাছেও তিনি জরুরি পদক্ষেপের আবেদন জানান বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, পিওকে-র মানুষ মৌলিক সুবিধা চান। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়। কারণ এতদিন মুশালকে মূলত দেখা হয়েছে ভারতবিরোধী কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদের মুখ হিসেবে। এবার তিনি কথা বলছেন পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের ক্ষোভ নিয়ে।

 

 

আর সেই মুহূর্তেই প্রশ্ন ওঠে, মুশাল কি শুধুই মধ্যস্থতাকারী? নাকি তাঁর পিছনে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে? পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই প্রস্তাবের পিছনে অন্য হিসাবও থাকতে পারে। পিওকে-র মানুষের ক্ষোভ যখন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাড়ছে, তখন একজন পরিচিত কাশ্মীরি মুখকে সামনে রেখে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা হতে পারে। মুশাল এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আবার পাকিস্তানের রাজনীতিতেও গ্রহণযোগ্য। ফলে তাঁর মাধ্যমে একটি বার্তা পৌঁছনো সম্ভব— কাশ্মীরিরা পাকিস্তানের শত্রু নয়। মুশালের বক্তব্যেও এমন সুর পাওয়া যায়।

 

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। এটি কি নিছক মানবিক উদ্যোগ? নাকি রাষ্ট্রের হয়ে ক্ষোভ প্রশমনের একটি কৌশল? জেএএসি-র নেতাদের অবস্থান অবশ্য স্পষ্ট। আলোচনার ডাক এলেও তারা সহজে নরম হয়নি। তাদের বক্তব্য, যে বাহিনী আন্দোলন দমন করতে অস্ত্র হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। রাওয়ালকোট, মীরপুর, ধীরকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ চলতে থাকে। অর্থাৎ মুশাল যতই আলোচনার দরজা খুলতে চান, রাস্তার ক্ষোভ তত সহজে থামছে না। এখানে এসে গল্পটি যেন আবার একটি পুরনো প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের কাশ্মীর নীতি আসলে কে ঠিক করে? নির্বাচিত সরকার? রাজনৈতিক দল? নাকি সেনাবাহিনী?

 

একদিকে তিহাড়ের একটি সেল। সেখানে বন্দি ইয়াসিন মালিক। অন্যদিকে ইসলামাবাদের ক্ষমতার করিডর। সেখানে তাঁর স্ত্রী মুশাল হুসেন মালিক। একজন ভারতের আদালতে দণ্ডিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। অন্যজন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠা তাঁর স্ত্রী। আর মাঝখানে কাশ্মীর। যে কাশ্মীর কখনও ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাতের কেন্দ্র, কখনও আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয়, কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতীক, আবার কখনও পাকিস্তান-অধিকৃত অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব ক্ষোভের বিস্ফোরণ। মুশালের জীবন যেন সেই জটিল কাশ্মীর সমস্যারই একটি প্রতিচ্ছবি। একজন অর্থনীতিবিদ পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের ছাত্রী। চিত্রশিল্পী। নারীদেহের ছবি আঁকা নিয়ে বিতর্কিত শিল্পী। ইয়াসিন মালিকের প্রেমিকা। তারপর স্ত্রী। এক সন্তানের মা। ইয়াসিনের কারাবন্দিত্বের পর তাঁর রাজনৈতিক মুখপাত্রসদৃশ ভূমিকা। আর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তারপর আবার পিওকে-র আন্দোলনের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাবদাতা। পিওকে-কে শান্ত করতে ইসলামাবাদের কাছে এখন মুশালই ভরসা!

 

কিন্তু শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়— মুশাল হুসেন মালিকের উত্থান কি শুধুই একজন প্রভাবশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার স্ত্রী হিসেবে তাঁর পরিচয়ের ফল? নাকি এর পিছনে পাকিস্তানের কাশ্মীর-রাজনীতির আরও গভীর সমীকরণ রয়েছে? মুশাল হুসেন মালিক আসলে কে? ইসলামাবাদের আড়কাঠি নাকি মানবাধিকার কর্মী? প্রশ্নটা আরও বড়। তাঁকে সামনে রেখে পাকিস্তান আসলে কোন গল্পটি বলতে চাইছে? আর সেই গল্পের শেষ দৃশ্য কোথায়? তিহাড়ের কারাগারে? ইসলামাবাদের মন্ত্রিসভায়? নাকি মুজফ্‌ফরাবাদের উত্তাল রাস্তায়?
কাশ্মীরের গল্পে এই প্রশ্নের উত্তর এখনও লেখা হয়নি…।