আলিমুজ্জামান
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম মুসলিম নারী—শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ। কিন্তু তাঁর গল্প শুধু একটি ঐতিহাসিক ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়। শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও কূটনীতিতে নিজের সময়ের প্রচলিত সীমা অতিক্রম করা এই নারীর উত্তরাধিকার পরের প্রজন্মেও বহন করেছেন তাঁর দুই মেয়ে—কেমব্রিজপড়ুয়া সালমা সোবহান ও প্রিন্সেস সারওয়াত এল হাসান।
১৯১৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ পড়াশোনা করেন লরেটো কলেজে। পরে লন্ডনে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং উর্দু উপন্যাস ও ছোটগল্পের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘Development of the Urdu Novel and Short Story’। তিনি শুধু একাডেমিক অর্জনেই থেমে থাকেননি; সাহিত্যচর্চা, রাজনীতি ও কূটনীতিতেও নিজের জায়গা তৈরি করেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শায়েস্তা দেশটির প্রথম গণপরিষদের দুই নারী প্রতিনিধির একজন হন। পরে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশ নেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত মরক্কোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ যে সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও জনজীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, সে সময়েই শায়েস্তা নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন একাধিক পরিচয়—শিক্ষাবিদ, লেখক, রাজনীতিক ও কূটনীতিক।
এই শায়েস্তারই মেয়ে সালমা সোবহান পরবর্তী সময়ে মায়ের শিক্ষার উত্তরাধিকারকে আইন ও মানবাধিকারের জগতে নিয়ে যান। ইংল্যান্ডে পড়াশোনার পর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Girton College-এ আইন পড়েন। ১৯৫৯ সালে Lincoln’s Inn থেকে বার-এ ডাক পান এবং পাকিস্তানের প্রথম নারী ব্যারিস্টার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল Ain o Salish Kendra-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করা।
সালমার নিজের ভাষাতেও মায়ের প্রভাব ছিল গভীর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি শায়েস্তাকে তাঁর ‘idol’ ও ‘inspiration’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। মায়ের কাছ থেকেই মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
আরেক মেয়ে প্রিন্সেস সারওয়াত এল হাসানের পথ ছিল ভিন্ন। তিনিও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিন তালালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং তিনি জর্ডানের রাজপরিবারের সদস্য হন। রাজপরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষা, নারী ও পরিবার, সামাজিক কল্যাণ এবং স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
একজন মা—যিনি নিজের সময়ে উচ্চশিক্ষা ও জনজীবনে নারীর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর এক মেয়ে কেমব্রিজে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হয়ে বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন; অন্য মেয়ে কেমব্রিজের শিক্ষা নিয়ে জর্ডানের রাজপরিবারে গিয়ে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের কাজে যুক্ত হলেন।
তাই শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহর গল্পকে শুধু ‘প্রথম মুসলিম নারী পিএইচডি’ অর্জনের গল্প বললে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উত্তরাধিকার হয়তো তাঁর দুই মেয়ের জীবনেই—একজনের হাতে আইন ও মানবাধিকার, অন্যজনের হাতে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন। তিন নারী, তিনটি আলাদা পথ; কিন্তু তাঁদের গল্পের কেন্দ্রে একই শক্তি—শিক্ষা।