ঠিকঠাকসরকারি অনুমোদন ও কাগজপত্র না থাকার অভিযোগে রাজ্যের খারিজি মাদ্রাসা গুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। প্রথম দফায় রাজ্যজুড়ে ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা অবিলম্বে বন্ধ করার কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর। এর পাশাপাশি আরও প্রায় ১০০টি মাদ্রাসাকে পাঠানো হয়েছে কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিস। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বন্ধের নির্দেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলির সিংহভাগই ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়-পরিচালিত তথাকথিত ‘খারিজি মাদ্রাসা’।
রাজ্য জুড়ে মাদ্রাসা গুলোতে বিশাল সমীক্ষা সরকারের
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২২ জুলাই রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের উদ্যোগে কলকাতা-সহ প্রতিটি জেলায় একযোগে একটি মেগা সমীক্ষা চালানো হয়। জেলাশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত এই সমীক্ষায় অনুমোদিত, অননুমোদিত, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত, বেসরকারি ও স্থানীয় ট্রাস্ট পরিচালিত সমস্ত মাদ্রাসার পরিকাঠামো, শিক্ষাক্রম এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয়। সেই সমীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়তেই এই কড়া পদক্ষেপ প্রশাসনের। রিপোর্টে উঠে আসে— রাজ্যের প্রায় ২ হাজার ৩৯৬টি মাদ্রাসার কোনও বৈধ সরকারি অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন নেই। যথাযথ নথিপত্র না থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিকাঠামো এবং পাঠ্যক্রমের অস্পষ্টতার কারণেই প্রথম ধাপে ২৫২টি প্রতিষ্ঠানকে তালা ঝোলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক নজরে সরকারি সমীক্ষা ও পদক্ষেপ
————————————————————-
• মোট অনুমোদনহীন মাদ্রাসা চিহ্নিত : প্রায় ২,৩৯৬টি
• প্রথম দফায় সরাসরি বন্ধের নির্দেশ : ২৫২টি
• শোকজ নোটিস পাঠানো হয়েছে : ১০০টি মাদ্রাসাকে
• মূল ফোকাস : পরিকাঠামো, অনুমোদন ও আধুনিক পাঠ্যক্রম
মূল লক্ষ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ?
রাজ্য প্রশাসনের বক্তব্য, সংখ্যালঘু পড়ুয়াদের কেবল গতানুগতিক শিক্ষার গণ্ডিতে আটকে না রেখে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মূল স্রোতে নিয়ে আসাই এই পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য। বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে।
সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা খাতে বরাদ্দ বিপুল সরকারি অর্থের সুফল যাতে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা পায়, তা নিশ্চিত করতেই এই নজরদারি। মাদ্রাসার পড়ুয়ারা যাতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী কিংবা আইএএস-আইপিএস (IAS/IPS)-এর মতো সর্বভারতীয় প্রশাসনিক পদে জায়গা করে নিতে পারে, সেই লক্ষ্যেই শিক্ষা ব্যবস্থার এই শুদ্ধিকরণ অভিযান। যদিও রাজ্য সরকারের এই হঠাৎ ও বিশাল সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব হয়েছেন অনেকেই। অনেকেই এটাকে মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার স্বাধীনতার উপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এদিকে সরকারের এই পদক্ষেপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে জেলাগুলিতে। একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের নামে যথেচ্ছ পাঠদান ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা বন্ধ হওয়া জরুরি ছিল। তবে হঠাৎ করে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে পাঠরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কি হবে, তাদের পড়াশোনা কিভাবে চলবে? তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এই বিষয়ে সরকারের কোনো স্পষ্ট দিক নির্দেশনা নেই বলেই অভিযোগ তুলেছেন তারা। এই বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি তুলেছেন অভিভাবক ও পরিচালন সমিতিগুলির একাংশ।
এদিকে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শোকজ পাওয়া ১০০টি প্রতিষ্ঠানের জবাব সন্তোষজনক না হলে পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলির বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাকি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে যাচাই প্রক্রিয়া চলবে। অর্থাৎ এই মাদ্রাসা গুলোর বিরুদ্ধে অভিযান এখনই শেষ হচ্ছে না। খুব শীঘ্রই আরও অসংখ্য খারিজি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নেমে আসতে পারে একই সিদ্ধান্ত। তবে মুসলিম সমাজে এর কি প্রতিক্রিয়া হয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া মাদ্রাসা গুলির পরিচালন সমিতি পক্ষ থেকে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয় এখন সেটাই দেখার।