জেন জি-র প্রতিবাদে নেহা বোরা,হাতিয়ার সমাজমাধ্যম

অরূপ কালী   সামাজিক মাধ্যম খুললেই একটা মুখ সামনে ভেসে আসছে। এক প্রতিবাদীর মুখ। বারবার পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙছেন। পুলিশ ভ্যানে তুললে সেখান থেকেও আওয়াজ তুলছেন। নাছোড় এক মেয়ে। নেহা বোরা।....

অরূপ কালী

 

সামাজিক মাধ্যম খুললেই একটা মুখ সামনে ভেসে আসছে। এক প্রতিবাদীর মুখ। বারবার পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙছেন। পুলিশ ভ্যানে তুললে সেখান থেকেও আওয়াজ তুলছেন। নাছোড় এক মেয়ে। নেহা বোরা। এই মুহূর্তে প্রতিবাদ আন্দোলনের এক মুখ। যাঁকে পুলিশ আটক করে দমিয়ে রাখতে পারছে না।

নেহা মাটিতে লড়ছেন। আর অন্তরজালের মধ্যে দিয়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে রিলস হচ্ছে, গান তৈরি হচ্ছে। হাজারে হাজারে শেয়ার হচ্ছে। একটা প্রতিবাদী মুখ কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে পারে, নেহা যেন তারই উদাহরণ।

মুম্বইয়ে ‘ককরোচ’দের প্রতিবাদকে ছাপিয়ে যন্তরমন্তরে নেহার পিছনে দৌড়চ্ছে সংবাদমাধ্যম। যে ছবি হয়তো কয়েক বছর আগেও কোনও ছোট খবর হয়ে থেকে যেত, আজ সেটাই মোবাইলের পর্দায় পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে।

এটাই জেন জি-র সময়। এই প্রজন্মের প্রতিবাদও তাই আগের মতো নয়। মিছিল আছে, স্লোগান আছে, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আছে মোবাইল ক্যামেরা। আছে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এক্স, ফেসবুক। আছে রিলস। আছে মিম। আছে লাইভ। একটা আন্দোলনের ময়দান এখন আর শুধু রাস্তায় নয়। সেই আন্দোলনের আর একটা ময়দান তৈরি হচ্ছে সমাজমাধ্যমে।

জেন জি-র একটা বড় অংশ রাজনীতিকে দেখছে নিজের মতো করে। দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে তারা সবসময় আগ্রহী নয়। কিন্তু ৩০ সেকেন্ডের একটা ভিডিও, একটা ছবি, একটা স্লোগান কিংবা একটা শক্তিশালী মুখ তাদের থামিয়ে দিতে পারে। সেই ভিডিও শেয়ার হতে পারে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে। একটা আন্দোলনের ভাষা তাই বদলে যাচ্ছে।

নেহা সেই বদলে যাওয়া রাজনীতিরই একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সামাজিক মাধ্যমকে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা যেন দেখিয়ে দিচ্ছেন আইসা নেত্রী। নেহা থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ নিয়ে পিএইচডি করছেন। ক্যামেরার সামনে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে হয়, সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। প্রতিবাদ করছেন, আবার সেই প্রতিবাদের ছবি কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছবে, সেটাও বুঝছেন।
এখানেই হয়তো নেহার সাফল্য।
কারণ আজকের রাজনীতিতে শুধু রাস্তায় থাকা যথেষ্ট নয়। রাস্তায় কী ঘটছে, সেই ছবি কত দ্রুত মানুষের মোবাইলে পৌঁছচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। একটা ব্যারিকেড ভাঙার দৃশ্য হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যে রিল হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের ভ্যানে বসে নেহার স্লোগান হয়তো পরের মুহূর্তেই অন্য শহরের তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

প্রতিবাদ এখন শুধু প্রতিবাদ নয়। প্রতিবাদ এখন একটা ভিজ্যুয়ালও।

বর্তমান রাজনীতি সামাজিক মাধ্যমকে সরিয়ে রেখে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিটা মুহূর্ত এখন ফ্রেমবন্দি। পান থেকে চুন খসলেই নেতা-নেত্রীকে ঘিরে মিম হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল। শুধু নেতাদের বক্তব্য নয়, তাঁদের বাচনভঙ্গি পর্যন্ত ক্যামেরাবন্দি হচ্ছে। তাঁদের শরীরী ভাষা নিয়ে সমাজমাধ্যমে কাঁটাছেঁড়া চলছে।
রাজনীতির ময়দানে তাই এখন বক্তৃতার পাশাপাশি ‘ইমেজ’ও গুরুত্বপূর্ণ। কে কী বলছেন, তার সঙ্গে প্রশ্ন হচ্ছে—কীভাবে বলছেন? কীভাবে দাঁড়াচ্ছেন? পুলিশের সামনে কী করছেন? ক্যামেরার সামনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন?

জেন জি-র কাছে রাজনীতি অনেকটাই এই ছবিগুলোর মধ্য দিয়ে পৌঁছচ্ছে।
নেহা সেটা বুঝেছেন। নিট থেকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ—ইস্যুর পর ইস্যুতে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সমাজমাধ্যমকে হাতিয়ার করে প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠতে পেরেছেন তিনি। তাঁর প্রতিবাদ এখন শুধু দিল্লির রাস্তায় আটকে নেই। মোবাইলের স্ক্রিন পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে।

এই জায়গাটা রাজনৈতিক দলগুলির কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় কোনও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠতে বছরের পর বছর মাঠে থাকতে হত। সংগঠনের মধ্যে কাজ করতে হত। বড় নেতাদের নজরে আসতে হত। এখন সেই পথ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। একটি শক্তিশালী ভিডিও, একটি ভাইরাল বক্তব্য, একটি প্রতিবাদী ছবি একজন অচেনা মানুষকেও কয়েক দিনের মধ্যে পরিচিত করে তুলতে পারে।
তবে এর অন্য দিকও আছে।
সমাজমাধ্যম যেমন কাউকে খুব দ্রুত জনপ্রিয় করে, তেমনই খুব দ্রুত ভুলিয়েও দিতে পারে। আজ যে মুখ ভাইরাল, কাল তার জায়গায় অন্য মুখ। আজ যে স্লোগান ট্রেন্ড করছে, কয়েক দিন পর সেটাই হারিয়ে যেতে পারে। ফলে সমাজমাধ্যমের জনপ্রিয়তা আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা—দুটো এক জিনিস নয়।

নেহার সামনে তাই শুধু প্রতিবাদের রাস্তা নয়, আরও একটা কঠিন রাস্তা খোলা। ভাইরাল মুখ থেকে কি তিনি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠতে পারবেন?

সমাজমাধ্যমের জনপ্রিয়তাকে কি তিনি সংগঠনে পরিণত করতে পারবেন? নাকি তাঁর রাজনীতি জেন জি-র আর পাঁচটা ভাইরাল প্রতিবাদের মতোই একটা সময়ের পর অন্য কোনও মুখের আড়ালে চলে যাবে?

আর একটা প্রশ্নও থাকছে
——————————-
আইসা নেত্রীর রাজনীতি কি ওই দলেই থেকে এগোবে? নাকি কানাইয়া কুমারের মতো ট্র্যাক বদল করবেন?
নেহা কোন পথে যাবেন?
সমাজমাধ্যমের প্রতিবাদী মুখ হিসেবেই থাকবেন, নাকি আগামী দিনের রাজনীতির নতুন মুখ হয়ে উঠবেন?
উত্তর দেবে সময়।