ফিচার ধর্মীয় কট্টরতা বা রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাঙালির শারদোৎসব

সুমন সাধু উত্তর বা পশ্চিম ভারতের নবরাত্রির সঙ্গে বাংলার দুর্গাপুজোর তফাৎ ভীষণ মৌলিক। নবরাত্রি যেখানে মূলত ব্রত, উপবাস বা কতগুলি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ; সেখানে দুর্গাপুজো কেবল কোনো গণ্ডিবদ্ধ....

সুমন সাধু

উত্তর বা পশ্চিম ভারতের নবরাত্রির সঙ্গে বাংলার দুর্গাপুজোর তফাৎ ভীষণ মৌলিক। নবরাত্রি যেখানে মূলত ব্রত, উপবাস বা কতগুলি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ; সেখানে দুর্গাপুজো কেবল কোনো গণ্ডিবদ্ধ ধর্মাচরণের বেড়াজালে আটকে থাকে না। দুর্গাপুজো সমগ্র বাঙালির সর্বাঙ্গীন জীবনচর্চা ও আত্মোপলব্ধি। যেখানে ভক্তির অর্ঘ্য আর সৃষ্টির বিপ্লব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

 

বাঙালির এই শারদোৎসবের শিকড় জুড়ে ইতিহাস, যা বাঙালির অজানা নয়। প্রথম বাড়ির দুর্গাপুজো বা পারিবারিক পুজোগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং কুলীন আভিজাত্যের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার বা শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয় যে আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার গন্ধ রয়েছে, তা এক সময়ের বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতিচ্ছবি। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই অন্দরমহলের ঘেরাটোপ থেকে দুর্গাপুজো নেমে আসে রাজপথে, সাধারণ মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে। আসে প্রথম বারোয়ারি পুজো। বারোয়ারি কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সর্বজনীনতার আসল মন্ত্র—বারো ইয়ারের মিলিত প্রয়াস। সমাজের আটপৌরে মানুষ, কৃষক, কারিগর, বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত সবাই মিলে যখন পুজোর চাঁদা তুলে প্রতিমা গড়লেন, তখনই রচিত হলো প্রকৃত বাঙালির সাম্যবাদের প্রথম সোপান। বারোয়ারি পুজো কেবল পুজোর রূপ বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল ক্ষমতার সমীকরণও।

 

এই বিবর্তনের পথ ধরেই ধীরে ধীরে ভাঙে প্রথা। সাবেকি একচালা প্রতিমার কাঠামো ভেঙে হাজির হয় তিনচালা, যা পরবর্তীকালে শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রতিমার গড়নে, চালচিত্রের ব্যবহারে এবং ধারণায় আসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর সেই নিরীক্ষার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় আধুনিক যুগে এসে, যখন পুজোয় যুক্ত হলো প্রথম থিম বা ভাবনার ধারণা। থিম পুজোর ভাবনা কেবল প্যান্ডেল সজ্জার অভিনবত্ব নয়; এটাই তো বাঙালির নান্দনিক বিপ্লব। সমাজ সচেতনতা, সাহিত্য, রূপক কিংবা কোনো সমসাময়িক রাজনৈতিক বার্তা যখন বিশাল সব প্যান্ডেলের বাঁশ-কাপড়-কাঠের ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন পুজো নিছক মণ্ডপদর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে বাঙালি সময়কে ধরে রাখতে জানে, আবার সময়কে প্রশ্ন করতেও পিছপা হয় না।

 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দুর্গাপুজো আর কেবল বাংলার কোনো আঞ্চলিক উৎসব হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাবলিক আর্ট ফেস্টিভ্যাল। ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই পরম্পরা আজ বিশ্ববাসীর দরবারে প্রতিষ্ঠিত। দুর্গাপুজোর কয়েকদিন গোটা বাংলা যেন এক উন্মুক্ত শিল্পালয়। না থাকে টিকিট কাউন্টার, না থাকে গরিব-বড়লোকের ভেদরেখা। ভাস্কর্য থেকে আলোকশিল্প, সাউন্ড ডিজাইন থেকে ইনস্টলেশন—সবকিছু মিলেমিশে এক বিশাল বহুমাত্রিক শিল্পকর্মে রূপ নেয়।

 

আর শিল্পের এই বিপুল কোলাহলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঙালির ভক্তি, বাঙালির বিশ্বাস। কিন্তু বাংলার পুজোয় এই ভক্তি কোনো ভয় বা অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বাংলার সাধক-কর্তারা দুর্গাকে সর্বময়ী মহাশক্তি হিসেবে না দেখে, বাংলার আটপৌরে ঘরের সাধারণ আদরের মেয়ে হিসেবে রূপায়ন করেছেন। শরৎকালে মর্ত্যে বাপের বাড়ি আগমন যেন গিরিরাজ হিমালয় আর মেনকার বুক জুড়ে আনন্দের প্লাবন আনে। বাংলার প্রতিটি ঘরে কন্যাসন্তানের আগমনী আনন্দ ফুটে ওঠে। পতির ঘরের দারিদ্র্য ও শিবের অমঙ্গলময় রূপের মাঝেও উমার বাল্যস্মৃতি এবং বিজয়া দশমীতে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার সময় মেনকার আকুল কান্না তো সর্বজনীন মাতৃহৃদয়ের চিরন্তন বিচ্ছেদেরই রূপ। এই মিলন ও বিরহেই দুর্গা পূজিত আদরে, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে। এখানেই ভক্তি আর বিপ্লব এক বিন্দুতে এসে মিলে যায়। কারণ সমাজ পরিবর্তনের যে লড়াই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তোলার যে স্পৃহা, তার পেছনেও থাকে এক গভীর অন্তরের শক্তি— বাঙালিরা তাদের আরাধনায় খুঁজে নেয় মুক্তির শক্তি।

 

 

মুক্তি যেমন মনে, মুক্তি শরীরেও। জীবে প্রেম থেকে জীভে প্রেম খুঁজে নিয়েছে বাংলা। পৌরাণিক যুগ থেকেই পুজোয় নানান রান্নার পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণ বা মা-দিদাদের গল্প থেকে নানান বিষয়ে বিশদে জানা যায়। যেমন: শাক্ত মতে দেবী দুর্গাকে শক্তিরূপী ও মহাশক্তি হিসেবে পুজো করা হয়। প্রাচীনকালে বনেদি বাড়িতে নবমীর দিনে বলি প্রথার প্রচলন ছিল এবং সেই বলির মাংস দেবীকে নিবেদন করে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হতো। অন্যদিকে, বাঙালি সমাজে দুর্গাকে ঘরের মেয়ে হিসেবে দেখা হয়, যিনি বছরে একবার পিতৃগৃহে আসেন। মেয়ের আগমন উপলক্ষ্যে এখানে উপবাস বা কঠোর সংযমের চেয়ে আনন্দ, উল্লাস ও ভোজনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে চিরকাল। আবার সমৃদ্ধি ও শুভ প্রতীক হিসেবেও মাছ-মাংসকে মানেন অনেকে। মাছ-মাংসের মধ্যে রয়েছে প্রাচুর্য, উর্বরতা ও আনন্দ। বিশেষ করে বিজয়া দশমীতে মাছ খাওয়ার প্রথা বা আমিষ পদ দিয়ে বরণ ও উদযাপনের রীতি বহু পুরোনো। আর আঞ্চলিক বৈচিত্র‍্য তো একমাত্র ভারতেই সম্ভব। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নবরাত্রির সময় নিরামিষ বাউপবাসের চল থাকলেও পূর্ব ভারতে (যেমন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম) মাছ-মাংস দৈনন্দিন খাদ্য সংস্কৃতির অঙ্গ হওয়ায় পুজোয় আমিষ খাওয়ার প্রচলন স্বাভাবিক বলেই গণ্য হয়।

 

বিধান যাই হোক, শাস্ত্র যাই বলুক, বাঙালি নিজের মতো করে তার খাবারের তালিকা সাজিয়ে নিয়েছে। মহাষ্টমীর অঞ্জলি থেকে নবমীর রাতের জমজমাট ভোজ—খাবার বাঙালির কাছে শুধু পেট বা মন ভরার বিষয় নয়, এটি সংস্কৃতির প্রধান অনুষঙ্গ। কিন্তু এই উৎসবের টেবিলে খাবার নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে এক ধরনের অনভিপ্রেত বিতর্ক বা নাক গলানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। সংস্কৃতির বহুত্ববাদকে কোণঠাসা করার সুপ্ত বা প্রকাশ্য প্রয়াস চলছে সর্বত্র। রাষ্ট্র বা উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ যখন জনসাধারণের খাবারের থালায় নজরদারি চালাতে চায়, কে কী খাবে বা কে কোন পোশাকে পুজোয় বেরোবে তার ফরমান জারি করতে চায়, তখন সেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে মৌন অথচ শক্তিশালী প্রতিরোধ। উৎসবের মরশুমে একজন কী খাবে, কী করবে, সে কথা কেউ কারোর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। খাদ্যাভ্যাস বা জীবনশৈলী নির্ধারণের সেই একচ্ছত্র অধিকার রাষ্ট্রের হতে পারে না। বাঙালি তার বহুত্ববাদী সংস্কৃতি দিয়ে বারবার প্রমাণ করেছে যে উৎসব মানেই স্বাধীনতা, উৎসব মানেই স্বতঃস্ফূর্ততা। ধর্মীয় কট্টরতা বা রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাঙালির এই শারদোৎসব এক দারুণ সাংস্কৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে এসেছে যুগের পর যুগ।

 

দুর্গাপুজো কোনো একক উপাদানের সমষ্টি নয়। সাজসজ্জা থেকে খাবার, প্রতিমা দর্শন থেকে শিল্প উদযাপন—সবকিছুর একটা নিবিড় মেলবন্ধন ঘটে এই কটা দিনে। নতুন জামার গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ, আলোয় ঝলমলে রাস্তাঘাট, চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া— এই সবটা ঘিরেই নিখাদ আনন্দ। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এই কটা দিন মানুষ তার সমস্ত গ্লানি, বৈষম্য, দৈনন্দিন যন্ত্রণাকে ভুলে উৎসবে বাঁচে। বাঁচে বিশ্বাসে, বাঁচে যৌথতায়। সমস্ত ব্যস্ততা আর রোজগারের ইঁদুরদৌড় ছাপিয়ে এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের টান কতখানি গভীর। তাই তো বিভাজনের রাজনীতি আর সংকীর্ণতার দেওয়ালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঙালি আজও দুর্গাপুজোয় বুক ঠুকে বলে— উৎসব মানে জীবন, আর জীবন মানেই মুক্তির স্বাধীনতা। সেখানে কোনো নিষেধ চলে না, ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণই উদারতার একমাত্র পথ।