রাঁচি, নেতারহাট, ম্যাকলুস্কীগঞ্জ, পলামু বার বার উঠে এসেছে সাহিত্যের পাতায়। তবে এ বার পুজোয় সফর সাজাতে পারেন একটু অন্য ভাবেও। চারচাকায় চলুন ঝাড়খণ্ডের এমন এক স্থানে, যেখানে যাওয়ার পথে ঘুরে নিতে পারবেন রাজার প্রাচীন গড়। দেখতে পাবেন স্রোতস্বিনী কোয়েলের পাহাড়ি পথের রূপ, পাহাড়ঘেরা নির্জন জলাধার আর বহু পুরনো মন্দির। আর এই সব স্থান ঘোরার সময় প্রাপ্তি হবে মালভূমির পাথুরে সৌন্দর্য।

ঝাড়খণ্ডেরই একটি জেলা সিমডেগা। রাঁচি থেকে সড়কপথে দূরত্ব ১৩৫ কিলোমিটার। লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যাওয়া এই সিমডেগার পর্যটনস্থলগুলিকেই সম্ভাব্য ভ্রমণার্থীদের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছে প্রশাসন। পর্যটকদের আনাগোনা এই পথে বেশ কম। তাই থাকার জন্য এখানে খুব বেশি হোটেল নেই, নেই দর্শনীয় স্থানগুলি সম্পর্কে প্রচারও। বহু জায়গা গুগল ম্যাপে খুঁজে, স্থানীয়দের সাহায্য নিয়ে পৌঁছোতে হয়। পুজোভ্রমণে একটু আলাদা রকম রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে কী ভাবে এবং কোন পথে ছোটাবেন চারচাকা?

কলকাতা থেকে সড়কপথে সরাসরি সিমডেগা পৌঁছোনো যায় ঠিকই, তবে রাঁচি ছুঁয়েও যেতে পারেন। বর্ষার শেষে পুজো। রাঁচির তিনটি জলপ্রপাতই জলে টইটম্বুর। তা ছাড়া, শহরটিতে দর্শনীয়স্থলও নেহাত কম নয়। রাঁচি-সিমডেগা, দুই-ই থাক সফরতালিকায়।

কলকাতা থেকে রাঁচি যেতে বড়জোর ৮-৯ ঘণ্টা সময় লাগবে। সকাল ৬টার সময় রওনা দিলে, মাঝেমধ্যে বিরতি নিলেও পৌঁছে যেতে পারবেন বিকেলের মধ্যেই। পৌঁছোনোর পরে যদি ঘোরাঘুরির ইচ্ছা থাকে, চলে যেতে পারেন টেগোর হিল। পড়ন্ত বিকেলে শহরের সৌন্দর্য টিলার মাথা থেকে বেশ লাগবে।
রাঁচিতে থাকার হোটেলের কোনও অভাব নেই। রাতটা রাখুন দিনভর গাড়ির ধকল পুষিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ, পরের দিন বেরিয়ে পড়তে হবে সিমডেগার উদ্দেশে। রাঁচি থেকে সিমডেগা সোজা রাস্তায় এলে দূরত্ব দাঁড়ায় ১৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু যাওয়া যাক একটু ঘুরপথে। রাঁচি থেকে ভোরভোর বেরিয়ে পড়ুন। প্রথমে চলুন গুমলার সিসই ব্লকে, দেখে নিন নবরতনগঢ় দুর্গ। দূরত্ব ৭৭ কিলোমিটার। ছোটনাগপুরের নাগবংশী রাজা দুর্জন শালের ভাঙা গড় রয়েছে এখানে। পাথুরে টিলা চারপাশে। বর্ষার পরে বিস্তীর্ণ প্রান্তর ঘাসের গালিচায় ঢাকা। মন্দির, জলাধার, দুর্গের অংশবিশেষ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের আওতাধীন এই স্থলটি ভাল ভাবে ঘুরে দেখতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। বলা হয়, একসময় এখানে পাঁচতলা দুর্গ ছিল। প্রতিটি তলায় ন’টি কক্ষ ছিল। তা থেকেই নাম ‘নবরতনগঢ়’। সেখান থেকে বসিয়া রোড ধরে গাড়ি ছোটান বাঘমুন্ডা জলপ্রপাতের দিকে। রাস্তার পাশেই সবুজ টিলা, গাছগাছালি। মালভূমির রূপ দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে ৪০ কিলোমিটার পথ পৌঁছে যাবেন ঘণ্টাখানেকেই।

বড় রাস্তা থেকে বাঁ দিকে রাস্তা বেঁকেছে। গুগল ম্যাপ রাস্তা দেখাবে বটে, তবে এ পথে ঢুকলে মনে সংশয় হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, গ্রামের ভিতর দিয়ে গিয়েছে মেঠো পথ। ম্যাপ যেখানে দিক নির্দেশ করবে, এক বারের জন্য মনে হতেই পারে রাস্তা কি এ বার পাহাড়ের মাথায় তুলে বিপদে ফেলবে! চমক সেখানেই। গাড়ি যেখানে থামবে, সেখান থেকে কয়েক পা হাঁটলেই ধরা দেবে অন্য ছবি। জলপ্রপাত নয়, সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে কোয়েল নদী। বর্ষার জলপুষ্ট কোয়েল এখন খরস্রোতা। বড় বড় পাথুরে গহ্বরে আছড়ে পড়ে ফেনিল হয়ে উঠছে সেই স্রোত। আশেপাশে শুধু পাখির ডাক আর নদীর স্রোতের শব্দ। বাঘমুন্ডার জলস্রোত দেখার জন্য অন্য দিকে আরও একটি পথ রয়েছে। তবে সেই পথেও যেতে হবে গাড়িতেই। বাঘমুন্ডা দেখে সিমডেগা চলুন, দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। থাকুন সিমডেগার কোনও হোটেলে। বুকিং আগে থেকে করে রাখাই ভাল, কারণ হোটেল এখানে হাতেগোনা।

দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেল থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়ুন ২৫ কিলোমিটার দূরে কৈরবেড়া ড্যামের উদ্দেশে। সুবর্ণরেখার উপনদী কাঁচী নদীর উপরে তৈরি কৈরবেড়া বিকেলের দিকেই ভাল লাগবে। জলাধারের উল্টোদিকে ছোট সবুজ টিলা। শান্ত, নিরালা স্থান। তবে অন্ধকার নেমে এলে এই পথে ফেরা মুশকিল। ফিরতিপথে ঘুরে নিন রামরেখা ধাম। ছোট্ট টিলার মাথায় রাম-সীতার মন্দির। রয়েছে কুণ্ড। পাহাড়ের উপর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত জনপদটি দেখা যায়।
সিমডেগায় প্রথম রাত কাটিয়ে পর দিন সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন এখান থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে দনগদ্দী জলপ্রপাত দেখতে। ছোট-বড় বোল্ডারের উপর দিয়ে এখানে বয়ে গিয়েছে শঙ্খ নদী। লোকচক্ষুর অন্তরালে যে এমন সৌন্দর্য রয়েছে, তা না এলে বোঝা কঠিন। ফেরার পথে বোলবা রোড ধরে ঠেথইতানগর এসে ডান দিকে ৮-৯ কিলোমিটার গেলেই রাজাডেরা জলপ্রপাত। ছিন্দা নদীর উপর তৈরি জলপ্রপাতটি তেমন উঁচু না হলেও স্থানটি মনোরম। শীতের দিনে স্থানীয়েরা পিকনিক করতে আসেন এখানে। ফিরে আসুন সিমডেগায়।
দুপুরের খাওয়া সেরে প্রথমে চলুন শহরের মধ্যেই কেলাঘাট ড্যাম দেখতে। ড্যাম দেখে চলুন থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বসতপুর। টিলা, মালভূমি, শঙ্খ নদীর রূপ মন ভরিয়ে দেবে। সিমডেগা শুধু দর্শনীয় স্থান খুঁজে ঘোরার জন্য নয়, যাঁরা গাড়ি চালাতে ভালবাসেন, গাড়ি চড়তে পছন্দ করেন, এই জেলার নানা প্রান্তের সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করবে। ফিরে আসুন সিমডেগার হোটেলে।

সিমডেগায় দ্বিতীয় রাত কাটিয়ে পর দিন একেবারে সকালেই বেরিয়ে পড়ুন। চলুন দশম ফলসের উদ্দেশে। দূরত্ব অনেকটাই, প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। প্রায় ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। দশমের রূপ মুগ্ধ করবেই। যাত্রার ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে জলপ্রপাত থেকে ছিটকে আসা জলকণায়। দশমের আশপাশে কিছু খাবার দোকান আছে। সেখানে চেখে নিতে পারেন গরম ধুসকা। ঝাড়খণ্ডের এটি জনপ্রিয় খাবার।

দশম দেখে চলে আসুন ৪০ কিলোমিটার দূরের রাঁচি শহরে। কলকাতা থেকে আসার পথে যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেখানেই উঠতে পারেন। রাঁচির মেন রোডে অঢেল রেস্তরাঁ। নামীদামি ব্র্যান্ডের রেস্তরাঁও রয়েছে। পছন্দের কোথাও গিয়ে নৈশভোজ সারতে পারেন। রাঁচি থেকে পরের দিন হুন্ড্রু, জোনহা, সীতা ফল্স দেখে নিন। রাঁচি থেকে যাতায়াতে সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার যাতায়াত হবে। রাঁচি ফিরে সময় থাকলে ঘুরে নিতে পারেন মূল শহরের মধ্যেই জগন্নাথ মন্দির, কাঁকে ড্যাম। তবে দশমের রূপ দেখার পরে হন্ড্রু, জোনহার সৌন্দর্য কম মনে হতে পারে। এই জলপ্রপাতের সুন্দর ভিউ পেতে গেলে অনেক সিঁড়ি নামতে এবং উঠতে হয়। শীতের দিন ছাড়া তা কিন্তু বেশ কষ্টকর। সেই বুঝে সফর সাজান। বিশেষত বয়স্ক মানুষ থাকলে তা অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে।
পরের দিন সকালে চলুন পত্রাতুর দিকে। পত্রাতুর রাস্তার পাকদণ্ডি মনে করাতে পারে সিকিমের সিল্করুটের কথা। রেশমপথের মতো অতটা খাড়াই নয় ঠিকই, তবু এই জায়গা মন ভাল করা। রাঁচি শহর থেকে এর দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। পত্রাতুতে রয়েছে জলাধার। আছে স্পিডবোটে চাপার ব্যবস্থা। জলাধারের পাশেই সুন্দর সাজানো হোটেল-রেস্তরাঁ, দুই-ই মিলবে।

ইচ্ছা হলে গাড়ি নিয়ে চলুন পালানি ফল্স। পত্রাতু থেকে পালানির দূরত্ব ৯ কিলোমিটার। রাস্তাটি উপভোগ্যও। বর্ষায় দূর থেকে জলপ্রপাত দেখলে মনে হবে, সবুজের বুক চিরে সাদা দুধের ধারা নামছে। পায়ে পায়ে কাছ বরাবর চলে যেতে পারেন। আগে মেঠো পথ থাকলেও এখন সেখানে পাকা রাস্তা তৈরি হচ্ছে।
জলাধারের পাশেই রয়েছে ঝাড়খণ্ড পর্যটন দফতরে ‘সরোবর বিহার’ এবং ‘পর্যটন বিহার’ হোটেল। ইচ্ছা হলে এখানে একটা রাত কাটাতে পারেন। না হলে সোজা ধরুন কলকাতার পথ।
রামগড় ক্যান্টনমেন্ট, বোকারো, কতরাস হয়ে ধরুন ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক। নিরসা-সালানপুর-আসানসোল-দুর্গাপুর-বর্ধমান হয়ে পৌঁছে যান কলকাতা। দূরত্ব পড়বে ৪৩০ কিলোমিটার। ফেরার পথ খুব বেশি লম্বা মনে হলে, আসানসোল অথবা দুর্গাপুরে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
রাঁচি শহরে স্টেশনসংলগ্ন রাস্তায় এবং মেন রোডে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। সিমডেগায় হোটেল কম, বড়জোর ২-৩টি মিলবে। আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভাল। পত্রাতুতে পর্যটন বিহার বা সরোবর বিহারে থাকাই সবচেয়ে ভাল, কারণ পত্রাতু লেক একেবারে সামনে। পর্যটন বিহার থেকে লেকের ভিউ সবচেয়ে ভাল। আসানসোল, দুর্গাপুর, দু’জায়গাতেই থাকার ভাল হোটেল মিলবে।
কী ভাবে যাবেন
কলকাতা থেকে ১৬, ৪৯ এবং ১৮ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রাঁচি যাওয়া যায়। এই পথে দূরত্ব পড়বে ৪০৩ কিলোমিটার। আরামবাগ-বিষ্ণপুর-মানবাজার-ঝালদা-মুরি হয়ে রাঁচি গেলে দূরত্ব কমে ৩৮৯ কিলোমিটার হলেও, এই পথে যেতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগবে। রাঁচি থেকে সিমডেগার দূরত্ব ১৩৫ কিলোমিটার। পত্রাতু প্রায় ৩৫ কিলোমিটার।