প্রাদুর্ভাব

কলকাতায় আসন্ন পুজোর জাঁকজমকের আড়ালে একটি বিপদ ক্রমেই বাড়ছে— ডেঙ্গি। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বছরের জানুয়ারি থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০,১৭৭ জন।....

কলকাতায় আসন্ন পুজোর জাঁকজমকের আড়ালে একটি বিপদ ক্রমেই বাড়ছে— ডেঙ্গি। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বছরের জানুয়ারি থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০,১৭৭ জন। গত বছর এই সময়কালেই সেই সংখ্যা ছিল ১২,৬৫২। অর্থাৎ, খাতায়-কলমে এই বছরের ডেঙ্গি-চিত্র কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল। যদিও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, ডেঙ্গির মতো বিপজ্জনক রোগের ক্ষেত্রে সামান্য দু’-এক হাজার রোগীর তফাতে জোর দিয়ে বলা চলে না যে, এই বছর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তদুপরি, এল নিনিয়ো-র বছর হওয়ায় শীতেও ডেঙ্গি সংক্রমণ পুরোমাত্রায় বজায় থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। সুতরাং, আগামী দিনে আচমকা আক্রান্তের সংখ্যাবৃদ্ধি দেখা যেতেই পারে। তা ছাড়া, রাজ্যে এখনও নিম্নচাপ অক্ষরেখা, ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে বিক্ষিপ্ত বর্ষণ হয়েই চলেছে। এই পরিস্থিতি ডেঙ্গি সংক্রমণের গতিবৃদ্ধির পক্ষে অনুকূল।

সেই কথা মনে রেখেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় পরিস্থিতির দিকে নজর রাখার কথা জানিয়েছেন। পুজোর মরসুমে ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে যাতে খামতি না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলিকে সতর্কও করেছেন। পুজোর ছুটিতেও পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরের ভেক্টর কন্ট্রোল বিভাগ কাজ করবে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, পুজো মণ্ডপের চার পাশে জল জমছে কি না, খতিয়ে দেখা হবে। জল জমার বিষয়ে পুজো উদ্যোক্তাদের জন্য কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এমন তোড়জোড় সত্ত্বেও ডেঙ্গির প্রকোপে রাজ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবরেই মারা গিয়েছেন দু’জন। চেনা রোগ, চেনা উপসর্গ, চেনা তার নিয়ন্ত্রণ কৌশল। তা সত্ত্বেও প্রতি বছর এতগুলি করে প্রাণ ডেঙ্গির কারণে চলে যায় কী ভাবে? বিশেষজ্ঞরা বহু বারই সতর্ক করে বলেছেন, দু’-এক মাসের প্রস্তুতিতে মশাবাহিত রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ নয়। তার জন্য চাই বছরভর প্রস্তুতি, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির মধ্যে সমন্বয়। সমস্যা হল, এই বছরের নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমগ্র কর্মকাণ্ডটিতে যথেষ্ট ফাঁক তৈরি করেছে। সাধারণত পুরপ্রতিনিধিরা নিজ ওয়র্ডের পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াকিবহাল থাকতেন, কোথায় রোগ ছড়াচ্ছে বেশি, কী পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল বিপুল। রোগী সংক্রান্ত তথ্যও তাঁরাই জানাতেন। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের পর পুরপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসক বসানো হয়েছে পুরসভায়। ফলে, অভিজ্ঞতার অভাবটি চাপা থাকছে না। কার্যত বেপাত্তা পঞ্চায়েত প্রধানরাও। সেই কারণেই গ্রাম থেকে শহর— ডেঙ্গির প্রকোপ থেকে বাদ পড়ছে না কিছুই।

সর্বোপরি, ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর তথ্য আপলোড ও যাচাইয়ের কাজে ব্যস্ত থেকেছেন পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক-সহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। ফলে, বাড়ি বাড়ি জ্বরের রোগীর খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি জমা জলে মশার বংশবৃদ্ধির দিকে নজর রাখার কাজটিতে গোড়ার দিকে বিস্তর বিলম্ব হয়েছে। তারই সম্মিলিত ফল ভোগ করছে রাজ্য। ডেঙ্গি প্রতিষেধক আগামী দিনে বাজারে আসার ইঙ্গিত মিললেও তার কার্যকারিতা প্রমাণে সময় লাগবে। তত ক্ষণ অবধি পরিচিত সতর্কতা অবলম্বনই একমাত্র পথ। দায়িত্বপালনে পুরপ্রশাসন থেকে নাগরিক— কত দ্রুত তৎপর হবে, তার উপরেই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ডেঙ্গি-চিত্র।