অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ফলপ্রসূ না হওয়ায় পিছু হটা এবং ফের পূর্বাবস্থানে ফেরা— ভারতে এমন সব কাজের জন্য একটি ইতিহাসসিদ্ধ শব্দ ব্যবহার হয়ে আসে। ‘তুঘলকিপনা’। শব্দটির জন্ম হয়েছিল তুঘলক বংশের শাসক মুহম্মদ বিন তুঘলকের বিচিত্র সব সরকারি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে। প্রাক্-পুজো কলকাতায় শব্দটি আবার নতুন করে স্মরণপথে উদিত হল, আশ্চর্য নয়। এ বার পুজোর আগে মহানগরের কিছু রাজপথ ও উড়ালপুলের নতুন বর্ণশোভার ব্যবস্থা হল। তার দরুন বাইকচালকদের বিপদ বাড়ল এবং পিছলে পড়া শুরু হল। পিছলে বাইকসমেত ছিটকে পড়ার ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু স্থানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা করা হল। প্রথমে রাস্তায় রং লাগানো, তার পর বিপদ দেখে ব্যবস্থা— ‘তুঘলকিপনা’র প্রসঙ্গটি মনে পড়া স্বাভাবিক। কেন হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথের উপর উজ্জ্বল রঙের পোঁচ লাগানোর ইচ্ছা জাগল মন্ত্রীর, বোঝা দুষ্কর। কলকাতার, তথা রাজ্যের অভূতপূর্ব রূপ নির্মাণের আবেগেই নিশ্চয়। তা কি এই পদ্ধতিতে না করলেই নয়?
প্রশ্নটি ওঠাতেই হবে। কেননা যত সহজ ভাবে মন্ত্রী যুক্তি দিচ্ছেন, তা সচেতন নাগরিকের পক্ষে ক্লেশকর। বিষয়টি অত সহজ নয়, লঘুও নয়। ঋণজর্জরিত অর্থকষ্টে ভোগা রাজ্যে অর্থের এমন অহেতুক অপচয় কেন? মন্ত্রী বলেছেন, সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করা হয়নি। তা যদি না-ও হয়ে থাকে, তবুও যে রং এমনিতেও বেশি দিন টিকবে না, এবং যাতে কোনও অংশের নাগরিকেরই বিন্দুমাত্র উপকার হবে না, তার জন্য খরচের যৌক্তিকতা কোথায়? তদুপরি, ইন্ডিয়ান রোডস কংগ্রেস-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাস্তা এবং ফুটপাতে ব্যবহৃত রং নির্দিষ্ট করা আছে এবং প্রত্যেকটির আলাদা অর্থ চিহ্নিত আছে। ট্র্যাফিকের গতিমুখ অনুযায়ী লম্বালম্বি কোন রং, ধারে কোন রং, দু’মুখী ট্র্যাফিককে পৃথক করতে কী রং দেওয়া হবে— নানা নির্দেশ রয়েছে সেখানে। চালককেও যেমন তা বুঝে পথে নামতে হয়, তেমনই প্রশাসনকেও সতর্ক থাকতে হয় রঙের প্রয়োগ বিষয়ে। কারণ এর সঙ্গে পথনিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। রাস্তা ঠিক শিল্পীর ক্যানভাস নয় যে যখন খুশি যেমন খুশি তাকে রাঙিয়ে তোলা যাবে। ইতিপূর্বে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধেও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছিল রাস্তায় বা উড়ালপুলে ঢালাও সাদা-নীলের ব্যবহার প্রসঙ্গে। তৃণমূল সরকারের পূজাকালীন ঢালাও ‘বাজে খরচ’ তো এখনও পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে একটি দুর্বিষহ বিষয়। তবু নতুন সরকারের আবার সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন অপচয়, আবার অর্থ নিয়ে যথেচ্ছাচার।
বাইক আরোহীর আছড়ে পড়া প্রসঙ্গে পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ভিডিয়োটি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের যুগে তা অতীব প্রয়োজন। কিন্তু সবিনয় প্রশ্ন, এমন আশঙ্কার কথা কি রং লাগানোর গোড়াতেই বিশেষজ্ঞদের মুখে শোনা যায়নি? উজ্জ্বল রঙের কারিকুরি দ্বিচক্রযানের চালকদের দৃষ্টিবিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে এবং রঙে থাকা রাসায়নিক পদার্থে গাড়ির চাকা ভারসাম্য হারাতে পারে— এমন সম্ভাবনার কথা কি আলোচিত হয়নি? রং লাগানোর পূর্বে কি পথ নিরাপত্তার প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? অর্থ যারই হোক, রাজ্যের মাটিতে অপচয়, তাই রাজ্যবাসী উত্তরের অপেক্ষায়।