২০১৭ সালে একটি ফৌজদারি মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের জাহিদ আলি। প্রায় ন’বছর পরে সেই মামলাকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ‘গুন্ডা’ ঘোষণা করল প্রশাসন। সঙ্গে দেখানো হল ছ’বছরের পুরনো আর একটি মামলা এবং পুলিশের একটি রিপোর্ট। তার ভিত্তিতে ছ’মাসের জন্য জাহিদকে গোন্ডা জেলা থেকে বহিষ্কারও করা হয়। সেই নির্দেশ বাতিল করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছে, উত্তরপ্রদেশ সরকার ধারাবাহিক ভাবে গুন্ডা দমন আইনকে ‘দমনের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। আর বাংলায় বিধানসভায় পাশ হয়ে অপেক্ষায় রয়েছে এমন একটি বিল, যেখানে বিচার শেষ হওয়ার আগেই আটক থেকে জেলা-বহিষ্কার পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষমতা থাকবে প্রশাসনের হাতে।
১১ মে জাহিদকে ‘গুন্ডা’ ঘোষণা করেছিলেন গোন্ডার জেলাশাসক। সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল ২০১০ ও ২০২০ সালের দুটি মামলা এবং পুলিশের একটি রিপোর্ট। অথচ ২০১০ সালের মামলায় ২০১৭ সালেই বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন তিনি। সেই রায়ের কপি নিয়ে ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে আবেদন করলেও ১২ আগস্ট তা খারিজ হয়ে যায়।
১০ সেপ্টেম্বর জেলাশাসক ও কমিশনারের দু’টি নির্দেশই বাতিল করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, খালাস হয়ে যাওয়া মামলাটি বাদ দিলে জাহিদের বিরুদ্ধে থাকে শুধু ২০২০ সালের একটি মামলা। একটি বিচ্ছিন্ন মামলা দিয়ে কাউকে নিয়মিত অপরাধী বলা যায় না। সেই মামলার পরেও ছ’বছর কেটে গিয়েছে। পুলিশের রিপোর্ট থেকেও কোনও ফৌজদারি মামলা হয়নি। অথচ সেই রিপোর্টের বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগও পাননি জাহিদ।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, পুলিশ জেলাশাসকের সামনে জাহিদের একটি ‘মিথ্যা ছবি’ তুলে ধরেছিল। কমিশনারের কাছে খালাসের রায় থাকার পরেও তা যথাযথ ভাবে বিবেচনা করা হয়নি। একই ধরনের বহু মামলা আদালতের সামনে আসছে জানিয়ে বিচারপতি সুবাস বিদ্যার্থী বলেছেন, উত্তরপ্রদেশ সরকার গুন্ডা আইনকে ধারাবাহিক ভাবে ‘দমনের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
জুলাই মাসেও মাত্র দুটি পুরনো মামলার ভিত্তিতে এক ব্যক্তিকে নিয়মিত অপরাধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল একই আদালত। অন্য একটি মামলায় ছ’মাসের জেলা-বহিষ্কারের নির্দেশও বাতিল হয়েছিল।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে নয়ডার শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় ২৫ বছরের আকৃতি চৌধুরীর উপর জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা এনএসএ প্রয়োগও খারিজ করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। পর্যাপ্ত প্রামাণ্য উপাদান ছাড়া কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে আদালত তাঁকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই অর্থ দায়ী সরকারি আধিকারিকদের বেতন থেকে আদায়ের কথাও বলা হয়েছে।
এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। পক্ষে ভোট পড়েছিল ১৭৬টি, বিপক্ষে ৪১টি, বিরত ছিলেন ২০ জন।
বিল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে কোনও ব্যক্তিকে বিচার শেষ হওয়ার আগেই সর্বোচ্চ ১২ মাস আটক রাখা যাবে। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা অনুমোদিত উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক কোনও ব্যক্তিকে একটি এলাকা, জেলা বা একাধিক জেলা থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বহিষ্কার করতে পারবেন। তল্লাশি এবং জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে।
সাধারণ নিয়মে আগের সাত বছরের মধ্যে অন্তত একবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া অথবা পৃথক ঘটনায় কমপক্ষে তিনটি চার্জশিট থাকার শর্ত রয়েছে। কিন্তু ‘গুন্ডা’-র সংজ্ঞায় এমন ব্যক্তিকেও রাখা হয়েছে, যিনি সাধারণ ভাবে সমাজের কাছে ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ বলে পরিচিত। সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিলটি এখনও কার্যকর আইন হয়নি। ৬ আগস্ট রাজ্য সরকার কলকাতা হাইকোর্টে জানিয়েছিল, রাষ্ট্রপতির সম্মতি মেলেনি। ২৪ আগস্টও মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে খালাস হয়ে যাওয়া মামলা এবং ছ’বছরের পুরনো অভিযোগ ব্যবহার করে একজনকে ‘গুন্ডা’ ঘোষণা করে জেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বাংলার বিলে সর্বোচ্চ এক বছরের জেলা-বহিষ্কার এবং ১২ মাসের প্রতিরোধমূলক আটকের ক্ষমতা থাকবে প্রশাসনের হাতে।
তাহলে এত বড় ক্ষমতার অপব্যবহার আটকানোর রক্ষাকবচ কোথায়? প্রশাসন কাউকে ‘বিপজ্জনক’ বলে চিহ্নিত করার পরে সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে হারানো স্বাধীনতা ফেরাবে কে? উত্তরপ্রদেশে যে ধরনের প্রয়োগকে হাইকোর্ট ‘দমনের হাতিয়ার’ বলছে, বাংলার বিল তৈরির সময় সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে? অপরাধ দমনের জন্য তৈরি কঠোর আইনই যদি প্রশাসনিক দমনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, নাগরিককে রক্ষা করবে কে? এমন নানা প্রশ্নই উঠছে।
তথ্যসূত্র: এলাহাবাদ হাইকোর্ট, Zahid Ali v. State of U.P. & Others, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬; Rahul alias Rahul Saroj ও Fulchnand মামলা, জুলাই ২০২৬; আকৃতি চৌধুরী সংক্রান্ত এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়, সেপ্টেম্বর ২০২৬; পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা, West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Bill, 2026; কলকাতা হাইকোর্ট, ৬ আগস্ট ২০২৬; আকাশবাণী, ইন্ডিয়া টুডে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য স্টেটসম্যান ও মিন্ট।