বাংলার সাহিত্য মহলে প্রাচীন প্রবাদ “একমাত্র কবিই জানেন, সব চরিত্র কাল্পনিক নয়। ” স্বদেশ হোক বা বিদেশ যুগ যুগান্তর ধরে কবিদের মানসিকভাবে দুঃখ – যন্ত্রনা সহ্য করবার ঘটনা নতুন কিছু নয় ; Sylvia Plath, Robert Lowell, Emily Dickinson এর মতো বিশ্ববিখ্যাত কবিরা প্রত্যেকেই ছিলেন জীবনে – চিন্তনে মানসিক সমস্যায় জর্জরিত। ব্যাতিক্রম ছিলেন না বাংলার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাস কিংবা বিনয় মজুমদার।
১৯৪৮ সালে দেশভাগের দগদগে ঘা বুকে নিয়ে বিনয়বাবুর পরিবার যখন কলকাতায় পাড়ি জমালো তখন তাঁর মাত্র চোদ্দ বছর বয়স ; স্কুলের গন্ডি পার করে ১৯৫১ তে আইএসসি (গণিত ) পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, এবং বিভাগে প্রথম হন। কলেজ জীবন থেকেই, অঙ্কের বিভিন্ন জার্নালে একের পর এক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর। প্রেসিডেন্সি পরবর্তী জীবনে ছাত্র হিসেবে ১৯৫৭ তে শিবপুর B. E কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। সম্ভাবনা ছিল, বিশিষ্ট গণিতবিদ কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে নিজের জীবন সুখ – স্বাচ্ছন্দ্যে কাটানোর। দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট সহ আরো কয়েকটি কোম্পানিতে চাকরিও করেছেন তিনি। কয়েক মাসের পর কোথাও মন টেকেনি তাঁর, ফিরে এসেছেন কলকাতায় ভাড়া বাড়িতে, বেছে নিয়েছেন স্বভাবকবির জীবন ; আর আওড়েছেন -“ জড়,উদ্ভিদ, কীট পতঙ্গ, মানুষ সবার সৃষ্টিরহস্য এক। সে কথা উপলব্ধির পরেই শুরু হল কবিতা নিয়ে পথ চলা, আমার নিজস্বতা।’’ এই নিজস্বতা কে সম্বল ৫০ এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত কলেজ স্ট্রিট চত্বরে কফি হাউস কিংবা, ‘ গ্রন্থজগৎ ‘ প্রকাশনার দপ্তরে নিয়মিত দেখা যেত তাঁকে, ঠিক যেন মান্না দে’ র গানের কবি কবি চেহারার কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ এর ‘অমল’। অবশ্য অমলের মতো বিনয় বাবুকে কবিতা প্রকাশ করবার জন্য খুব একটা অপেক্ষা করতে হয়নি, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হয়তো তিনিই অন্যতম যাঁর কবিতা কোনো পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার আগেই তাঁর “নক্ষত্রের আলোয়” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়।
ঠিক এই সময়েই বসন্তের আগমনের মতো তাঁর জীবনে আসে তাঁর “ ঈশ্বরী” গায়ত্রী চক্রবর্তী। পরবর্তী কালে বিশিষ্ট কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা অনন্য অনেকের কাছে বিনয়বাবুর লেখা চিঠি পড়ে মোটামুটি বোঝা যায় সেদিনের প্রেসিডেন্সির ছাত্রী, গায়ত্রী দেবীই অসলে এখনকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। দুজনের পরিচয়টা বেশীদিনের থাকেনি, আলাদা করে গড়ে ওঠেনি প্রণয়ের সম্পর্ক, তবুও সব সম্পর্ক কী আর ইঁট – কাঠ – পাথরে ঘেরা অভ্যন্তরীণ পৃথিবীতে গড়ে ওঠে ! কিছু কিছু সম্পর্ক তো অসলে মনের মনিকোঠায় সাজানো থাকে চিরদিন, বিনয় বাবুর মানসলোকে তৈরী হওয়া এই একতরফা প্রেমই তাঁকে তাড়না করেছিলো আমৃত্যু।
প্রেসিডেন্সিতে গায়ত্রী দেবীর সহপাঠী শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার এই ব্যাপারে স্মৃতি চারনা করতে গিয়ে বলেন “ এক দিন গায়ত্রী কলেজে ক্লাস করছেন জেনে বিনয় প্রেসিডেন্সির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে এসে হাজির হলে, তাঁর থেকে নিস্তার পেতে গায়ত্রী অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান।” এ যেন ২০০০ এর দশকের শুরুর দিকের বাংলা ব্যান্ড “পৃথিবীর” বিখ্যাত গান ‘ক্লাসরুম’ এর বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ। বিপর্যস্ত মন নিয়ে ওই সময়ই লিখতে শুরু করেন কয়েকটি কবিতা। ১৯৬১ সালে সেইসব কবিতাই একটি ছোট বই আকারে “ গায়েত্রীকে” নাম নিয়ে কাব্যগ্রন্থ আকারে প্রকাশ পায়, অবশ্য সেই বইয়েরই পরিবর্তিত রূপ ছিলো “ফিরে এসো চাকা” যা কবিকে বসিয়েছিলো খ্যাতির চূড়ায়, প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে, সেখানেও কবি ভোলেননি তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে অঙ্ক আর কবিতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ, ভালোবাসার মানুষ গায়েত্রীকে ; সেখানেও তিনি বইয়ের শুরুতে উৎসর্গ পত্রে লেখেন “ আমার ঈশ্বরীকে”।
মানসিক আঘাতে কার্যত থেঁতলে গিয়ে এই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন :- “ পতন হলেও তুমি আঘাত পাও না, উড়ে যাবে।
প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি নিয়ে তুমি
চ’লে যাবে; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হবো আমি।”
ফিরে এসো চাকা কাব্যগ্রন্থের কবিতা লেখার সময়ই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬১ র জুলাই মাসে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি, ছয় মাস চিকিৎসার পরে বাড়ি ফিরে আসেন। ১৯৬০ -৭০ এর সময় একাধিক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলতে থাকে তাঁর, প্রতিটি কবিতাতেই ছিলো জীবন যন্ত্রনার অসহনীয় প্রতিচ্ছবি, প্রকাশিত হয় ‘ অধিকন্তু’, ‘ আঘ্রানের অনুভূতিমালা’ সহ বিভিন্ন কবিতার বই। ৬০ এর দশকের শুরুতেই কলকাতা ছেড়ে তিনি চলে আসেন উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের শিমুলপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে, এখানেই আমৃত্যু জীবন কেটেছিলো তাঁর। ঠাকুরনগরের এই বাড়িকে কাব্যিক আকারে বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন –
“ চতুর্দিকে সরস পাতার/ মাঝে থাকা শিরীষের বিশুষ্ক ফলের মতো আমি/ জীবনযাপন করি |” এখানে তাঁর জীবন যাপন ছিলো পাগলাটে ধরনের, বাইরের খুব একটা কারোর সঙ্গে মিশতেন না তিনি, আবার খুব সাবলীল ভাবে মিশে যেতেন এলাকার কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষদের সঙ্গে | আবার এই বাড়িতেই আড্ডা জমিয়েছেন জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বনগাঁ – ঠাকুরনগর এলাকার সেসময়ের উঠতি নতুন কবিরা |
বিনয় বাবুর যাপনে যেমন ছিল কবিতা, হৃদয়ের তার কোথাও না কোথাও বাঁধা ছিলো ক্যালকুলাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের মতে ঠাকুরনগর স্টেশনের ২ নং প্ল্যাটফর্মে বসে তিনি নাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ক্যালকুলাস, লগারিদমের অঙ্ক কষতেন | তাঁর ডাইরি থেকে উদ্ধার হয় একতরফা প্রেমের অঙ্ক কষে বের করা, XY এর প্রেমের সমীকরণ | আবার তাঁর কবিতার বইয়ের নামের মধ্যে বৈচিত্র আনতে অঙ্কের স্মরণাপন্ন হয়ে নাম রেখেছিলেন “ আমিই গণিতের শুন্য” | নিজের ছোটবেলার দেশ- কালের তাড়নায় ১৯৬৭ সালে এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক ঘোরের মধ্যে পড়ে তিনি পাসপোর্ট বা কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সীমান্ত পার হয়ে তাঁর পৈতৃক ভিটা ফরিদপুরের তরাইল গ্রামে চলে যান। সেখানে কোনো বৈধ নথিপত্র না থাকায় পাকিস্তানি পুলিশ ও গোয়েন্দারা তাঁকে ভারতীয় চর বা গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেপ্তার করে। এরপর বেশ কিছুদিন তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ এবং কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সহ তৎকালীন বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের প্রচেষ্টায় তিনি মুক্তি পেয়ে ফিরে আসেন ভারতে৷
হাজারো মানুষের আড্ডার ভিড়ে কবির বাড়ি কখনো সখনো মশগুল থাকলেও চিরজীবন একাকিত্বের অতলে তলিয়ে যাওয়া কবির স্কিৎজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) রোগ ছিল আজীবনের সঙ্গী | ৮০ র দশক থেকে এই রোগের তীব্রতা বাড়তে থাকে, এই রোগের বশেই দেখতে পেতেন বিভিন্ন উদ্ভট চরিত্র, শুনতে পেতেন বিভিন্ন কাল্পনিক শব্দ | ৮০ র দশকে বারবার ঠাকুরনগর ছেড়ে কলকাতায় আসতে হয় তাঁকে, তবে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস যে ছেলে যুব বয়সে কেন্দ্রীয় সরকারের স্টিল প্ল্যান্ট এর আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে শুধুমাত্র কবিতার জন্য এসেছিলেন কলকাতায়, তিনিই কলকাতা আসতে বাধ্য হন রোগের তাড়নায় | ১৯৮৭ তে মানসিক রোগ চরমে পৌঁছয়, সেসময় দীর্ঘদিন ভর্তি থাকেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে৷
বিনয় মজুমদার বললেই সবার মনে প্রথমেই কেমন যেন একজন রোগাক্রান্ত, বিকারগ্রস্ত, একতরফা প্রেমের জালে বিদ্ধ উসকো খুশকো মানুষের কথা সামনে আসে | তাঁর সেই সত্ত্বার জোরেই শেষ বয়সে জরাজীর্ণ মন আর শরীর নিয়ে তাঁর লেখা সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “ হাসপাতাল থেকে লেখা কবিতাগুচ্ছ” র জন্য তিনি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান। পুরস্কারের মোহমায়া তাঁর কোনোদিনই বিশেষ ছিলনা। ২০০৫ এ পুরস্কার ঘোষণার সময় কবি অসুস্থতার জন্য দিল্লিতে পুরস্কার নিজের হাতে নিতেও যেতে পারেননি, কর্তৃপক্ষ তাঁর বাড়িতে এই পুরস্কার দিয়ে যায় | তাঁর করুণ জীবন কাহিনীর উদ্রেক হয় এই বইয়ের একটি কবিতার লাইন দিয়ে, “ কবিতা লেখা আমি মাঝে মাঝে ছেড়ে দিই। তখন এমন কাণ্ড ঘটে, যাতে ফের লিখতে বাধ্য হই। আমাকে হাসপাতালে পুরে কাগজ এবং কলম দিয়ে বলা হল, ‘কবিতা লিখলে ছাড়া হবে। নচেৎ নয়’|” আবার সাহিত্যের ট্রাজেডি আর কমেডির মিশ্রনে জীবনকে মিলিয়ে দিয়ে সেই একতরফা প্রেমের হিসেবে কষে শেষ বইয়েতেও তাঁর স্বপ্নের প্রেমিকার উদ্দেশ্যে হৃদয়ের সুক্ষতন্ত্রী থেকে তিনি “আমরা দুজনে মিলে জিতে” কবিতায় তিনি লিখে গেছেন “ আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে, চিঠি লিখব না, আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।”
এহেন বর্ণময় চরিত্র বিনয় মজুমদার একাকিত্ব আর নস্টালজিয়াকে হাতিয়ার করে নীরবেই সকলকে ছেড়ে চলে যান ১১ ই ডিসেম্বর ২০০৬ সালে | তাঁর এই ৭২ বছরের জীবন আমাদের ভাবিয়ে দিয়ে যায় আদেও আমরা আমাদের আশেপাশে থাকা মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্বন্ধে আমরা কতটা সচেতন! বলিউডের Wo Lamhe কিংবা Madhoshi র মতো স্কিৎজোফ্রেনিয়া নিয়ে সিনেমা পপকর্ন খেতে খেতে দেখতে দেখতে আমরা গা সওয়া করে নিলেও আদেও কি সহানুভূতিশীল হচ্ছি ! আজ কবির ৯২ তম জন্মদিনে হয়তো আমাদের এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে | আবার যে কবিকে জীবনদশায় কেউ গুরুত্ব দিলনা, মৃত্যুর পর ঠাকুরনগরে তাঁরই বাড়িতে, তাঁর স্মৃতিতে তৈরী লাইব্রেরি থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ এর সন্ধ্যায় সাহিত্য একাডেমির ফলক চুরি করে নিতে, চোর পৌঁছতে একেবারেই দেরী করলনা। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!