সৌমেন্দ্রনাথ, ঠাকুরবাড়ির ছেলের কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মার্বেল পাথরে বাঁধানো বারান্দা থেকে দূরে, যেখানে গঙ্গার আর্দ্র হাওয়ায় চটকলের চিমনি থেকে নুনপোড়া ধোঁয়া আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস মিশে একাকার হয়—সেখানকার ফুটপাতের ধুলো আর আধপেটা খাওয়া মানুষের....

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মার্বেল পাথরে বাঁধানো বারান্দা থেকে দূরে, যেখানে গঙ্গার আর্দ্র হাওয়ায় চটকলের চিমনি থেকে নুনপোড়া ধোঁয়া আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস মিশে একাকার হয়—সেখানকার ফুটপাতের ধুলো আর আধপেটা খাওয়া মানুষের ভিড়ে নেমে এসেছিলেন এক ব্যতিক্রমী পুরুষ। সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর । মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর এবং সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান হিসেবে বিত্ত-বৈভবের পসরা, জন্মসূত্রের অভিজাত্য এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলের সমস্ত সুরভিত প্রলোভনকে অবলীলায় পেছনে ফেলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার বন্ধুর পথ।

 

কটি আভিজাত্যমণ্ডিত পরিবারের সন্তান হয়েও সৌম্যেন্দ্রনাথের মনন কখনো সামন্ততান্ত্রিক বা বুর্জোয়া মোহে আচ্ছন্ন হয়নি। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল প্রথমে গান্ধীবাদী আদর্শে, কিন্তু কালক্রমে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে তিনি মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ‘শ্রমিক ও কৃষক দল’ (Workers’ and Peasants’ Party)-তে যোগ দেন। হুগলি ও কলকাতার চটকল শিল্প তখন ছিল ব্রিটিশ মালিকদের শোষণের এক ভয়ংকর কসাইখানা। শ্রমিকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সোনালী আঁশ উৎপাদন করত, তার বিনিময়ে তাদের কপালে জুটত অবর্ণনীয় নির্যাতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর অর্ধাহারে দিন কাটানোর যন্ত্রণা।

​এই নির্বাক পেটের জ্বালাকে স্লোগানে রূপ দিতে এগিয়ে এলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ। তিনি গড়ে তোলেন ‘বেঙ্গল জুট ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’ । চটকলের স্যাঁতসেঁতে বস্তিতে, কাদা-জলে ভরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে তিনি শ্রমিকদের শুনিয়েছিলেন সংঘবদ্ধ হওয়ার মন্ত্র। তাঁর এই ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টিভিজম এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ভূমিকা তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের অন্যতম প্রধান ‘টার্গেটে’ পরিণত করে।

১৯২৭ সালের মে মাসে তিনি ইউরোপে গমন করেন। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে আসেন। ​১৯২৮ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ষষ্ঠ কংগ্রেসে তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ঔপনিবেশিক প্রশ্ন বা ‘Colonial Thesis’ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত তুলে ধরেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জোসেফ স্টালিনের নীতির সঙ্গে মতপার্থক্য এবং ট্রটস্কির ‘স্থায়ী বিপ্লব’ (Permanent Revolution)-এর তত্ত্বে আস্থাশীল হয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ধারায় এক ভিন্ন পথ বেছে নেন। ১৯৩৭ সালে তাঁর হাত ধরেই গঠিত হয় ‘বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (RCPI)। ব্রিটিশ ও জার্মান সরকারের রোষানলে পড়ে তাঁকে বহুবার কারাবাস ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।

 

সৌম্যেন্দ্রনাথ মার্কসবাদী ভাবাদর্শকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলতে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকাতেই প্রথম তাঁর হাত ধরেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘কমিউনিস্ট ইস্তেহার’-এর বঙ্গানুবাদ। তাঁর স্বহৃদয় লেখনী থেকে বেরিয়ে এসেছিল ‘বিপ্লবী রাশিয়া’, ‘যাত্রী’, ‘ত্রয়ী’, ‘কমিউনিজম ও ফ্যাসিজম’-এর মতো মননশীল দলিল। তাঁর প্রখর রাজনৈতিক লেখার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ‘বিপ্লব বৈশাখী’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘লাল নিশান’-এর মতো বইগুলি বাজেয়াপ্ত করেছিল।

বিশ শতকের তৃতীয় দশকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত আধুনিকতার ঝড় উঠেছিল, সেই ঐতিহাসিক ‘কল্লোল’ পত্রিকার অন্যতম প্রাবন্ধিক ও চালিকাশক্তি ছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ। কল্লোল যুগ মানেই মধ্যবিত্তের কৃত্রিম রোমান্টিসিজম ভেঙে চুরমার করে দিয়ে জীবনের রূঢ় ও নগ্ন সত্যকে সাহিত্যের অঙ্গনে টেনে আনা। কল্লোলের পাতায় তাঁর প্রবন্ধগুলো কেবল তত্ত্বের কচকচি ছিল না; তাতে ছিল শিল্প ও সমাজের সেতুবন্ধন। জার্মান, ফ্রেঞ্চ, রুশ ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর অনায়াস গতি তাঁর গদ্যকে দিয়েছিল এক আন্তর্জাতিক ঋদ্ধতা।

 

ঠাকুরবাড়ির শিল্পকলা ও নান্দনিকতার আবহ তাঁকে দিয়েছিল এক সূক্ষ্ম সাহিত্যিক দৃষ্টি, আর মার্কসবাদী দর্শন তাঁকে দিয়েছিল সমাজের গভীরে প্রোথিত পরিবর্তনের তাগিদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত সাহিত্যিক কেবল কলম নিয়ে দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারেন না—রক্তমাংসের পৃথিবীর অন্যায়কে দূর করতে হলে তাঁকে কলমের পাশাপাশি সংগ্রামের ময়দানেও নামতে হয়।

সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, যিনি সাহিত্যের প্রসাধন ত্যাগ করে চটকল শ্রমিকের রক্তমাখা হাতকে নিজের বন্ধু বলে গ্রহণ করেছিলেন। ‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রাবন্ধিক থেকে চটকল শ্রমিকের নেতা—এই দুই সত্তার সেতুবন্ধনে তিনি বাংলা সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে এমন এক পথ তৈরি করে গেছেন, যা আজও শোষিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে দিশারী হয়ে থাকে।