সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের কাছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, অসম, তামিলনাড়ু ও পণ্ডিচেরি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি খরচের হিসেব জমা করেছে। দেখা গেছে সদ্য সমাপ্ত এই বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে বিজেপি মোট খরচ করেছে ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা, যার প্রায় ৫৪% খরচই হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে — ২৮৬ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ খরচের সামগ্রিক বিচার করা এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়। এই প্রতিবেদন এই খরচের একটা অংশেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলায় খরচ করা মোট ২৮৬ কোটি টাকার মধ্যে ৫৫ কোটি ৭৬ লক্ষ ৮১ হাজার ১৩০ টাকা বিজেপি খরচ করেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া খাতে। এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কারা রয়েছে? বাংলা হান্ট, দ্য নিউজ বাংলা, আজ বাংলা, প্রিয় বন্ধু-র মতো তথাকথিক নিউজ পোর্টাল থেকে শুরু করে সায়ক চক্রবর্তী, শমিক অধিকারী, সুকান্ত কুণ্ডু-র মতো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার — এদের মতো বহু নিউজ পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররাই পেয়েছেন এই টাকার ভাগ।
আপনাদের হয়ত মনে থাকবে, বাংলায় নির্বাচনের কিছু আগে কলকাতার একটি স্বনামধন্য রেস্টুরেন্টে গিয়ে মাটন স্টেকের পরিবর্তে বিফ স্টেক সার্ভ করা হয়েছে বলে শোরগোল শুরু করে দেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তী। ওয়েটারের ধর্ম জানতে চেয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্যও করেন। অনেকেই জানলে অবাক হবেন, সেসময় তিনি বিজেপি-র পেরোলে ছিলেন। ১৫ই মার্চ থেকে ৬ই মে পর্যন্ত সময়ে তিনি বিজেপি-র কাছ থেকে পেয়েছেন ২.৫ লক্ষ টাকা। আরেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ‘ননসেন’ নামে পরিচিত শমিক অধিকারী সেই একই সময়ে বিজেপি-র কাছ থেকে পেয়েছেন ১৩ লক্ষ টাকা, আর জে প্রিয়াঙ্কা পেয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকা, ‘ক্যান্ডিড ক্যালি’ নামে পরিচিত ইতি কর্মকার পেয়েছেন ৩ লক্ষ টাকা, সঙ্গীত সরকার পেয়েছেন ২ লক্ষ টাকা।
অন্যদিকে, বাংলা হান্ট, দ্য নিউজ বাংলা-র মতো বেশ কিছু নিউজ পোর্টালই নির্বাচনের আগে ও পরে অনেকটা বিজেপি-র মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করে চলেছে। নির্বাচন কমিশনে জমা করা বিজেপি-র ডেটা থেকে পরিষ্কার এই বাংলা হান্ট, দ্য নিউজ বাংলা ও এরকম বেশ কিছু তথাকথিত মিডিয়া পোর্টাল বিজেপি পেরোলে থেকেই তাদের কাজ পরিচালনা করছে। ১৫ই মার্চ থেকে ৬ই মে-র মধ্যে বাংলা হান্ট পেয়েছে ২২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, দ্য নিউজ বাংলা পেয়েছে ২২ লক্ষ টাকা, প্রিয় বন্ধু মিডিয়ার শুদ্ধশীল ঘোষ পেয়েছেন ৫১ লক্ষ টাকা, পলিটিকাল ডেইলি-র পঙ্কজ ঘোষ পেয়েছেন ২০ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা, রুদ্র বার্তা পেয়েছে ১১ লক্ষ টাকা, দ্য ওয়াল নিউজ পেয়েছে ৪১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। ইনফ্লুয়েন্সার ও ডিজিটাল পোর্টাল মিলে মোট প্রাপকের এই তালিকা আরও দীর্ঘ।
এছাড়াও, এই একই সময়কালে গুগলে বিজেপি ইনভেস্ট করেছে ২৪ কোটি ৮৮ লক্ষ ৮ হাজার ১২০ টাকা, ফেসবুকে ইনভেস্ট করেছে ৬ কোটি ৫১ লক্ষ ২০ হাজার ৯২৭ টাকা।
স্পষ্টতই, সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি যাদের ফলো করছেন, যে ইনফ্লুয়েন্সারদের থেকে ইনফ্লুয়েন্সড্ হচ্ছেন, যে পোর্টালের খবরকে নিরপেক্ষভেবে আপন মনে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, তারা আদৌ আপনার ভরসার যোগ্য কিনা, তার বিচার আপনাকেই করতে হবে। লক্ষ-কোটি টাকার বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট দলের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যে কোনোভাবেই আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পরিবেশন করতে পারবে না, সেটা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।