রাষ্ট্রনায়ক বুরহানউদ্দিন রব্বানী : এক বিপ্লবীর পথ চলার গল্প

এম এ নাসের আফগান রাষ্ট্রপতি, মুজাহিদ, লেখক, অধ্যাপক, গবেষক, সংগঠক ‌, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী আফগানিস্থানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশের ফয়জাবাদ জেলার বাদাখশানে ১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্ৰহণ করেন বুরহানউদ্দিন রব্বানী।পিতা মুহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন....

এম এ নাসের

আফগান রাষ্ট্রপতি, মুজাহিদ, লেখক, অধ্যাপক, গবেষক, সংগঠক ‌, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী
আফগানিস্থানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশের ফয়জাবাদ জেলার বাদাখশানে ১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্ৰহণ করেন বুরহানউদ্দিন রব্বানী।পিতা মুহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন আফগানিস্তানের ভাষাভিত্তিক বড় জাতির মধ্যে অন্যতম তাজিক ভাষাভাষীভূক্ত।
স্ত্রী: বিবি হাজী রব্বানী।
সন্তান: তাঁর মোট ৪ জন সন্তানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন:পুত্র
সালাহউদ্দিন রব্বানী পরবর্তীতে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ‘জামিআত-ই-ইসলামী’ দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।কন্যা
ফাতিমা রব্বানী -একজন নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী।

 

 

 

স্থানীয় স্তরে পাঠচর্চা শুরু হয়।পরে
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা তার প্রদেশেই সমাপ্ত হয়। এরপর তিনি পড়াশোনা করেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে ইসলামিক আইন ও ধর্মতত্ত্বে তিনি স্নাতক শেষ করেন। এরপর তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি দেন মিশরের কায়রো আল আজহার ইউনিভার্সিটি। সেখানেই ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাথে তার সংযোগ হয়। কর্মসূচিতে মনোযোগী হন। এরপর ইসলামিক দর্শনের উপর মাস্টার্স ডিগ্ৰী লাভ করেন।এহেন সময় উপমহাদেশে কমিউনিস্টদের উন্মেষ ঘটে।

 

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারতের সব প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিংহভাগ মেধাবী ছাত্ররা সমর্থক হয়ে যায়। পাকিস্তানে কমিউনিস্টরা নিষিদ্ধ থাকলেও তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তরালে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। সর্বাধিক কমিউনিস্ট ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ দলে। শোনা যায় ভাসানী, তাজউদ্দিনের মতো নেতারা ছদ্মবেশি কমিউনিস্ট ছিলেন। উক্ত সময় কমিউনিস্টরা ইসলামপন্থীদেরও বিভ্রান্ত করেছে। পাকিস্তানের ইসলামপন্থীরা ইসলামী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে খেলাফতে রব্বানী নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেব । তাদেরই সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দুনে মজলিস।

 

এই সময়ে বুরহানউদ্দিন রব্বানী কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লেখনী শুরু করেন।
তখন রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসীন । আর রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী । আফগানিস্তানের অদূরে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের প্রভাবে আফগানিস্তানের যুব সমাজ কমিউনিস্টদের ছায়াতলে অবলীলায় জমায়েত হয়। তখন বুরহানউদ্দিন আফগানিস্তানের জনতার মধ্যেই ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করেন লেখালিখি মাধ্যমে । কমিউনিস্টদের প্রকৃত রূপও তিনি আফগানিস্তানের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। সেই থেকে তিনি কমিউনিস্টদের পরম শত্রুতে পরিণত হন।
তিনি মিশরের আরবি ইসলামী সাহিত্যগুলো ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করতে চেষ্টা করেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ফি যিলালিল কুরআন-সহ সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের সমস্ত সৃষ্টি ফার্সিতে ভাষান্তর করেন। যাতে ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মুসলিমরা ইসলামের সঠিক রূপ অনুধাবন করতে পারেন।

 

তিনি পিএইচডি করার জন্য পুনরায় মিশরে যান। তার গবেষণার বিষয় ছিল ফার্সি কবি জামির জীবনপ্রবাহ। বুরহানউদ্দিন রব্বানীর পিএইচডি’র শিরোনাম ছিল, “The Philosophy and Teachings of Abd al-Rahman Muhammad Jami.” বুরহানউদ্দিন নিজে দেখা করেন মাওলানা মওদুদীর সাথে।
১৯৬৮ সালে বুরহানউদ্দিন রব্বানী আবার আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন। তখন মাওলানা মওদুদী তাঁকে আফগানিস্তানের ছাত্রদের একত্রিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। অতঃপর তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট বিরোধী ভাষণ ও লেখালিখির জন্য তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। চার বছরের পরিশ্রমের ফলে বুরহানউদ্দিন রব্বানী মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশের সমর্থন পান।
১৯৭২ সালে জমিয়তে ইসলামী আফগানিস্তান – এর প্রতিষ্ঠাতা- সদস্য ছিলেন। আফগানিস্তানে জমিয়তে ইসলামীর প্রথম আমীর বুরহানউদ্দিন রব্বানী,সম্পাদক সাইয়্যেদ নুরুল্লাহ ইমাদ। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, উস্তাদ জাবিউল্লাহ, আহমদ শাহ মাসউদ, ইসমাইল খান, আতা মুহাম্মদ নূর, মোল্লা নকীব, ড. ফজলুল্লাহ, গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার প্রমুখ।
১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন জহির শাহ। সেই সময়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ দেখা যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীর দাউদ খান ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যন্থনের মাধ্যমে
রাজতন্ত্রের অবসান ঘটান।

 

১৯৭৪ সালে মুসলিমদের সংগঠিত করার অপরাধে বুরহানউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে দাউদ খান। দাউদ খানের শাসন আমলে আফগানিস্তানের জনতা কেউ খুশি ছিল না। তিনি বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের নির্যাতন করে। তাকে স্বৈরাচার বলা হয়।
১৯৭৫ সালে জামায়াতের পশতুন নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার পশতুন নেতাদের নিয়ে জামায়াত পরিত্যাগ করে। মূলত তার বিবাদ হয় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন সয্যান-ই জোওয়ানান-ই মুসলমান (Organization of Muslim Youth)-এর সভাপতি আহমদ শাহ মাসউদের সাথে। তাকে হত্যারও চেষ্টা করেন গুলবুদ্দিন। অবশেষে তিনি হিজবে ইসলাম নামে আরেকটি সংগঠনের জনক ছিলেন।

 

১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে পুনরায় সামরিক অভ্যন্থানের ফলে বামপন্থীরা ক্ষমতায় চলে আসে। বামপন্থী নেতা ড. নাজিবুল্লাহ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। নাজিবুল্লাহ ক্ষমতায় এসেই ইসলামপন্থীদের উপর দমন পীড়নের সূচনা করে।
নাজিবুল্লাহ সমাজতন্ত্রের বিস্তার করতে তৎপর হলে দেশের ইসলামি দলগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই সময় সমাজতন্ত্রী সেনাদের হাতে সারাদেশ পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ নিহত হয়। ১৯৭৯ সালে ২৪ টি প্রদেশে সংঘাত শুরু হয়। অর্ধেকের বেশি সৈনিক সেনাবাহিনীর থেকে পলায়ন করে। ৬ জুলাই বুরহানউদ্দিনের নির্দেশে আহমদ শাহ মাসউদ পানশিরে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সম্মুখ যুদ্ধে সফল না হয়ে তারা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান সরকারকে বহাল রাখার জন্যে সেনা প্রেরণ করেন।সরকার বিরোধীদের তারা নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে।
জমিয়তের নেতৃত্বে মুজাহিদিন গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদিন গ্রুপের প্রধান আহমদ শাহ মাসউদ সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন। ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রুশ বাহিনী আফগানিস্তান পরিত্যাগ করে। তারপরও নাজিবুল্লাহর সরকার মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। আহমদ শাহ সরকার বিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখেন। দেশে চরম দুরাবস্থা বিরাজমান হলে ১৯৯২ সালে ১৭ এপ্রিল এই সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ২৮ এপ্রিল অন্তবর্তীকালীন ইসলামিক সরকারের প্রধান হন সিবঘাতুল্লাহ মুজাদ্দেদী।

 

২৪ এপ্রিল পেশোয়ারে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সমাজতন্ত্রবিরোধী দলগুলোর মধ্যে শান্তি ও ক্ষমতা বন্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। দলগুলো হলো- জমিয়তে ইসলামী (বুরহান উদ্দিন রব্বানী), হিজব-ই-ইসলামী (গুলবুদ্দিন হিকমতিয়ার), হিজব-ই-ইসলামী (ইউনুস খালিস), ইত্তেহাদ-ই-ইসলামী ইসলামিক এলায়েন্স (রাসূল সায়েফ)], মিল্লি ইসলামী মাহাজ (আহমদ গিলারু), জাজহা সিহাত-ই-মিল্লি (সিবঘাতুল্লাহ মুজাদ্দেদী) ও হারাকাত-ই-ইসলামী (নবী মোহাম্মদ) প্রমুখ।
এই চুক্তিতে বুরহানউদ্দিন রব্বানী রাষ্টপতি, আহমদ শাহ মাসউদ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গুলমুদ্দিন হেকমতিয়ার প্রধানমন্ত্রী করা হয়। কিন্তু হেকমতিয়ার এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। মূলত তাকে রাজি করান উসামা বিন লাদেন। কারণ, লাদেন অনুভব করতে পেরেছিলেন এখন যদি গুলবুদ্দিন চুক্তি না মানে তাহলে তার সাথে মাসউদের যুদ্ধ অনিবার্য। অন্যদিকে মাসউদও ইচ্ছুক ছিলেন যুদ্ধ করে হিজবে ইসলামকে পরাজিত করতে।
কিন্তু বিরুদ্ধচারণ করেন বুরহানউদ্দিন রব্বানী। তিনি মুসলিমদের মধ্যে রক্তে রঞ্জিতের বিরোধী ছিলেন। মাসউদকে যুদ্ধ থেকে নিভৃত করেন তিনি।

 

অবশেষে গুলবুদ্দিন সিআইএ মদতপুষ্ট আল কায়েদার প্রধান বিন লাদেনের পরামর্শক্রমে চুক্তিতে সম্মতি হন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর বিন লাদেনের পরামর্শ এবং সাহায্যে ব্যতীত মাত্র ছয় মাসের মাথায় ইসলামী রিপাবলিক অব আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
বুরহানউদ্দিন রব্বানী চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে হেকমতিয়ারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। হেকমতিয়ারের দাবী ছিল তার অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও দিতে হবে এবং আফগান সেনাবাহিনী তার নেতৃত্বে থাকবে। এটাই সম্মতি দেওয়া ছিল বুরহানউদ্দিন রব্বানীর জন্য আত্মহত্যার শামিল। তিনি হিজবে ইসলামের সকল যোদ্ধাকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এরপরও শান্তি চুক্তিতে রাজি ছিলেন না হেকমতিয়ার। গৃহযুদ্ধ শুরু করে দেন।

 

সরকারি সুবিধা নিয়ে হেকমতিয়ার বিদ্রোহ করে। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। চরম গোলযোগের মধ্যে আমেরিকার মদদপুষ্ট আল কায়েদা ও পাকিস্তান সরকার হেকমতিয়ারের অনুসারীদের মধ্য থেকে নতুন গোষ্ঠী তৈরি করে দেয়। এর নাম তালিবান। এদের উত্থান হয় বিদেশী শক্তির মদদে। ১৯৯৬ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে তালেবান ক্ষমতা দখল করে। হেকমতিয়ার এবং আহমদ শাহ মাসউদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। বুরহানউদ্দিন রব্বানী তালিবান বিরোধী জোট গঠন করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। আহমদ শাহ মাসউদ ছিলেন জামিয়াতে ইসলামীর সামরিক শাখার প্রধান।
বুরহানউদ্দিন রব্বানী, যিনি আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্ট ও রুশদের বিতাড়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকায় অবতীর্নের জন্য তাকেই
তালেবানরা ক্ষমতাচ্যুত করে। তারপরও তিনি দমিত হননি । আমেরিকার ষড়যন্ত্র ও তালেবানদের সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন আফগানিস্তানের মানুষকে। তালেবান শাসনামলে জামিয়তে ইসলামীর দশ শতাংশ আফগানিস্তানের শাসক ছিল।
২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর (টুইন টাওয়ারে হামলার মাত্র দুই দিন আগে) উত্তর আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশে খাজা বাহাউদ্দিন এলাকায় আল কায়েদার আত্মঘাতি হামলায় আহমদ শাহ মাসউদকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। ওসামা বিন লাদেন শুরু থেকেই জমিয়তের বিরুদ্ধাচরন করে যাচ্ছিল। এর আগে বহুবার কেজিবি, আইএসআই আফগান কমিউনিস্ট কেএইচএডি, তালেবান ও আল-কায়েদা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তাঁর জন্মস্থান বাজারাকেই তাঁকে দাফন করা হয়।
শহীদ বুরহানউদ্দিন রব্বানী চাইলে সমাজতন্ত্রীদের পতনের পর হেকমতিয়ারকে উড়িয়ে দিতে পারতেন। তাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালাতে পারতেন রাষ্ট্রীয় শক্তি মাধ্যমে । কিন্তু এই মহান মানুষ কখনোই ভ্রাতৃঘাতি কার্যক্রমের পক্ষে ছিলেন না। তিনি সব মুসলিম ভাইকে নিয়ে আফগানিস্তানের উন্নতি চেয়েছিলেন। কিন্তু হেকমতিয়ারের একগুঁয়েমির কারণে সব ভেস্তে যায়। তার অসদাচারনের জন্য বিদেশী শক্তি আসে আল কায়েদা ও তালিবানের নাম করে। তিনি তালিবানের বিপক্ষেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চাননি। কিন্তু পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রনে শেষ পর্যন্ত ছিল না।
২০০১ সালে আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করে আফগানিস্তান অধিকার করে। এই দখলের জন্যই আল কায়েদা ও তালেবানের সৃষ্টি হয়। আফগানিস্তানে জমিয়ত ক্ষমতায় আসায় তা মাথাব্যাথার কারণ হয় আমেরিকার। সব মিলিয়ে আফগানিস্তানে ইসলামপন্থীদের বড় বিজয়ের পরও তা হাতছাড়া হয়ে যায় কিছু হটকারি জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতার জন্য।
শহীদ বুরহানউদ্দিন রব্বানী আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সহ্য করতে পারছিলেন না। এদিকে তালেবানদের দমন না
হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা তাদের সৈন্য প্রত্যাহারে রাজি হচ্ছিলনা। আমেরিকা সারা দেশ থেকে তালেবানদের হটালেও কান্দাহার ও হেলমান্দ প্রদেশ থেকে তাদের তাড়াতে ব্যর্থ হয়। এটা ছিল আমেরিকানদের কৌশল। তারা চেয়েছিল তালেবান টিকে থাকুক। তাহলে তারাও আফগানিস্তানে ঘাঁটি করে থাকতে পারবে।
২০১১ সালে তিনি কাবুল সরকার, তালিবান এবং মার্কিনিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়ে উঠেন এই তিন বাহিনীর মধ্যস্থতাকারী। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে সচেষ্ট হন। মুসলিম রক্ত নিয়ে মুসলিমরাই রক্ত উৎসব শুরু করেছিল। তিনি এটা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।
তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিল বারাক ওবামা। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যদি যুদ্ধ বন্ধ হয় তাহলে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করা হবে। বারাক ওবামা নিজেকে ষড়যন্ত্রের বাইরে রাখার জন্য ও শান্তিতে আমেরিকা বিশ্বাসী এটা প্রমাণ করার জন্য কয়েক ব্রিগেড সৈন্য প্রত্যাহার করে ।
শান্তিচুক্তি অনুসারে আফগানিস্তানে কান্দাহার ও হেলমান্দ শাসন করবে তালেবানরা। আফগান সরকার তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না। বিনিময়ে তারা শুধু ট্যাক্স প্রধান করবে। শান্তি চুক্তি হলে আমেরিকার সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করবে। এই চুক্তি সব পক্ষের জন্য ভালো হলেও খারাপ হবে শুধু আমেরিকার জন্য।
তারা যে উদ্দেশ্যে আফগানিস্তানে ঘাঁটি তৈরি করেছে তা ব্যাহত হবে। শান্তিচুক্তির কয়েকদিন পূর্বে তালেবানদের পক্ষ থেকে জানানো হয় তাদের আর কিছু মতামত আছে। তারা আফগান হাই পিস কাউন্সিলের প্রধান বুরহানউদ্দিন রব্বানীর সাথে চুক্তি বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্ৰহী।কাবুলে বুরহানউদ্দিন রব্বানী তাদের সাথে কথা বলার জন্য ২০ সেপ্টেম্বর ২০১১ সাল নির্ধারণ করে। তালিবানের পক্ষ থেকে আলোচনার সময় দু’ইজন এসে আত্মঘাতী হামলা করে।উক্ত দিনে এতে শাহদাত বরণ করেন আফগানিস্তানের শান্তি রক্ষায় ও বিদেশী শক্তি থেকে দেশ উদ্ধারের জন্য নিবেদৃতপ্রাণ বুরহানউদ্দিন রব্বানী।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও হাই পিস কাউন্সিলের প্রধান-কে ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কাবুলের ওয়াজির আকবর খান কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
উল্লেখ্য, প্রথমে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রেসিডেশাল প্যালেসে জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
বুরহানউদ্দিন রব্বানীকে খুন করে তালেবানরা আমেরিকার স্বার্থ বজায় করলো। এই ঘটনার পর বারাক ওবামা দুঃখ প্রকাশ করে আরো প্রচুর সেনাসদস্যদের আফগানিস্তানে প্রেরণ করে। ভেস্তে যায় শান্তি আলোচনা।