মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী
খ্যাতনামা, প্রখ্যাত, প্রভাবশালী, আফগান রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত, মুজাহিদ নেতা ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর তিনি দেশটির প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আফগানিস্তানের আধুনিক ইতিহাসে তাকে একজন মধ্যপন্থী মুসলিম নেতা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়।
১৯২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের কাবুলে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানিত সুন্নি পশতুন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার আধ্যাত্মিক সুফি ধারার (নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া) সাথে সংযুক্ত ছিল।
তিনি কাবুলের হাবিবিয়া হাই স্কুলে পড়াশোনা সমাপ্ত করে মিশরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত আফগান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের অন্যতম নেতা ছিলেন।
সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্ৰামে তিনি ‘আফগান ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ নামে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।আফগান মুজাহিদ নেতাদের মধ্যে তিনি বিশেষ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন।
সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান পরিত্যাগ করার পর এবং তৎসময়ের আফগান রাষ্ট্রপতি কমিউনিস্ট ড. নাজিবুল্লাহ সরকারের পতন হলে ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে মুজাদ্দেদী হজরত আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান বা অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট হন। চুক্তি অনুযায়ী মাত্র দুই মাস (২৮ এপ্রিল থেকে ২৮ জুন ১৯৯২) দায়িত্ব পালনের পর তিনি বুরহানুদ্দিন রব্বানির নেতৃত্বাধীন পরবর্তী কাউন্সিলের সমীপে
শান্তিপর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
মুজাদ্দেদী কাবুলের একটি অত্যন্ত সম্মানিত সুন্নি পশতুন পরিবারের সদস্য,যিনি বিখ্যাত সুফি সাধক আহমদ সিরহিন্দি মুজাদ্দিদে আলফেসানি রাহ.-এর বংশধর ছিলেন। এই হেতু ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের ব্যাপক সুনাম ও প্রভাব ছিল।
তিনি দারি, পশতু, আরবি, উর্দু এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন ।অতএব বহুভাষাবিদ নামে পরিগণিত।
১৯৫০-এর দশকে আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়, মুজাদ্দেদী সাহেব তখনই তীব্র কলেবরে তার বিরোধিতা করেন। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভের আফগানিস্তান সফরের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোেগ এনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিনা বিচার ১৯৫৯-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। মুক্তি লাভের পর
তাকে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয় এবং তিনি ডেনমার্ক ও পাকিস্তান- সহ নানা দেশে অবস্থান করেন।
১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের পর তিনিই প্রথম সারির নেতা হিসেবে অধিকৃত বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্ৰামের আহ্বান করেন।
তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে অবস্থানকালে ‘আফগান ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। পেশোয়ারভিত্তিক সাতটি প্রধান মুজাহিদ দলের মধ্যে তাঁর দলটিকে সবচেয়ে মধ্যপন্থী ও ঐতিহ্যবাদী সাব্যস্ত করা হতো। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের মতো কট্টরপন্থীদের বিপরীতে মুজাদ্দেদী সাহেব আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় কাঠামো ও ইসলামের একটি উদার সংস্কৃতির আগ্ৰাসী ছিলেন।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা কট্টরপন্থী দলগুলোকে অত্যধিক অস্ত্র সরবরাহ করায় মুজাদ্দেদীর দলের সামরিক শক্তি তুলনামূলক হ্রাস পায়। কিন্তু তাঁর পারিবারিক মর্যাদা ও ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের হেতু সমুদয় মুজাহিদ উপদলের সমীপে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সীমাহীন ।
১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে কাবুলের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহ-র সরকারের পতন ঘটে। পরে মুজাহিদ গোষ্ঠীগুলো গৃহযুদ্ধ এড়াতে পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি চুক্তি করে, যার অধীনে আফগানিস্তানকে একটি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ ঘোষণা করা হয় এবং মুজাদ্দেদীকে -এর প্রথম
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান করা হয়।
১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল মুজাদ্দেদী হজরত যখন পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করে বিমানে কাবুলে আসছিলেন,
তখন তাঁর বিমান লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালানো হয়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং কাবুলে এসে মসনদে আহরণ করেন।
ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি দেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কমিউনিস্ট সরকারের সাবেক কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেন, দেশে নতুন প্রতিশোধের রাজনীতির বিনাস হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিক
দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯২ সালের ২৮ জুন তিনি অধ্যাপক বুরহানুদ্দিন রব্বানির নেতৃত্বাধীন কাউন্সিলের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেন। আফগান রাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতার জন্য রক্তের লেলিহান শিখা প্রজ্বলিত হয়, সেখানে তাঁর এই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এক বিরল ঘটনা ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, এরপরই বিভিন্ন মুজাহিদ উপদলের ক্ষমতার দম্ভে আফগানিস্তানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।
আফগানিস্তানের আধুনিক ইতিহাসের পট পরিবর্তনের প্রধান কারিগর অধ্যাপক সেবগাতুল্লাহ মুজাদ্দেদী। সোভিয়েত আগ্রাসন বিরোধী প্রতিরোেধ সংগ্ৰাম থেকে উত্তর-তালেবান যুগে গণতান্ত্রিক আফগানিস্তান পুনর্গঠনে তাঁর তৎপরতা ছিল সীমাহীন তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর তিনি পুনরায় আফগান রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৩ সালে আফগানিস্তানের নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গঠিত ঐতিহাসিক ‘লোয়া জিরগা’-র চেয়ারম্যান পদে তিনি নেতৃত্ব দেন।ডিসেম্বর ২০০৫ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০১১ সাল পর্যন্ত
তিনি আফগান সংসদের উচ্চকক্ষ ‘মেশরানো জিরগা’ -র, প্রবীণ সভারর স্পিকার বা চেয়ারম্যান পদে আসীন হন।
তিনি আফগান হাই পিস
কাউন্সিলের সদস্য হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সমঝোতার জন্য নিরলস ভাবে কাজ করেছেন।
২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযানে তালেবান সরকারের পতনের পর মুজাদ্দেদী সাহেব পুনরায় আফগানিস্তানের জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের অভিপ্রায়ে বিশেষ তৎপর ছিলেন।
২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আফগানিস্তানের নতুন সংবিধান চূড়ান্ত ও অনুমোদনের জন্য দেশজুড়ে উপজাতীয় প্রবীণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ‘লোয়া জিরগা’ তথা গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলি আহ্বান করেন। অধ্যাপক মুজাদ্দেদীকে উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সভার চেয়ারম্যান বা সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তাঁর দক্ষ ও নিরপেক্ষ সঞ্চালনায় তিন সপ্তাহের তীব্র বিতর্কের অবসানের পর ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে আফগানিস্তানের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান
অনুমোদিত হয়।
২০০৫ সালে তৎকালীন
প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের অনুরোধে তিনি আফগান সংসদের উচ্চকক্ষ ‘মেশরানো জিরগা’- র চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন।
তিনি আফগানিস্তানের ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর পিস’ (আফগান হাই পিস কাউন্সিল)-এর প্রধান পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তালেবান যোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ করে মূলধারার রাজনীতি ও সমাজে ফিরে আসার জন্য আজীবন আহ্বান জানিয়ে গেছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়ার কারণে তিনি তালেবান ও অন্যান্য কট্টরপন্থীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ২০০৬ সালে একটি আত্মঘাতী কার বোমা হামলা থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।
স্ত্রীর সুলাইমান লায়েকের পরিবারের সাথে সম্পর্কিত ছিল। তাঁর স্ত্রী বোরকা বা পর্দা পরিধান করতেন এবং বিভিন্ন সফরে তাঁর সঙ্গী হতেন।
সন্তান: সেবগাতুল্লাহ মুজাদ্দেদীর ৫ জন সন্তানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই পুত্র হলেন:(১)
ড. জাবিহুল্লাহ মুজাদ্দেদী ছিলেন একজন আফগান রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী এবং কাবুলের সাবেক গভর্নর।
(২)শেখ আসমতুল্লাহ মুজাদ্দেদী ছিলেন আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনীতি এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ অসুস্থতার পর কাবুলে ৯৩ বছর বয়সে এই প্রবীণ জননেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।তার ওফাতের পর তাকে কাবুলের আশিকান ওয়া আরিফান মাজার সংলগ্ন তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আয়োজিত তার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি, ড. আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ
এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন কার্য সুসম্পন্ন হয়।
বিশ্বরাজনীতিতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে তাকে আফগানিস্তানের “গণতন্ত্রের অক্লান্ত রক্ষক এবং শান্তির মূল্যবান অংশীদার” হিসেবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়েছিল। সারা জীবনেই তিনি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের একটি সহনশীল ও মধ্যপন্থী জীবনপ্রবাহের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ।