বিনোদনের রাজধানী লাস ভেগাসে

বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়   বেশ কয়েক দিন হল মার্কিন দেশে এসেছি, আর দিন-রাতের দোলাচলে পড়তে হচ্ছে না। এখন আছি সিয়েরা নেভাদা পাহাড়ে ঘেরা সান হোসে-তে। এখান থেকে বেড়াতে যাব বেশ কয়েকটা....

বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বেশ কয়েক দিন হল মার্কিন দেশে এসেছি, আর দিন-রাতের দোলাচলে পড়তে হচ্ছে না। এখন আছি সিয়েরা নেভাদা পাহাড়ে ঘেরা সান হোসে-তে। এখান থেকে বেড়াতে যাব বেশ কয়েকটা জায়গায়…লেক টাহো, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এবং লাস ভেগাস।

সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স এক সস্তা উড়ান সংস্থা, তাদের বোর্ডিং পাসে কোনও সিট নাম্বার নেই! আমি একদম শেষের দিকে জানলার ধার পেয়েছি।

আকাশ নির্মেঘ, চার দিক নীল, নীচে যত দূর চোখ যায় মরুভূমি, মাঝে মাঝে নানা রঙের পাথুরে পাহাড়, তেপান্তরের মাঠের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে সরু ফিতের মতো হাইওয়ে। চলেছি মোহাভে মরুভূমির উপর দিয়ে, লাস ভেগাস এই মরু রাজ্যেই।

ধীরে ধীরে আমাদের বিমান নেমে আসে মাটিতে, থুড়ি, বালিতে! বেশ বড় বিমানবন্দর, বেশির ভাগ মানুষই বেড়ানোর পোশাকে, ফুরফুরে মেজাজে! বিমানবন্দর থেকেই ক্যাসিনো শুরু, সতর্ক হয়ে পাশ কাটাই। একটা বড় সেল্‌ফ ড্রাইভ গাড়ি ভাড়া নেওয়া হল, ভাই-ই বেশির ভাগ চালাবে, আমি মাঝে মাঝে।

লাস ভেগাসের সঙ্গে ভূগোল বইয়ের বাইরে আমার প্রথম পরিচয় সমরেশ মজুমদারের লেখা পড়ে, তখন আমি ক্লাস টুয়েলভ! সে গল্পের পাতায় পাতায় লাস্য, লাম্পট্য আর নেশায় মোড়া পাপের রাজধানীর ছবি। নেভাদা রাজ্যের এই শহরের ডাকনাম ভেগাস, বেশ কয়েক হাজার বছরের পুরনো এর ইতিহাস। ১৯০৫ সালে শুরু হয় আধুনিক লাস ভেগাসের স্থাপনা। ২০২৩ সালের হিসেব অনুযায়ী বছরে চার কোটির বেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন।

অতিথি অভ্যর্থনায় অনন্য লাস ভেগাসগাড়ি এখন চলেছে আমাদের হোটেলের দিকে, জায়গাটার নাম লাস ভেগাস স্ট্রিপ। এটাই বিনোদনের রাজধানী। চার দিকে ক্যাসিনো, নাইট ক্লাব, শপিং মল, রেস্তরাঁ, বিশালাকৃতি সব হোটেল। আমরা থাকব বেলাজিও-তে। এটাকে ঠিক হোটেল বলা যাবে না। কী নেই এখানে? ক্যাসিনো, বিভিন্ন দেশের খাবারের রেস্তরাঁ, পৃথিবীর সব মহার্ঘ্য ব্র্যান্ডের দোকান, ঝলমলানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

চেক-ইন কাউন্টারের সর্পিল লাইন পেরিয়ে লবিতে পৌঁছে দাঁড়াতেই হল। আমার চোখের সামনে বিখ্যাত ব্যালে ‘নাটক্র্যাকার’-এর চরিত্ররা! মানুষ সমান পুতুলগুলো প্রায় জীবন্ত! এক দিকে নায়িকা ঘুমিয়ে আছে, অন্য দিকে এক ব্যালেরিনা, পাশেই নাটক্র্যাকার। চার দিক ভেসে যাচ্ছে এই ব্যালের সঙ্গীতকার প্রবাদপ্রতিম রাশিয়ান শিল্পী চাইকোভস্কির সুরমূর্ছনায়! মুগ্ধ হয়ে কিছু ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি, তার পর এগিয়ে যাই লিফ্‌টের দিকে, আমাদের ঘর বত্রিশ তলায়।

ক্লান্ত শরীরে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, উঠে দেখি জানলা দিয়ে সূর্যাস্তের নরম মায়াবী আলো ঘরে এসে পড়েছে। মনে পড়ল আরে! একটু পরেই তো সেই বিখ্যাত ড্যান্সিং ফাউন্টেন শো শুরু হবে! জায়গাটা আমাদের হোটেলের একেবারে সামনে। তাড়াতাড়ি নেমে আসি। ভিড় জমতে শুরু করেছে, ঠেলেঠুলে সামনে জায়গা দখল করি। ক্যামেরা পজ়িশন নেয়। আলো কমতেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, এ দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। বিশাল জায়গা জুড়ে আলো, জল আর অর্কেস্ট্রার মেলবন্ধনে স্বপ্নদৃশ্যের অবতারণা! এক দিকে সুরের তালে এক ফোয়ারা নেচে উঠছে তো অন্য দিকে আলো ভাসিয়ে দিচ্ছে জলের ঝর্নাকে। লাল, সবুজ, নীল, হলুদ, বেগুনি…বর্ণালির সব রং মিশে যাচ্ছে সন্ধের আকাশের রঙের সঙ্গে, একে একে জ্বলে উঠছে প্রমোদ নগরীর প্রাসাদেরা, রাত নামছে মায়ানগরীতে।

লাস ভেগাসের পথঘাট

মুগ্ধতার রেশ কাটতেই খেয়াল হল, পেটে ছুঁচো ডনবৈঠক দিচ্ছে। খাবারের সন্ধানে বেরোলাম। রাস্তা পেরোতেই দেখি সুসজ্জিত দু’জন শো-গার্ল এগিয়ে আসছে, নিরীহ বাঙালি আমি ঘাবড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ি সামনের রেস্তরাঁয়। আমাকে অনুসরণ করে ভাই, মেয়ে এবং অর্ধাঙ্গিনী। পরে জেনেছি এই শো-গার্লরা কিন্তু খুবই ভদ্র, আমি যা ভাবছিলাম একেবারেই তা নয়। যাক সে কথা, ডাইনিং হলটা বিশাল, আমেরিকার বিখ্যাত চাইনিজ রেস্তরাঁ চেন, নাম পিএফ চ্যাং। পেট পুরে সুশি, চাউমিন আর ঝলসানো চিকেন দিয়ে ডিনার সারি।

পরের গন্তব্য ক্যাসিনো। দৈত্যাকৃতি হোটেল চার পাশে, প্রত্যেকটির সঙ্গে রয়েছে সুবিশাল ক্যাসিনো। একটা ব্যাপার দেখে ভাল লাগল যে, বেশির ভাগ মানুষই বেড়াতে এসেছেন পরিবারের সবার সঙ্গে। বাবা-মার সঙ্গে মিষ্টি পুঁচকে বাচ্চা, অথবা মধ্যবয়সি দম্পতি, সবাই নিজের মতো করে উপভোগ করছেন, কোথাও লাম্পট্যের চিহ্ন মাত্র নেই। রাস্তায় বেরোতেই এক অদ্ভুত গন্ধ নাকে এল, ভাই বলে, “বলো তো, এটা কিসের গন্ধ?” আমি তো বুঝতে পারছি না। সে বলে, “গাঁজা, এখানে গঞ্জিকাসেবন আইনসিদ্ধ, তাই অনেকেই তুরীয় অবস্থায় মজে আছেন।”

ক্যাসিনোর ভিতরে

ক্যাসিনোয় খেলার অনেক রকম ব্যবস্থা, স্লট মেশিন, রুলে, ব্ল্যাক জ্যাক ইত্যাদি। আমাদের মতো সাধারণ পর্যটকরা অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য স্লট মেশিনেই একটু খেলে নেয়৷ আমিও খেললাম, ১ ডলার দিলাম, মেশিন গপ করে গিলে নিল। নাহ! ঝনঝন আওয়াজ করে কিছুই বেরোল না, বোকার হাসি হেসে মেয়েকে বলি, “খেলায় তো হার-জিত আছেই, আসল হচ্ছে স্পিরিট, বল!”

সামনেই বড় বিলিয়ার্ড টেবিলের মতো একটা খেলার জায়গা, সেখানে অবিকল ভিলেনের মতো দেখতে কয়েক জন বসে গুটি সাজিয়ে খেলছেন, তাঁদের পাহারা দিচ্ছেন দশাসই চেহারার বেশ কিছু

দেহরক্ষী। আমি ক্যামেরা তাক করতেই ওঁরা কঠিন শীতল চোখে আমার দিকে তাকান, মানে মানে সটকে পড়ি।

বাইরে বেরোতেই দেখি এক জায়গায় বেশ ভিড়, সামনে আগুনের মতো কী একটা জ্বলছে! কী ব্যাপার? মেয়ে বলে, “বাবা, এর নাম হেল’স কিচেন। টেলিভিশনে রান্নার রিয়েলিটি শোয়ের পৃথিবী-বিখ্যাত শেফ গর্ডন র‍্যামসের এই রেস্তরাঁ খাদ্যরসিকদের কাছে স্বর্গসম, এখানে না-খেলে নাকি সমাজে মুখ দেখানো যায় না।” কলকাতার বিরিয়ানির ভক্ত আমি গুটি গুটি পায়ে হাঁটা দিই সামনে, সেখানে তখন আতশবাজির খেলা শুরু হয়েছে।

মোহাভে মরুভূমিএ বার ক্লান্ত লাগছে, হোটেলে ফিরলেই হয়। সামনেই দেখতে পাচ্ছি ভেনিসের আদলে তৈরি ভেনিসিয়ান হোটেল এবং প্লাজ়া। মানুষের তৈরি আকাশের নীচে ক্যানালের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে গন্ডোলা, জলের ধারে বসে গল্প করছে প্রেমিক-প্রেমিকা, কোথাও কোনও দুঃখ নেই, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’।

হোটেলে ফেরার পথেই পড়ল সিজ়ার্স প্যালেসের প্রেক্ষাগৃহ। সারা পৃথিবীর বিখ্যাত শিল্পী এখানে অনুষ্ঠান করেন। প্রাসাদসম এই হলের ভিতরের স্তম্ভে ঝুলছে এই প্রজন্মের প্রিয় ব্রিটিশ গায়িকা অ্যাডেলের ছবি। আমার মেয়ে আবার আসার প্ল্যান করে, শুধু তার প্রিয়তম শিল্পীর গান শুনবে বলে।

রাত গভীর হয়, আচমকাই মরু রাজ্যে মেঘ ডাকে। এক আকাশ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হোটেলে ফিরি। কাল সকালে লম্বা সফর, যাব গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে, ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে আসে।