রূপায়ণ ভট্টাচার্য
আমরা এখনও বুঝতে পারিনি, চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকারী আসলে কে। সবাই আশ্চর্যরকম চুপ।
আমরা এখনও জানতে পারিনি, আলিপুরের সরকারি বিল্ডিংয়ের নয় আর দশতলায় আগুন লেগে কয়েক হাজার ইভিএম পুড়ে ছাই হয়ে গেল কী করে। সবাই আশ্চর্যরকম চুপ।
তবে আমরা জেনে ফেলেছি, বাগেশ্বর বাবার আসল স্বরূপ।
এর মধ্যে দেখেছি, হঠাৎই শুভেন্দু অধিকারী মশাই আবিষ্কার করেছেন, খাঁটি বিজেপি নেতা হতে গেলে শুধু গরম ভাষণ দিলে চলবে না। সঙ্গে অন্তত একজন প্রথম সারির বাবার আশীর্বাদ থাকা চাই।
হবে নাই বা কেন? হিন্দি বলয়ের দিকে চোখ ফেরালেই যে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। তখন কেউ অধিকারী মশাইকে নিয়ে রঙ্গরসিকতা করতে পারবেন না, বলে দিলাম!
উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ তো শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, নিজেই খোদ গোরক্ষনাথ মঠের প্রধান। তাঁর রাজনৈতিক ভিতের পেছনে ছিলেন তাঁর গুরু মহন্ত অবৈদ্যনাথ। সেখানে সাধুর আশীর্বাদ চাইতে যাওয়ার দরকার পড়ে না, মুখ্যমন্ত্রী নিজে গেরুয়া পরে মঞ্চ কাঁপান। সঙ্গে তল্পিতল্পা গুটিয়ে হাজির থাকেন রামভদ্রাচার্য আর নৃত্যগোপাল দাসেরা।
মধ্যপ্রদেশেও ছবিটা বেশ চোখধাঁধানো। মহাকাল করিডোরের হাওয়া গায়ে মেখে মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ব্যস্ত থাকেন সাধুসন্তদের তুষ্ট রাখতে। সেই রাজ্যে আবার রামদেবের চশমা থেকে শুরু করে বাগেশ্বর ধামের বাবার খড়ম পর্যন্ত সব কিছু দেখতে ভক্তদের ভিড়। মুখ্যমন্ত্রী যাদব আবার রামদেব ও বাগেশ্বর বাবার মতো আচার্য বালকৃষ্ণ ও দেবকীনন্দন ঠাকুরেরও ঘোর ভক্ত।
রাজস্থানে ঢুকে দেখবেন, ভজনলাল শর্মাও প্রতিদিন কোনও না কোনও গোস্বামীর চরণে মাথা ঠেকাচ্ছেন। তিনি আবার ভক্ত স্বামী রামভদ্রাচার্যের। নাথদ্বার শ্রীনাথজির মন্দিরের পুরোহিত কিংবা হাথোজ ধামের আচার্যদের আশীর্বাদ ছাড়া সেখানে বাতাসও নড়ে না। গুজরাটে যেমন চোখে পড়ে, ধর্মীয় হাওয়ায় মোদি-শাহ-আম্বানি-আদানিকে ছাপিয়ে বাপস নামক সংস্থার সাধুদের প্রভাব বিশাল।
মহারাষ্ট্রে গিয়ে রাজনীতিকরা পনঢরপুরের বারকরী সন্তদের নামে বুক চাপড়ান। আবার সময় বুঝে সদগুরু কিংবা রবিশঙ্করের আধ্যাত্মিক শিবিরে গিয়ে হাতজোড় করে বসে থাকেন। বিহারে রাজনীতিবিদদের মাথায় আছেন রামানন্দী সম্প্রদায়ের সাধুরা। উত্তরাখণ্ডে সৎপাল মহারাজ তো পর্যটনমন্ত্রী।
এমনকী আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বুঝে গেছেন, রাজদণ্ড শক্ত রাখতে গেলে মাজুলির নামকরা সত্রাধিকারীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
চারপাশের এই আধ্যাত্মিক রমরমা দেখেই হয়তো শুভেন্দুর ঘুম ছুটেছিল। এমনিতেই তৃণমূল থেকে যাঁরা বিজেপিতে গিয়েছেন, তাঁদের নিজেদের প্রতি পদে প্রমাণ করতে হচ্ছে, আমরা হিন্দু। এতদিন তাঁরা বিজেপি-আরএসএসকে গালিগালাজ করেছেন। সব পুরোনো ভিডিওতে সোশ্যাল মিডিয়া উথলে উঠছে। তার প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রতিদিনই সিঁদুরের তিলক কাটছেন কেউ। কেউ গেরুয়া পাঞ্জাবি পরছেন। গলার শির ফুলিয়ে কেউ বলছেন, রবীন্দ্রনাথের গান বলেই কি সোনার বাংলা গাইতে হবে? আগের তৃণমূল জমানায় চালু হয়েছিল চটিচাটা শব্দটি। নতুন জমানায় সেই জায়গাটা নিয়েছে, ‘সিঁদুরটিপকাটা’ শব্দ।
অন্য রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের মাথায় যখন একের পর এক মহারাজের বরহস্ত, তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কী করবেন? তিনি প্রথমে রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসীদের সরকারি পদে রেখে দিলেন। কেন রাখলেন, বোঝা গেল না। মিশনের সন্ন্যাসীরাও অবাক, কেন তাঁদের রাখা হল স্কুল সার্ভিস কমিশনে বা বইমেলা কমিটিতে। নতুন কমিটিতেও সেই এক নিয়মে ধান্দাবাজ ও শাসকদের তৈলমর্দনকারীদের ভিড়। এরপর আবার ইসকনকে ডাকা হল মিড ডে মিলে যুক্ত হতে।
এ সবের মধ্যে অন্য রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে, শর্টকাট খুঁজতে শুভেন্দু আমদানি করলেন মধ্যপ্রদেশের ছতরপুরের বাগেশ্বর বাবাকে।
যিনি ভক্তদের মনের কথা কাগজে লিখে চমকে দেন, তাঁকেই ধরে সোজা নিয়ে আসা হল হাওড়ার মাটিতে। শুভেন্দু ভেবেছিলেন, বাবার এই কারসাজি দেখে বিরোধী শিবির হয়তো আতঙ্কে কাঁপবে। কিন্তু বাগেশ্বর বাবা বাংলায় পা দিয়েই যে ভজকট পাকিয়ে বসবেন, তা হয়তো শুভেন্দুর অতি বড় রাজনৈতিক শত্রুও ভাবতে পারেনি।
বাগেশ্বর বাবা ফেল। তাই কি তা হলে এবার নাগা সন্ন্যাসীদের আনতে হল! বাহ রে বাহ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে নাগাদের নাচ প্রথম দেখল কলকাতা। যাদবপুর নাগা-ল্যান্ড। ওদিকে কলকাতার রাস্তাঘাটের অবস্থা গর্ত-ল্যান্ড। বাইপাস গর্তে ভর্তি। দূরদর্শন কেন্দ্রের সামনে সেদিন দেখলাম, আবর্জনা-ল্যান্ড। আলো নেই, আঁধার-ল্যান্ড। একটু রাত হলেই একদিকের রাস্তায় গাদা গাদা গাড়ি লাইন করে দাঁড়িয়ে। পার্কিং-ল্যান্ড। এগুলো অগ্নিমিত্রা পালের চোখে পড়ে না? নাগাদের আমন্ত্রণ জানানোর বুদ্ধি যাঁর, তিনি নিশ্চয়ই পদ্ম পুরস্কার পাবেন।
ওদিকে বাগেশ্বর বাবা মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই ফতোয়া দিয়ে বসলেন, দুর্গাপূজার সময় বাঙালিরা মাছ মাংস খায় কেন? যারা নবমীর ভোগে পাঁঠার মাংস বা ইলিশ মুখে তোলে, তারা নাকি ভণ্ড ও অপবিত্র। এসব বলে তিনি তো ঝকঝকে ডিজাইন শার্ট আর প্যান্ট পরে চলে গিয়েছেন ইংল্যান্ডে। এদিকে বাংলায় তোলপাড়। বাগাড়ম্বর বাবার এই খাঁটি নিরামিষাশী বচনে আমজনতা তো চটলই, শুভেন্দুর নিজের দলের নেতারাও প্রমাদ গুনলেন। বাবাকে সামলাতে আসরে নামতে হল দলের রাজ্য নেতাদের। তাঁরা সাফাই দিতে শুরু করলেন যে এটা বাবার একান্ত ব্যক্তিগত মত। কালীপুজোয় পাঁঠাবলি আর পুজোর বাজারে খাসির মাংসের সঙ্গে রাজনীতির কোনও বিরোধ নেই।
অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের অনুকরণ করতে গিয়ে শুভেন্দু হয়তো ভেবেছিলেন বাবা এনে বৈতরণী পার হবেন। কিন্তু ফল আপাতত উল্টো। রাজনীতির পাটিগণিত কষতে এসে বাঙালিকে মাছ মাংস ছাড়ার নিদান দেওয়া যে রাজনৈতিক আত্মহত্যার সমান, বাবার সেই সহজ সত্যিটা বুঝতে সমস্যা হল। নিট ফল, পুজোর মুখে শুভেন্দুর বাবাপ্রীতি গিলতে এখন দলের কর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি ঘাম ছুটছে।
যে বাবা অর্ধেকের বেশি বাঙালিকে ভণ্ড বলছে, তাকেই ফলাও করে বিশাল কেন্দ্রের জন্য জমি দেওয়ার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্ভবত অবাঙালি ভোট টানতেই। বাঙালি মুসলিমরা তাঁর ঘোষিত শত্রু, অবাঙালিরা নন। প্রশ্ন হল. এসব কি করা যেতে পারে? বাংলায় বাগেশ্বর ধামের দরকার নেই। বাংলা ইতিমধ্যেই বাগাড়ম্বর ধাম প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে মন্ত্রী-বিধায়কদের দৌলতে। প্রতিবারই বিব্রত শমীক ভট্টাচার্যকে নামতে হচ্ছে দমকলের ইঞ্জিন নিয়ে। বারবার। অন্তত পঞ্চাশবার।
বাগেশ্বরের বাগাড়ম্বর আমিষ-নিরামিষ বিতর্কের পাশাপাশি পুনর্জন্ম দিয়ে ফেলেছে আর এক পুরোনো বিতর্কের। বাঙালি বনাম অবাঙালি। হোক বিজেপি রাজ্য, বাংলা কিন্তু এখনও উত্তরপ্রদেশ-বিহার-মধ্যপ্রদেশের সংস্কৃতিকে নিজের করে ভাবতে শেখেনি।