হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী

শিশির রায়   এখন তো কলকাতা শহরের বুকে ভারতমাতার মন্দিরই আছে। চতুর্ভুজা ভারতপ্রতিমা— একটি হাত অভয়মুদ্রায়, বাকি তিন হাতে ত্রিশূল, শঙ্খ ও ভারতের পতাকা। বড় রাস্তার উপরেই মন্দিরের প্রবেশপথ: বাইরে....

শিশির রায়

 

এখন তো কলকাতা শহরের বুকে ভারতমাতার মন্দিরই আছে। চতুর্ভুজা ভারতপ্রতিমা— একটি হাত অভয়মুদ্রায়, বাকি তিন হাতে ত্রিশূল, শঙ্খ ও ভারতের পতাকা। বড় রাস্তার উপরেই মন্দিরের প্রবেশপথ: বাইরে গতিময় শহর চলে যেতে যেতে কৌতূহলী উঁকি দিয়ে যায়। ২৩ কি ২৬ জানুয়ারিতে, ১৫ অগস্টে তো অবশ্যই— জমে ভিড়ও। দক্ষিণ কলকাতার সে-মন্দিরের খোঁজ কি উত্তরবাসী জানেন? একুশ শতকের কলকাতা বৃহদ্বপু, কিন্তু তথ্যবিস্ফারের এই যুগে কল্পনাতীত সাধ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক তথ্য অনেকের ঘটে নেই।

ইতিহাসে আগ্রহ আছে যাঁদের, তাঁরা কিন্তু বলবেন, বিশ শতকের গোড়ার কয়েকটা দশকে এ-জিনিস ভাবাও যেত না। সেই শতাব্দীর গোড়ার দশকটাতেই বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে যে স্বদেশিয়ানার জোয়ার এসেছিল, তাতে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজ়মের পালে হাওয়া জুগিয়েছিল সাংস্কৃতিক, বিশেষত দৃশ্যকলা-সংস্কৃতির অ্যাক্টিভিজ়মও। সেই অ্যাক্টিভিজ়মে বাংলা-মা, ভারতমায়ের রূপ পাচ্ছিলেন দ্রুত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’র ‘ভারতমাতা’য় উত্তরণে সময় লাগেনি— তা সে ছবিতেই হোক কি ধারণায়। ভারতের মানচিত্রটা চোখ বুজে ভাবলেই বোঝা যায়, দণ্ডায়মান এক দেবীপ্রতিমার রূপকল্প তার উপরে প্রতিস্থাপন করা চলে সহজেই। কাশ্মীরের দিকটা দেবীর মস্তক, দেশের দক্ষিণবিন্দু অবধি তাঁর পদযুগল, হাতগুলি দু’দিকে পশ্চিমে-পুবে প্রসারিত— এমন ভাবা বা এঁকে ফেলা কঠিন নয়।

স্বদেশি থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন— এই সময়পর্বে বাংলা ও ভারতের তাৎকালিক পাবলিক আর্টে— বিশেষত ক্যালেন্ডার পোস্টার ও ছবিতে ভারতমাতার রূপকল্পের যাত্রাপথ খুব আকর্ষণীয়: শুরুর দিকে অখণ্ড ভারতের মানচিত্রে (এবং জনমনেও) নিজেকে ‘অ্যাডজাস্ট’ করছিলেন ভারতমাতা; এক বার সে-কাজ পোক্ত হতেই দেখা গেল, তৎকালীন রাজনীতির পরিচালকেরা তাতে ভারতমাতার সঙ্গে ‘স্ক্রিন শেয়ার’ করছেন— মহাত্মা গান্ধী জওহরলাল নেহরু বল্লভভাই পটেল, এবং অতি অবশ্যই সুভাষচন্দ্র বসু। পাবলিক আর্টের নিয়মেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত এই সব দৃশ্যবস্তু, উত্তাল সময়ের ডানায় ভর করে আরওই, এবং নেতাদের চরিত্রবৈশিষ্ট্য ও আন্দোলন-প্রকরণ বুঝে শিল্পীরা যোগ করতেন সূক্ষ্ম এবং স্থূল নানান উপাদান। ভারতমাতা তাই গান্ধীকে চরকা (বর) দেন, সুভাষচন্দ্রের হাতে তুলে দেন অবধারিত অসি।

ভারতমাতার রূপকল্প কার আদলে গড়ে উঠল? অবশ্যই দুর্গার আদলে। বা, দুর্গাই হয়ে উঠলেন স্বদেশি থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, ভারতমাতা। এই রূপকল্পটি তৈরি ছিলই এক রকম: বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী বা সীতারাম আমাদের কারও কারও পড়া। আনন্দমঠ-এ মহেন্দ্রকে ব্রহ্মচারী দেখিয়েছিলেন দেশের অতীত বর্তমান ভবিষ্য, যথাক্রমে জগদ্ধাত্রী কালী ও দুর্গাপ্রতিমায়। দশভুজা দুর্গা কবির (লেখক>কবি>দ্রষ্টা) চোখে ভবিষ্যতের শত্রুজয়ী ঐশ্বর্যময়ী ভারতের রূপক। দেবী দুর্গারই পাওয়ার কথা এই ফার্স্ট প্রাইজ়: দশ হাত, দশ প্রহরণ মিলিয়ে তাঁর সামগ্রিক অবয়বে পূর্ণবৃত্তের যে জ্যামিতিক আকার, তা আর কোন দেবতারই বা আছে? উপরন্তু তাঁর আছে সিংহের মতো বাহন, এবং পদতলে পরাভূত অসুর। সব মিলিয়ে সেই সময়, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে দুর্গা ও ভারতমাতার প্রতিস্থাপন ও বিনিময়-যোগ্যতা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

দেশনেতাদের জীবনে আর দর্শনেও দেখি আমরা দুর্গার বিচিত্র, বহুস্তরী উপস্থিতি। আলিপুর বোমা মামলা নিয়ে কত কথা হয়, আলাদা করে চর্চা হয় না সেই মামলারই নথি হিসেবে আদালতে ওঠা (পরবর্তী কালে রাওলাট রিপোর্টেও উদ্ধৃত) প্রচারপত্র, অরবিন্দ ঘোষের ‘ভবানী মন্দির’ নিয়ে। লিখেছিলেন তিনি, কিন্তু ভাবনার কৃতিত্ব বারীন্দ্র ঘোষের, বলেছিলেন অরবিন্দ। বারীন্দ্র নাকি মধ্য ভারতে মন্দির প্রতিষ্ঠার জায়গা দেখতেও যান। লেখার শুরু হচ্ছে ‘ওঁ নমশ্চণ্ডিকায়ৈঃ’ দিয়ে। বলা হচ্ছে, ভবানী মন্দির তৈরি হবে, এই পবিত্র কাজে মায়ের সব সন্তানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ভবানী কে? অসীম শক্তিরূপা তিনি। “উই ইন ইন্ডিয়া ফেল ইন অল থিংস ফর ওয়ান্ট অব শক্তি।” ‘নেশন’ হল ‘দ্য শক্তি অব ইটস মিলিয়নস’, শক্তিমান হতে গেলে শক্তির আরাধনা করতে হবে। দরকার ভক্তি (মন্দির), কর্ম (এক দল কর্মযোগী; কেউ যদি চান সন্ন্যাস নিতে পারেন, বাকিরা কার্য সমাধা হলে গৃহস্থাশ্রমে ফিরবেন), কিন্তু সবার মূলমন্ত্র হবে ত্যাগ।

বঙ্কিমচন্দ্র ও বিশেষত স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাব এখানে স্পষ্ট। পরাধীনতা ও শত্রুর অত্যাচারে মনে গ্লানি আসছে, তা ঝেড়ে নিজেদের ও অন্যকেও উদ্দীপ্ত করতে চাই শক্তির পূজা। দুর্গা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী প্রতীক (‘লেইটমোটিফ’)। মহিষাসুর দেবতাদের উত্ত্যক্ত ও স্বর্গচ্যুত করে দাপাচ্ছিল (শত্রুর শাসন ও শোষণ), দুর্গা তাঁকে নিধন করে শৃঙ্খলা, সাম্য ও সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন— ব্রিটিশশাসিত ভারতের দুর্দশা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন বোঝাতে এর চেয়ে সহজ রূপক আর কী-ই বা।

দুর্গা তাই ভারতমাতা রূপে একটা ধারণা বা দর্শন হয়ে উঠলেন। আবার, সাধারণ মানুষ তো শুধু দর্শনের বিমূর্ততা বুঝবে না, তাদের চাই একটা মূর্ত রূপ, তাই দুর্গাপূজাও হয়ে উঠল শাসক-বিরোধিতার, কিংবা স্বশক্তি-প্রদর্শনের একটা উপায়। সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর শতবর্ষ পূর্ণ হল এ বছর। ওঁদের ওয়েবসাইটে দেখা যাবে একটা ছবি— ১৯২৮ সালের পুজোয় অষ্টমীর দিন আয়োজিত ‘অন্নকূট’-এর পঙ্‌ক্তিভোজনে খাচ্ছেন সুভাষচন্দ্র বসু। আনন্দবাজার পত্রিকা-য় সেই সময়ে প্রকাশিত খবরে লেখা আছে, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, বাগবাজারের দুর্গাপূজায় ওঁর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষণার কথা।

আর জেলে থাকাকালীন দু’বার দুই জায়গায় সুভাষচন্দ্রের দুর্গাপূজা তো ইতিহাস হয়ে আছে। এর মধ্যে ১৯২৫-এ বর্মার মান্দালয় জেলের প্রসঙ্গ বহুচর্চিত, তুলনায় ১৯৪০-এ কলকাতায় প্রেসিডেন্সি জেলে দুর্গাপূজার কথা ওঠে কম। সহ-বন্দি নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী পরে লিখেছেন তার বয়ান, জেল-কর্তার কাছে নেতাজির দাবি— বাইরে থেকে প্রতিমা, পুজোর উপকরণ, পুরোহিত, তন্ত্রধারক আনাতে হবে; কেউ পুজো বা ভোগের জন্য কিছু পাঠালে তা নেওয়ার অনুমতি দিতে হবে। সব বন্দির পুজোয় অংশগ্রহণের অনুমতি চাই; বিশেষত প্রসাদ পাওয়ার সময় সবাইকে (রাজনৈতিক ও অন্য বন্দি মিলিয়ে প্রায় দু’হাজার!) এক সঙ্গে থাকতে দিতে হবে। যাদের ইচ্ছা হবে অঞ্জলি দেবে, আরতি দেখবে, প্রসাদ পাবে। টাকাকড়িই সমস্যা। ভাইঝি ইলার কাছে রাখা শ’তিনেক টাকা কাজে লাগানো হবে ঠিক হল, আর কলকাতার নামকরা কয়েকটি মিষ্টির দোকানে আবেদন করা হল, “অন্য কিছু নয়, কিছু বোঁদে। অন্তত হাত ভরে যদি সবাইকে একদিনও বোঁদে দেয়া যায়, ওতেই ওরা খুশিতে উপচে পড়বে।”

রাজনীতিতে দেশনেতাদের বলভরসা জোগাচ্ছেন দুর্গা, কবি ও শিল্পীর কালি-তুলিতেও হচ্ছেন আবির্ভূতা। ১০৪ বছর আগে, ১৯২২-এ এক অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকার দুর্গাপূজা-সংখ্যায় এক ‘মুসলমান’ কবি লিখলেন কবিতা, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। অসহযোগ আন্দোলন তুলে নিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, কংগ্রেসে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে, অচিরেই দেশবন্ধু গড়বেন নতুন দল, এ দিকে ব্রিটিশের দমন-পীড়ন প্রবল— এই আবহে উঠে এল ধূমকেতু-র পাতায় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, “আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।/ দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?/… অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা;/ আয় পাষাণী, এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা!” বোঝা যায়, কে এই দেবী।

বোমা মামলায় নিজে থেকে তাঁর হয়ে লড়তে কোর্টে আসায় চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পর্কে অরবিন্দ ঘোষ বলেছিলেন, তাঁকে রক্ষা করতে স্বয়ং নারায়ণ এসেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখায় আছে, কয়েক বছর পর দেশবন্ধু একটা বাংলা পত্রিকা বার করলেন, নাম দিলেন নারায়ণ। দুর্গাপূজার সময় তাতে হরপ্রসাদকে লেখা দিতে বলেছিলেন তিনি, দুর্গোৎসব নিয়েই। হরপ্রসাদ লিখেছিলেন, দুর্গোৎসব হল ‘বর্ষার পর প্রকৃতির সতেজ ও সহাস্য ভাবের পূজা’: ‘ওয়রশিপ অব দ্য স্পিরিট অব ভেজিটেশন’— “ইহাতে অনেক ভক্ত আমার উপর চটিয়া ছিলেন।” আর এক বছর এমন একটা লেখা লিখলেন, সবাই খুব আশীর্বাদ করলেন।

বাকি রইলেন, ‘ব্রাহ্ম’ রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহ থেকে চিঠিতে ইন্দিরাদেবীকে একদা লিখেছিলেন তিনি, এত লোক যাকে কেন্দ্র করে আনন্দে ভক্তিতে প্লাবিত হচ্ছে, তাকে স্রেফ মাটির পুতুল বলে দেখলে ‘আমারই ভাবের অভাব প্রকাশ পায়’। রবীন্দ্রনাথের আবার ভাবের অভাব! স্বদেশি আন্দোলনের সময় বাঁধা গানে ডান হাতে খড়্গ জ্বলে ওঠা, বাঁ হাতে শঙ্কা হরণ করা যে ‘মা’-এর ভাবরূপ এঁকে দেন তিনি জনগণমনে, তার পরে আর কথা চলে?