মৃণালকান্তি দাস
গাজায় যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁর ২৫ বছরের ছেলে। যুদ্ধে নিহত হয়েছেন দুই ভাইপোও। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ছেলের মৃত্যুর পর এক প্রাক্তন সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত শোক ক্রমশ মিশে গিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে। গাদি আইজেনকট শপথ করেছিলেন, ছেলের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবেন না। সেই শপথের প্রতিধ্বনি নিয়েই আজ তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লড়াইয়ে বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘ইদিয়োথ আহরোনথ’ পত্রিকায় আইজেনকট লিখেছিলেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে ও তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, তা বৃথা যেতে দেব না।’ তাঁর এই বক্তব্যে শুধু এক বাবার শোক নয়, ধরা পড়ে যুদ্ধের লক্ষ্য ও নেতৃত্ব নিয়ে গভীর রাজনৈতিক প্রশ্নও।
আইজেনকটের অভিযোগ, নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধের কোনও সুস্পষ্ট সমাপ্তির পথ দেখাতে পারেননি। বরং রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে ইজরায়েলি অপহৃতদের জীবন বিপন্ন করেছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকার প্রতিবাদে ২০২৪ সালের জুনে জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। একসময় নেতানিয়াহুর অধীনেই ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই সেনা এখন তাঁরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন।
কিন্তু আইজেনকটের উত্থানের গল্প শুধু যুদ্ধ, শোক কিংবা রাজনৈতিক বিদ্রোহের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইজরায়েলের জাতিগত বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস, ক্ষমতার অভিজাত বলয়ের বাইরে থেকে উঠে আসার লড়াই এবং এমন এক নির্বাচনের হিসাব, যেখানে নেতানিয়াহুকে হারানোর আকাঙ্ক্ষাই বিরোধীদের একজোট করার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে। আইজেনকটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়তো কোনও চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি সহজ পরিচয়—তিনি নেতানিয়াহু নন। কিন্তু এই পরিচয়ই কি তাঁকে ইজরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী করে তুলতে পারবে?
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকটের জন্ম মরক্কো থেকে আসা এক অভিবাসী পরিবারে। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাতে—ইজরায়েলের এমন সব অঞ্চলে, যা দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র থেকে দূরে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠা জেরুজালেমের অভিজাত পরিমণ্ডলে, ক্ষমতাশালী মহলের কাছাকাছি। এই দুই জীবনের ব্যবধানের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ইজরায়েলের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। আইজেনকট মিজরাহি-মরোক্কান বংশোদ্ভূত। ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। মিজরাহি ভোটারদের একটি বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সমর্থন করে এসেছেন।
আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয় নিয়ে খুব বেশি প্রচার করেন না। তবু বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, তাঁর জনপ্রিয়তার পিছনে এই পরিচয়ের ভূমিকা রয়েছে। যে জনগোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি, সেই জনগোষ্ঠীর একাংশের কাছেই আইজেনকট হয়ে উঠতে পারেন বিকল্পের মুখ। এর সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক সম্ভাবনাও। ইজরায়েলে এখনও পর্যন্ত কোনও মিজরাহি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হননি। আইজেনকট সেই পদে পৌঁছলে ইতিহাস বদলাবে। তবে পরিচয়ের রাজনীতি তাঁকে সুযোগ দিলেও, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছতে হলে তাঁকে ভোটের অঙ্ক মেলাতে হবে এবং বিভক্ত বিরোধী শিবিরকে একজোট করতে হবে।
১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগ দিয়েছিলেন আইজেনকট। চার দশকের সামরিক জীবনে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৫ সালে আইডিএফের চিফ অব স্টাফ হন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেই পদে ছিলেন তিনি। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেতানিয়াহু।
২০২২ সালে আরেক প্রাক্তন সেনাপ্রধান বেনি গ্যান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে যোগ দেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইজরায়েলে হামলার পর দু’জনেই নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে তাঁদের মতপার্থক্য। গাজায় সামরিক অভিযানের লক্ষ্য কী, যুদ্ধের অবসান কীভাবে ঘটবে এবং অপহৃতদের মুক্তির জন্য কী কৌশল নেওয়া হবে— এসব প্রশ্নে সরকারের পরিকল্পনার অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভা ছাড়েন আইজেনকট ও গ্যান্টজ। তারপর থেকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের মূল বার্তা—‘একজন যোদ্ধা, একজন নেতা, একজন ঐক্যবদ্ধকারী’। তাঁর দলের নাম ইয়াশার, যার হিব্রু অর্থ ‘সোজা’। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রশাসনিক সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য তাঁর প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এমন তদন্তের বিরোধিতা করে আসছেন। এ ছাড়া সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ অথবা জাতীয় পরিষেবার পক্ষেও সওয়াল করেছেন আইজেনকট। নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের কট্টরপন্থী অর্থোডক্স শরিকেরা অবশ্য এই সম্প্রদায়ের জন্য সামরিক ও জাতীয় পরিষেবায় ব্যাপক ছাড় বজায় রাখতে চান।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে আইজেনকটকে নেতানিয়াহুর উদারপন্থী বিকল্প ভাবার কারণ নেই। গাজা, লেবানন ও ইরানে ইজরায়েলি সামরিক অভিযানকে তিনি সমর্থন করেন। আইডিএফে তিনি ‘দাহিয়েহ মতবাদ’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। এই মতবাদে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ এবং অসামরিক পরিকাঠামোর উপর আঘাত হানার কৌশল গুরুত্ব পায়। ইরানের ক্ষেত্রেও দু’জনের লক্ষ্য প্রায় একই—তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে দুর্বল করা। পার্থক্যটা কৌশলে। আইজেনকটের মতে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা।
গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্য আরও প্রকট। আইজেনকটের প্রতিশ্রুতি, ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানো। এ জন্য তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা তাঁর ভাষায়, ‘সৃজনশীল’ সামরিক অভিযানের কথা বলেছেন। কিন্তু হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর পর গাজার প্রশাসন চালাবে কে, প্যালেস্তাইনের মানুষের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও জটিল।
ক্ষমতা বদলালেই কি বদলাবে ইজরায়েল?
আসলে আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচ ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারেন। তাতে নতুন সরকার তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী হওয়ার এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণসহ আঞ্চলিক কূটনীতিতে অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহুকে হারানো আর স্থিতিশীল সরকার চালানো এক কথা নয়। বিরোধী শিবিরের দলগুলির মধ্যে নিরাপত্তা, প্যালেস্তাইন, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে সরকার গঠন করাই হবে আইজেনকটের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তাঁর রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়েছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত শোক, জাতিগত পরিচয় এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভকে এক সুতোয় বাঁধার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর নিজের নিরাপত্তা-দর্শনও কঠোর; ফলে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেই গাজা বা প্যালেস্তাইন নিয়ে ইজরায়েলের নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
শেষ পর্যন্ত আইজেনকটের লড়াই শুধু নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নয়। এটি এমন এক রাজনৈতিক পরীক্ষাও, যেখানে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে—যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা একটি বিভক্ত দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতায় রূপান্তর করা সম্ভব।
ছেলের কবরের পাশে করা শপথ তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই শপথের রাজনৈতিক পরিণতি কী হবে, তা নির্ধারণ করবে নির্বাচনের অঙ্ক, জোটের দর-কষাকষি এবং ইজরায়েলের ভোটারদের সিদ্ধান্ত। নেতানিয়াহুকে সরানোই তাঁর প্রথম লক্ষ্য। তার পরের প্রশ্ন আরও কঠিন— তিনি কি সত্যিই ভিন্ন কোনও পথ দেখাতে পারবেন?