কানাডায় গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির ভাষা ও ঐতিহ্য উৎসব অনুষ্ঠিত

ফারজানা নাজ শম্পা   ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মৌলিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক। মানুষের চিন্তা, চেতনা এবং স্বকীয়তা ভাষার মধ্য দিয়েই....

ফারজানা নাজ শম্পা

 

ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মৌলিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক। মানুষের চিন্তা, চেতনা এবং স্বকীয়তা ভাষার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়। এই আদর্শে মাতৃভাষা ও ভাষার গুরুত্ব সংরক্ষণের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন কানাডার ভাঙ্কুভারের ‘গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটি’ (GMLLS)। এই সংগঠনের উদ্যোগে গত ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নিউ ওয়েস্টমিনস্টারের কুইন্সবোরো কমিউনিটি সেন্টারের মুক্তমঞ্চে বার্ষিক ‘মাতৃভাষা উৎসব ২০২৬’ সফলভাবে উদযাপিত হয়েছে।

Global Mother Language Lovers Society (GMLLS) ভ্যাঙ্কুভারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. আব্দুল মতিন। ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বরত মাইকেল দীপায়ন মিত্র ও জনাব হাসান মামুন এবং জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বরত জনাব শফিউল আজম। প্রেসিডেন্ট ড. আব্দুল মতিন এই সংগঠনের সাথে বিভিন্ন পদে প্রায় গত ১৪ বছর ধরে নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

চলতি বছরে তাঁদের এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—”ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই আমাদের পরিচয়।” বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিয়ে আয়োজিত এই উৎসবে বিশিষ্ট সমাজসেবক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী এবং কানাডার বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

উদ্বোধনী পর্ব কানাডার জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা হয়। এরপর ফার্স্ট নেশনসের (কানাডার আদিবাসী) শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে দেশীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ভাষা শহীদ এবং বিশ্বের যেসব মানুষ মাতৃভাষা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন ও সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের স্মরণে ৩০ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করা হয়।

ফেডারেল সংসদ সদস্য জনাব জেইক সাওয়াটস্কি (Jake Sawatzky) দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও উৎসবের মূল অতিথি হিসেবে একটি বিশেষ বার্তা পাঠান। তিনি মাতৃভাষা সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান ও সাধুবাদ জানান। তার বার্তা পাঠ করে শোনান শফিউল আজম l

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসরত বিশিষ্ট বাঙালি লেখক ও কবিরা এই আয়োজনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী ফারজানা নাজ শম্পা তাঁর অনূদিত বই থেকে কানাডিয়ান কবি জর্জ এলিয়টের ইংরেজি কবিতার এবং বাংলা আবৃত্তি উপস্থাপন করেন । তিনি বিভিন্ন ভাষার সৌন্দর্য কে অলংকারের সাথে তুলনা এবং কানাডার সাহিত্য অনুবাদের প্রয়োজনীতা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৭০টিরও বেশি ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

এই সংগঠনের দীর্ঘদিনের সহযোগী কবি শাহানা আক্তার মহুয়া তাঁর বক্তব্যে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কীভাবে আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয় গঠন করে তা তুলে ধরেন।

জিএমএলএলএস-এর সভাপতি ড. আবদুল মতিন তাঁর বক্তব্যে মনে করিয়ে দেন যে মাতৃভাষা রক্ষার লড়াই শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই। অভিভাবকরা যেন প্রতিদিনের পারিবারিক জীবনে সন্তানদের সাথে মাতৃভাষায় কথা বলেন, সেই আহ্বান জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা হলো শিকড় ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের মূল সেতু; এটি হারিয়ে গেলে নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এছাড়াও, ড. মতিন ইউনেস্কোতে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাবক প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের অনন্য অবদানের কথা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তাঁদের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টাতেই ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

বহুমুখী সংস্কৃতি ও পারস্পরিক মেলবন্ধনের আবহে এই উৎসবটির সফল আয়োজনের পেছনে ছিল GMLLS নির্বাহী কমিটির নিরলস পরিশ্রম ও চমৎকার দলগত প্রচেষ্টা।

এই বর্ণিল আয়োজনে বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জানানো হয় জনাব হাসান মামুন, জনাব মাইকেল মিত্র, জনাব শফিউল আজমসহ নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যকে যাঁদের পরিকল্পনা ও সুসমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি সাবলীলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় কানাডার Multiculturalism বা বহুমাত্রিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে, যা এক কথায় ছিল চিত্তাকর্ষক।

বাংলাদেশ, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার শিল্পীদের তাঁদের স্বকীয় আবহে বর্ণিল নৃত্য পরিবেশনা সার্বিক অনুষ্ঠানে উচ্চতর মাত্রা যোগ করে তা দর্শকদের মুগ্ধ করে। সেদিনের সংস্কৃতির বৈচিত্রময় এই অপূর্ব মেলবন্ধন প্রমাণ করে কীভাবে ভাষা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

সভাপতি ড. আব্দুল মতিন ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন আনর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহ আহ্বায়ক সর্বজন শ্রদ্ধেয় আব্দুস সালামের হাতে l

অনুষ্ঠানের সমাপ্তি বক্তব্যে সভাপতি ড. আবদুল মতিন এবং ভাঙ্কুভারে জিভিবিসিএ (GVBCA)-র সভাপতি জনাব এম. এইচ. লিটন, ল্যাডোনা উইকসের (Ladonna Wiks) নেতৃত্বে উপস্থিত ফার্স্ট নেশনস টিম, কারিগরি ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ দল, স্বেচ্ছাসেবী এবং আগত দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

২০২৬ সালের এই মাতৃভাষা উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি বিশেষ মুহূর্ত যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা বহন করে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও অস্তিত্ব।