ব্রিকসে মোদি-জিনপিং বৈঠক: ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’-এর স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে

ড. রতন ভট্টাচার্য   বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণের মধ্যে ব্রিকস এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক জোটের নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেই মঞ্চে ভারতের....

ড. রতন ভট্টাচার্য

 

বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণের মধ্যে ব্রিকস এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক জোটের নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেই মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে সংঘাত, অবিশ্বাস, সীমান্ত উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি রয়েছে এক সময়ের অত্যন্ত আবেগঘন বন্ধুত্বের স্মৃতি—‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’। তাই মোদি-জিনপিং সাক্ষাৎ কেবল বর্তমানের কূটনৈতিক ঘটনা নয়; এটি অতীতের সেই স্লোগানকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

 

‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’—এই চারটি শব্দ এক সময় ভারত-চিন সম্পর্কের এক রোমান্টিক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এশিয়ার দুই প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে সহযোগিতা ও সংহতির যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তারই জনপ্রিয় প্রকাশ ছিল এই স্লোগান। পঞ্চশীল নীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ঐক্যের আবহে ভারত ও চিনকে এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালের যুদ্ধ সেই স্বপ্নে গভীর আঘাত হানে। ‘ভাই ভাই’-এর জায়গায় এসে দাঁড়ায় অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা-উদ্বেগ।

 

আজকের পরিস্থিতি অবশ্য ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দশকের মতো নয়। ভারত ও চিন উভয়েই বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। সীমান্তে মতপার্থক্য এখনও রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে বিপুল বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে পরস্পরের গুরুত্ব। ফলে দুই দেশের নেতৃত্ব যখন একই টেবিলে বসে, তখন তার তাৎপর্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।

 

মোদি-জিনপিং বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংলাপের দরজা খোলা রাখা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনও দুটি বৃহৎ দেশের মধ্যে সব বিষয়ে একমত হওয়া প্রয়োজনীয় নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাই পরিণত কূটনীতির লক্ষণ। ভারত ও চিনের ক্ষেত্রেও সেটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কিংবা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

তবে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’-এর স্মৃতি জাগলেও আজকের ভারত সেই পুরনো আবেগের রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারে না। কারণ ১৯৬২-এর অভিজ্ঞতা ভারতের কৌশলগত চিন্তাকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। আজকের ভারত বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, সীমান্তে শান্তি এবং সমান মর্যাদা। আবেগ নয়, বাস্তববাদই হবে সম্পর্কের ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী মোদির কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল—তিনি একদিকে চিনের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখছেন, অন্যদিকে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানও তুলে ধরছেন। ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছাড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। অর্থাৎ বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো মানেই নিজের নিরাপত্তা-স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়।

 

ব্রিকসের মঞ্চ এই আলোচনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রিকসের পরিসর যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয় জরুরি হয়ে উঠছে। ভারত ও চিন—দুই দেশই এই মঞ্চের প্রধান শক্তি। ফলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্রিকসের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এখানে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চিন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনশক্তি এবং ভারত দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি। দুই দেশের বাজার, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে এই সহযোগিতা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। একতরফা আমদানি বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত নির্ভরতা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, আত্মনির্ভরতা এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের বৈচিত্র্যকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামো দিতে হবে।

 

অন্যদিকে চিনের কাছেও ভারতের গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত শুধু একটি বিশাল বাজার নয়; এটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বৃহৎ ভোক্তা-সমাজ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের অধিকারী। এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত-চিন সম্পর্কের উন্নতি চিনেরও স্বার্থসংশ্লিষ্ট।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বৈঠক কি সত্যিই ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’-এর নতুন যুগের সূচনা করতে পারে? উত্তরটি সহজ নয়। কারণ ইতিহাসের ক্ষত এখনও সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়নি। সীমান্ত সমস্যা, পারস্পরিক কৌশলগত সন্দেহ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে। ফলে একটি বৈঠককে অতিরিক্ত আশাবাদ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না।

 

বরং মোদি-জিনপিং সাক্ষাৎকে দেখা উচিত ‘প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা’-র নতুন বাস্তবতার আলোকে। দুই দেশ একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী, অন্যদিকে একে অপরের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এই দ্বৈত সম্পর্কই আগামী দিনের ভারত-চিন কূটনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ তাই আজ আর নিছক একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ইতিহাসের একটি স্মারক। সেই স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বন্ধুত্বের স্বপ্ন যেমন সম্ভব, তেমনই অতিরিক্ত সরলীকৃত কূটনীতি বিপজ্জনকও হতে পারে। আজকের ভারত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে চায়। বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষার সঙ্গে; সংলাপ থাকবে, কিন্তু সমতার ভিত্তিতে।

 

বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যখন এককেন্দ্রিক ক্ষমতার পরিবর্তে বহুকেন্দ্রিক শক্তির উত্থান স্পষ্ট। এই নতুন বিশ্বে ভারত ও চিনের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের বিষয় নয়। এশিয়ার ভবিষ্যৎ, বিশ্ব অর্থনীতি, উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত। ব্রিকস এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

তাই মোদি-জিনপিং বৈঠকের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বৈঠকের উষ্ণ ছবির উপর নয়, তার পরবর্তী পদক্ষেপের উপর। সীমান্তে শান্তি কতটা সুদৃঢ় হয়, বাণিজ্যিক ভারসাম্য কতটা উন্নত হয়, পারস্পরিক আস্থা কতটা ফিরে আসে এবং বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা কতটা বাড়ে—এই সূচকগুলিই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রকৃত মানদণ্ড।

 

এক সময় ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আজ সেই স্বপ্নকে হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বরং ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে ভারত ও চিন যদি ‘হিন্দি-চিনি সহযোগী’ হয়ে উঠতে পারে, তবে সেটিই হবে আরও বাস্তবসম্মত ও পরিণত সম্পর্কের পরিচয়। মোদি-জিনপিং বৈঠক সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে—কিন্তু দরজার ওপারে পৌঁছতে হলে উভয় দেশকেই হাঁটতে হবে দীর্ঘ পথ। ব্রিকসের মঞ্চে সেই পথচলার প্রথম দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক; এখন অপেক্ষা বাস্তব ফলাফলের।

আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।