উত্তাল ঘোষ
ফ্রি প্যালেস্তাইন। এই দাবি আপনি সমর্থন করেন? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সমর্থন করেন না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে ফ্রি প্যালেস্তাইন লেখা থাকলে তিনি খুব রেগে যান। যারা ভক্ত তারাও খুব লাফান।
ফ্রি প্যালেস্তাইন। স্বাধীন প্যালেস্তাইন চাই। ১৯৪৮ থেকে আজ পর্যন্ত এটাই ভারতের সরকারি অবস্থান। মুখ্যমন্ত্রী ওই অবস্থানের বিরুদ্ধে। যারা দেশের অবস্থানের বিরুদ্ধে তাদেরকেই কি দেশবিরোধী বলা উচিত নয়?
সেরকম একদলকে সঙ্গে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আবার গেলেন যাদবপুর গেরুয়া সম্মান যাত্রায়। বললেন, “যাঁরা দেশের ভিতরে থেকে দেশকে অপমান করছেন, তাঁদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য একবার গীতা পাঠ করতে আসব, আর একবার হনুমান চালিসা পাঠ করতে আসব।” এর আগে গিয়েছিলেন বন্দে মাতরম গাইতে।
*
ইয়ার্কি হচ্ছে? রাজ্যের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একের পর এক নাটক! এক সময় যিনি আরএসএস বিজেপিকে বলতেন ব্রিটিশের দালাল, এখন তিনিই বিজেপি আরএসএসের ঝান্ডা নিয়ে দেশপ্রেমের ভন্ডামি করছেন।
কখনও বন্দে মাতরম, কখনও জাতীয়তাবাদী সম্মেলন, কখনও গেরুয়া সম্মান, কখনও গীতা পাঠ, কখনও হনুমান চালিসা পাঠ। এটা একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাজ হতে পারে? এই করে মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে, তাঁর সরকারকে, রাজ্যকে খেলো করছেন।
তার থেকেও বড় কথা, এতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিরোধী মতকে মুছে ফেলার নেশায় লেখাপড়ার সর্বনাশের ব্যবস্থা হচ্ছে। কোথাকার লেখাপড়া? রাজ্যের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। সেখানে কারা পড়ে? রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার গরীব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা। ওখানে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে রাজনীতি করে না, শুধুই লেখাপড়া করে। কিছু ছেলেমেয়ে রাজনীতি ও লেখাপড়া দুটোই করে। ক্রমাগত আজেবাজে বিষয় নিয়ে অস্থিরতা তৈরি করে রাখা হলে লেখাপড়ার হাল খারাপ হতে বাধ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বনাশ হলে আমাদের পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার অবস্থা ভাল হবে না খারাপ, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।
*
লেখাপড়ার সর্বনাশ হল কিনা তার পরোয়া করেন না মুখ্যমন্ত্রী। তার কাছে প্রথম ও প্রধান কথা রাজনীতি। প্রথম ও প্রধান কথা বিরোধী মত মুছে দাও। গোড়া থেকে উপরে ফেলবেন বলেছেন। তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছে, এরপর অধ্যাপকদের বদলি শুরু হবে। সেই বিল আসছে বিধানসভায়। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, “রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির বন্দোবস্ত করা হবে। যাঁরা দীর্ঘদিন কলকাতা বা অন্য বড় শহরের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধ্যাপনা করেছেন, তাঁদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও পড়াতে যেতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়, তার লেখাপড়া, তার অধ্যাপক, তার গবেষণা…এসব নিয়ে ন্যূনতম ধারণা না থাকলে যা হয়। সব চলবে গায়ের জোরে। তাতে ধসে পড়বে লেখাপড়া।
সম্ভবত এরপরের টার্গেট প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়।
*
গায়ের জোরে বিরোধী মত মুছে দেওয়ার ঝোঁক আজকের রাজনীতিতে নতুন নয়। সেই রাজনীতি যারা করতে চায়, করুক। মমতা জমানায় বিরোধী কাজকর্ম বন্ধের জবরদস্ত চেষ্টা হয়েছিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে সভা করতে হলেই হাইকোর্ট থেকে অনুমতি আনতে ছুটতে হত, এক রাতে সিপিএমের প্রায় বারোশ অফিস ধ্বংস করা হয়েছিল, বিরোধী দলের অনেককে খুন হতে হয়েছে। তাতে কি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারলেন মমতা? কিন্তু রাজ্যের সর্বনাশ হল।
মমতা জমানায় রাজ্যের সব কলেজে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাতে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো উঠে যায়নি। কিন্তু প্রিন্সিপালকে বের করে পেটানো হয়েছে। গণধর্ষণও হয়েছে। কলেজে কলেজে লেখাপড়া উঠে গেছে। আমার আপনার ঘরের ছেলেমেয়েদের মাশুল গুনতে হয়েছে।
মনে হচ্ছে, এখনকার মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী মত মুছে দিতে গিয়ে উচ্চশিক্ষারও দফারফা করে ছাড়বেন। ক্ষতি হবে সেই আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের।
যারা সত্যি দেশ তৈরি করতে চায় তাদের কাছে শিক্ষাকে রক্ষা করা, শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা অগ্রাধিকার। যারা গায়ের জোরে ক্ষমতা ভোগ করতে চান, তাদের সে দায় নেই।
*
যাদের নিয়ে হল গেরুয়া যাত্রা, তারা সারাদিনে হাগু মুতু থুতু ও ঘাম ছাড়া আর কিছু ত্যাগ করেন কি, সন্দেহ আছে। তাদের ত্যাগের মহিমায় চার মাসেই বাংলার আকাশ বাতাস আলোকিত আলোড়িত হতে শুরু করেছে। ত্যাগে আগের জমানাকে অনেক ছাপিয়ে যাওয়ার সব লক্ষণ স্পষ্ট। এদেরই কেউ কেউ ১৯ আগষ্ট মধ্যরাতে ঢুকে পড়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর।
মিছিলে সন্ন্যাসী, এমনকী নাগা সন্ন্যাসীরাও ছিলেন।
উচ্চশিক্ষা আক্রান্ত হলে সাধারণ ভাবে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ সরব হন। কিন্তু এবার সেরকম কিছু চোখে পড়ছে না। হয় যাদবপুরের অধ্যাপক বা ছাত্ররা নাহলে ঝান্ডা নিয়ে কিছু পার্টিকে দেখা গেছে। কিন্তু দরকার শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সরবতা। তবে সে সম্ভাবনা আমি দেখি না। শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ আজকাল নিজেদের ব্যক্তিগত ধান্দার বাইরে বিশেষ ভাবেন না। সমাজের আপদ বিপদ সম্পর্কে তাদের বিশেষ ভাবনা নেই। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ও বাইরের কম বয়সীদের দিকেই আশা নয় তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।