মৃনাল কান্তি দাস
ইজরায়েলি সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা কর্মজীবন থেকে অবসর নিতে জানেন না। কর্মজীবন শেষে তাঁরা কখনও হারিয়ে যান না। বরং, তাঁরা লাগেজ গুছিয়ে হলিউডে চলে যান! কয়েক দশক ধরে তেল আবিব থেকে টিনসেল টাউনে যাওয়ার এই সংযোগপথ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এখন লস অ্যাঞ্জেলেসসহ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ইজরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা রয়েছে, যারা বিশ্বের ধনী, বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তার দায়িত্বে। এমনই দাবি মার্কিন সংবাদসংস্থা দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট-এর।
টেলর সুইফট ও কিম কার্দাশিয়ান থেকে শুরু করে জেনিফার অ্যানিস্টন ও লিওনেল মেসি পর্যন্ত, বিশ্বজুড়ে তারকারা শিন বেত, মোসাদ এবং ইজরায়েলি বিশেষ বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের নিয়ে গঠিত ইজরায়েলি দেহরক্ষী নিয়োগ করছেন। মার্কিন সংবাদসংস্থা মিন্টপ্রেস অনুসন্ধান করে দেখছে, কীভাবে ইজরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী হলিউড ও বিশ্বকে দখল করে নিয়েছে। ফুটবল সুপারস্টার লিওনেল মেসি ২০২০ সালে ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) গুপ্তচরদের পরিচালিত একটি ইজরায়েলি এআই কোম্পানির মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি যেখানেই যান, প্রাক্তন ইজরায়েলি এজেন্টদের একটি নির্বাচিত দল তাঁকে ঘিরে থাকে।
হলিউডের সুপারস্টার ব্র্যাড পিট, জেনিফার অ্যানিস্টন, পপ তারকা ম্যাডোনা, পিঙ্ক কিংবা জেনিফার লোপেজের মতো তারকারাও ইজরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীদের উপর নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবারের সঙ্গে ইজরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পর্ক ২০১৩ সালে জনসমক্ষে আসে। সেই সময় অভিযোগ উঠেছিল, তিনি নাকি তাঁর প্রাক্তন আইডিএফ হ্যান্ডলার ও ইসরাগার্ড সিকিউরিটি সার্ভিসের সিইও মোশে বেনাবুকে মারধর করেছিলেন। আসলে বিশ্বের স্টার, সুপারস্টারদের কাছে ইজরায়েলি দেহরক্ষীদের ব্যাপক চাহিদা। ‘ইজরায়েলি নিরাপত্তা অনেকটা কোকা-কোলার মতো,’ বলেছেন গাইস সিকিউরিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা রোমান তুখ। তবে দেহরক্ষী সস্তা নয়। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার মাত্রার উপর নির্ভর করে, পরিষেবার জন্য প্রতি ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৫০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হয়।
আইডিএফ-এর প্রাক্তন অফিসার এবং ইজরায়েলি সিক্রেট সার্ভিসের অভিজ্ঞ সদস্য মোশে আলোন ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা দলের প্রধান হিসেবে আমেরিকা যান। তিনি আর আমেরিকা ছেড়ে চলে যাননি, পরের বছরই প্রফেশনাল সিকিউরিটি কনসালট্যান্টস (পিএসসি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং হলিউডের তারকাদের সুরক্ষার জন্য বহু প্রাক্তন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। বর্তমানে, পিএসসি ৪০টিরও বেশি রাজ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং দেশজুড়ে ৪ হাজারেরও বেশি কর্মী নিয়োগ করেছে। অ্যালন নিজে এলিজাবেথ টেলর, মাইকেল কেইন, আরমান্ড হ্যামার ও গোল্ডি হনের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু এমন গুপ্তচর সংস্থার এজেন্টদের হাতে তারকাদের জীবন এবং সবচেয়ে গোপনীয় তথ্য সঁপে দেওয়া কতটা নিরাপদ, যাদের বিদেশের মাটিতে অনুপ্রবেশ, নজরদারি এবং ব্ল্যাকমেল করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে? মার্কিন সংবাদসংস্থা মিন্টপ্রেস লিখছে, অনেক দেহরক্ষী ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী বা জাতীয় নিরাপত্তা রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ইউনিটগুলি থেকে আসে, যারা গাজা কিংবা অন্য কোথাও গুরুতর যুদ্ধাপরাধ চালিয়েছে। তবুও আমেরিকায় এই আনুগত্যকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ হিসেবে দেখা হয় না। বরং সেটা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়।
নিক জোনাস ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার দেহরক্ষী সেফ সিকিউরিটির পরিচালক কফির গোল্ডিন। আইডিএফ-এর অভিজাত ইউনিট গিভাতি ব্রিগেডের সদস্য হিসেবে গোল্ডিন তাঁর অতীত নিয়ে আজও গর্ব করেন। গিভাতি ব্রিগেড বেসামরিক প্যালেস্তিনীয়দের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং আগুন লাগিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচিত। গিভাতি ব্রিগেডের কমান্ডার আব্রাহাম জেরিভিভ মনে করেন, ‘যেখানেই আমাদের সেনারা পা রাখে, সেই জায়গাটি পোড়া মাটিতে পরিণত হয়।’
হলিউডের তারকাদের দেহরক্ষী হওয়ার আগে, লিও রাজ আইডিএফ-এর কুখ্যাত দুভদেভান ইউনিটের সদস্য ছিলেন। দুভদেভান ইউনিট ছিল গুপ্তচরদের একটি অভিজাত দল, যারা আরব সম্প্রদায়গুলির মধ্যে মিশে যেত। ছদ্মবেশে গোপনে তাদের উপর নজরদারি করত। কর্মজীবন শেষে লিও আমেরিকা চলে যান এবং আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ও মারিয়া শ্রাইভারের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হন। পরবর্তীতে তিনি ‘ফাউদা’ নামে একটি টিভি সিরিজ তৈরি করেন। যেখানে দুভদেভান কর্মীদের জীবন ও কাজকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়।
‘সন্ত্রাসবাদ দমনে ইজরায়েল বিশ্বজুড়ে সফল, তাই বিদেশেও জনপ্রিয়। দুভদেভান ইউনিটের সাফল্য মানুষ ‘ফাউদা’-র কারণে জানতে পারে। মানুষ ফাউদা-র মতো দেহরক্ষী চায়। এটা দারুণ বিপণন কৌশল।’ দাবি ইজরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন সদস্য ইয়েহিয়েল সলোমনের। এই ইয়েহিয়েলের কোম্পানি বিএইচএস সিকিউরিটি হেলেন মিরেন, মাইকেল ডগলাস এবং ক্যাথরিন জেটা-জোন্সের মতো তারকাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে।
দুভদেভানের আরেক সদস্য অ্যারন কোহেন। কানাডায় জন্ম হলেও কোহেন ১৭ বছর বয়সে দুভদেভানে যোগ দেন। তিন বছর কাজ করেন। যেখানে তিনি আরবি শেখেন এবং আরব সম্প্রদায়গুলিতে অনুপ্রবেশের ২০০টিরও বেশি মিশনে অংশ নেন। এক সময় তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান এবং আইএমএস সিকিউরি
টি কনসালট্যান্টস প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটনি স্পিয়ার্স, কেটি পেরি ও ব্র্যাড পিট-সহ বহু তারকার নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তাঁরই কাধে। ২০১৬ সালে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর, কানিয়ে ওয়েস্ট এবং তাঁর তৎকালীন স্ত্রী কিম কার্দাশিয়ানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব কোহেনকে দেওয়া হয়েছিল। ওয়েস্টের রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ বিবেচনা করলে এটা আশ্চর্যজনক, জেনেশুনে তিনি এক প্রাক্তন ইজরায়েলি গুপ্তচরকে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করার জন্য অর্থ দিয়েছিলেন এবং তাঁর হাতে নিজের জীবন সঁপে দিয়েছিলেন।

‘দুভদেভান’ ইজরায়েলের একটি অভিজাত গুপ্তচর বাহিনী, যাদের কাজ বছরের পর বছর ধরে শত্রু অঞ্চলে গভীর ছদ্মবেশে থাকা। এই গোটা সময়টা জুড়ে, তারা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে, যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ, ব্ল্যাকমেল, এমনকি হত্যা করা যায়। কোনো সেলিব্রিটি কেন এমন একজন ব্যক্তিকে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির জন্য পরিচিত একটি দেশের একজন বিদেশী নাগরিককে তাঁর কাছাকাছি রাখতে চাইবে! এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি।
কোহেন তাঁর নিরাপত্তা সংস্থার নাম রেখেছিলেন ‘চেরিস’। যা হিব্রু শব্দ ‘দুভদেভান’-এর ইংরেজি অনুবাদ। এই প্রাক্তন ইজরায়েলি কমান্ডোরা কার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন? রাষ্ট্র নাকি কোনো তারকার প্রতি। ২০২৩ সালে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে আসে, যখন ৭ অক্টোবর হামাস ইজরায়েলে হামলার পর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মী তাদের আমেরিকান চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের ইউনিটে পুনরায় যোগ দেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য টেইলর সুইফটের দেহরক্ষী, যিনি আইডিএফ ইউনিটে পুনরায় যোগ দেন। পরে ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইজরায়েল হায়োম’-কে বলেন, ‘আমেরিকায় আমার জীবনটা বেশ ভালোই। স্বপ্নের চাকরি। চমৎকার বন্ধু এবং একটি আরামদায়ক বাড়িও আছে।
আমার এখানে আসার কোনো প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু পরিবারগুলিকে তাদের বাড়িতে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, আর আমি তা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে পারিনি…।’ আরেকটি উদাহরণ ওদেদ ক্রাশিনস্কি, যিনি অ্যাডভান্সড সিকিউরিটি কনসেপ্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং নিকোল কিডম্যানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। ক্রাশিনস্কি এর আগে বহু বছর ধরে আইডিএফ-এর সিক্রেট সার্ভিসের একটি নামহীন অপারেশন ইউনিটে অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালে, তিনি ইজরায়েলের হয়ে লড়াই করার জন্য সবকিছু ছেড়ে দেন। বলেন, ‘আমি আমার ইউনিটকে সাহায্য করতে এখানে এসেছি।’
হলিউড তারকারা যেসব ব্যক্তি ও কোম্পানির উপর তাঁদের জীবন এবং সবচেয়ে গোপনীয় তথ্য সঁপে দেন, তারা রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং রাজপরিবারের সদস্যসহ হাজার হাজার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ম্যালওয়্যার ও স্পাইওয়্যার তৈরি এবং ছড়ানোর জন্য কুখ্যাত। আইডিএফ-এর অভিজাত গোষ্ঠী ‘ইউনিট ৮২০০’-এর প্রাক্তন এজেন্টরা ‘ পেগাসাস’ নামে একটি সফটওয়্যার চালু করেছিল, যা রাষ্ট্রপ্রধানদের ডিভাইসে আক্রমণ করে ইজরায়েলি সরকারকে তাদের শত্রু ও মিত্র উভয়ের কার্যকলাপ সম্পর্কে গভীর তথ্য সরবরাহ করে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কিংবা ইরাকের প্রেসিডেন্ট বারহাম সালিহ।
বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী সরকারগুলি তাদের শত্রুদের দমন করতে পেগাসাস ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব সরকার ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং পরে হাড় কাটার করাত দিয়ে তাঁর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে। আইডিএফের গুপ্তচররা প্যালেস্তিনীয় আরব জনগোষ্ঠীর উপরও নজরদারি করে, ব্ল্যাকমেল ও তোলাবাজির উদ্দেশ্যে তাদের ফোনের মেসেজ পড়ে। তাদের ফোনে আড়ি পাতে। তবে, হলিউড নিজেই ইজরায়েলের সমর্থনের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হয়ে উঠেছে। উইকিলিকস প্রকাশিত ফাঁস হওয়া ইমেলের উপর ভিত্তি করে মিন্টপ্রেস নিউজের একটি তদন্তে দেখা গিয়েছে, শীর্ষ চলচ্চিত্র প্রযোজকরা আমেরিকায় প্রচারের সর্বোত্তম উপায় এবং চলচ্চিত্র শিল্পের মধ্যে প্যালেস্তিনীয়পন্থী কণ্ঠস্বরকে দমন করার বিষয়ে ইজরায়েলি সরকার ও সামরিক অফিসারদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন।
ফলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, হলিউডের অনেকেই নিরাপত্তার জন্য প্রাক্তন ইজরায়েলি গুপ্তচরদের নিয়োগ করায় তেমন কোনো সমস্যা দেখেন না। তবে, সম্ভবত আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হল, আমেরিকা বিপুল সংখ্যক প্রাক্তন বিদেশি গুপ্তচরকে তার নিজের ভূখণ্ডে কাজকর্ম পরিচালনার অনুমতি দেয়। যদি এটি অন্য কোনো দেশ হতো, তবে নিঃসন্দেহে বিশাল নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে শোরগোল উঠত। হয়তো সোচ্চার হতো ওয়াশিংটনও…
আসলে সবই ডিপস্টেটের খেলা! তাই মিন্টপ্রেস নিউজ বারবার প্রশ্ন তুলেছে, টেইলর সুইফট, কিম কার্দাশিয়ান কিংবা মেসির মতো সুপারস্টার নিজেদের সম্পর্কে সচেতন তো?