নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তরুণীদের ভাবনা

নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।পত্রিকার পাতা খোললেই দেখা মিলে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ সমীকরণ। প্রতিবাদ করলেও মিলে না পর্যাপ্ত সুফল। নারীর নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দায়বদ্ধতা। নারীরা....

নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।পত্রিকার পাতা খোললেই দেখা মিলে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ সমীকরণ। প্রতিবাদ করলেও মিলে না পর্যাপ্ত সুফল। নারীর নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দায়বদ্ধতা।

নারীরা কতটুকু পিছিয়ে আছে, কতটুকু নিরাপত্তাহীন এসব নিয়ে তরুণরা তাদের বিশেষ মতামতগুলো পেশ করেছেন। তাদের মতামতগুলো তুলে ধরেছেন সেইভ আওয়ার উইমেন বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ডিভিশন মিডিয়া উইং এর সদস্য মুহিবুল হাসান রাফি। নারীদের কণ্ঠের দৃঢ়তা কেমন হওয়া উচিত! আমি মনে করি নারীদের কণ্ঠের দৃঢ়তা মানে কেবল উচ্চস্বরে কথা বলা নয়, বরং নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করা।

দীর্ঘদিন ধরে সমাজে নারীর কণ্ঠ এক জায়গায় আঁটকে ছিল, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ নারীরা নিজের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়ে আরো সচেতন হচ্ছেন। একজন নারীর কণ্ঠ তখনই দৃঢ় হয়, যখন তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পান না, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে আপোষ করেন না এবং নিজের ও অন্য নারীর অধিকার আদায়ের দীপ্ত কন্ঠ তুলতে পারেন।

দৃঢ় কণ্ঠ সমাজে সচেতনতা তৈরি করে, অনুপ্রেরণা জাগায় এবং ন্যায়ের পক্ষে পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। একজন নারী যদি নিজের পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক পর্যায়ে স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা পাই, তাহলে তার মাধ্যমে অন্য নারীরাও অনুপ্রাণিত হবে। আর এই দৃঢ়তা হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এক ধরনের সামাজিক শক্তি।

নারীদের সর্বদা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। নারীর কণ্ঠ কখনো ভাঙা যাবে না, কারণ এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক, সমতার পথে অগ্রযাত্রার হাতিয়ার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো। তাই নারীদের কণ্ঠ হতে হবে স্পষ্ট, সাহসী, যুক্তিনির্ভর এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের অঙ্গীকারে সর্বদা দৃঢ়।

 

একজন নারী কার কাছে অধিক নিরাপদ!
বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া তার গৃহ প্রবন্ধে দুঃখ করে বলেছিলেন, “প্রাণী-জগতে কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয়া নহে। সকলেরই গৃহ বা নিরাপত্তা আছে, নাই কেবল আমাদের।” নারীর অধিকার, কণ্ঠস্বর ও ক্ষমতায়নের এই বিশ শতকের এক উত্তাল যুগেও বারবার পত্রিকায় বা পুস্তকে একটি শিরোনাম হয় নারীর নিরাপত্তা কোথায় বা নারী কার কাছে অধিক নিরাপদ। এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির দায়িত্ববোধকেই প্রশ্ন করতে হয়।

কেননা, বর্তমান সমাজে নারী পারিবারিক সহিংসতা, স্বামী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে যৌতুকের জন্য নির্যাতন ভোগ এবং বিচারহীনতা ও দুর্নীতির কারণে হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাও কম নয়। এই সমস্যাগুলোর উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন আমাদের মন-মানসিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণের প্রতিফলন।

তা ছাড়া, এই সময়ে এসেও নারী সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছায়া থেকে বের হয়ে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে তার একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করতে পারে। সর্বোপরি, তখনই একজন নারী সে পুরুষ এবং সমাজের হাতেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, যে পুরুষ এবং সমাজ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল হবে এবং বিশ্বাস করে, লিঙ্গ নয় ব্যক্তি এবং ব্যক্তিই সমাজের যোগ্যতার মূল মাপকাঠি।

 

নারীর নিরাপদে প্রশাসনের কঠোরতা কেমন হওয়া উচিত
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এবং ‘পারিবারিক সহিংসতা আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া হেল্পলাইন নম্বর (৯৯৯) তো আছেই। আইন থাকলেও মিলছে না সুফল। এর পিছনে রয়েছে কিছু কারণ। যেমন, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে গেলে, আইনি জটিলতা পোহাতে হয়, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বিলম্ব। দায়ের করা অভিযোগের সমান গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতাও পরিলক্ষিত হয়। পাশাপাশি মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার কারণেও নারীরা দ্রুত সুবিচার পাই না।

আমি মনে করি, প্রশাসনকে এমন কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে কোনো অপরাধী খোলা বাতাসে বুক ফুলিয়ে হাঁটতে না পারে শাস্তি অবধি। আইনের যথাযথ ব্যবহার বা অপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা তার প্রতি প্রশাসনকে আরো সচেতন হতে হবে। আইনকে আরো কঠোর করতে হবে যাতে প্রতিটা স্তরের মানুষ আইনের উপর ভরসা রাখতে পারে। তবেই নারীদের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যা আমাদের সকলের কাম্য।

 

নারী কিভাবে প্রতিবাদ করবে
নিরাপত্তাহীনতার অভাবে ভুগছে অধিকাংশ নারী। বাড়ি থেকে বের হতে না হতেই পুরুষরূপী হিংস্র জানায়ারোর কিংবা হায়েনাদের লোভাতুর বা আক্রমণাত্নক বা হিংস্র দৃষ্টি গ্রাস করছে। নারীরা প্রতিনিয়ত কটূক্তি ও নানা নোংরা কুপ্রস্তাবের শিকার হচ্ছে।

কখনও কখনও নিজের স্বামী, মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, আবার কখনও কখনও নিজের সহকর্মী, নিজের বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী দ্বারা। অশালীন মন্তব্য, শরীর স্পর্শ, শিস দেওয়া, যৌতুক, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, ভয়াবহ নিপীড়ন, ধর্ষণ, পিছু নেওয়া, রাগের ক্ষোভে শরীর দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা, হায়েনাদের ভোগের পণ্য হওয়া, এই যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো সচেতনতা, শিক্ষা ও সংগঠিত প্রতিবাদ।

একজন নারী যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন, তবে তিনি অন্যায়কে চিহ্নিত করতে পারবেন এবং সাহসের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন। শিক্ষা কেবল ব্যক্তিকে নয়, পরিবার ও সমাজকেও পরিবর্তনের পথে এগিয়ে দেয়। পাশাপাশি আইনও নারীর শক্তিশালী হাতিয়ার। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন বা হয়রানির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের আশ্রয় নেওয়া জরুরি। একক প্রতিবাদ দুর্বল মনে হলেও সংগঠিত প্রতিবাদ সমাজে বড় পরিবর্তন আনে।

শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও প্রতিবাদের কার্যকর মাধ্যম। তবে এর শুরু পরিবার থেকে- সন্তানকে ন্যায়বোধ শেখানো, অবহেলাকে না বলা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই পরিবর্তনের সূচনা। তাই নারীর প্রতিবাদ মানে কেবল সড়কে স্লোগান নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান।