বাংলা ছায়াছবিতে আরেকজন উত্তমকুমার এল না কেন?

ড. রতন ভট্টাচার্যঃ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমার শুধু একজন সফল অভিনেতার নাম নন; তিনি একটি যুগের নাম, একটি সাংস্কৃতিক অনুভূতির নাম, বাঙালির স্বপ্ন, প্রেম, রোমান্টিকতা ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক।....

ড. রতন ভট্টাচার্যঃ   বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমার শুধু একজন সফল অভিনেতার নাম নন; তিনি একটি যুগের নাম, একটি সাংস্কৃতিক অনুভূতির নাম, বাঙালির স্বপ্ন, প্রেম, রোমান্টিকতা ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর মৃত্যুর বহু দশক পরেও বাঙালির চলচ্চিত্র-স্মৃতিতে তিনি একইভাবে জীবন্ত। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক—বাংলা ছায়াছবিতে আরেকজন উত্তমকুমার এল না কেন? এত প্রতিভাবান অভিনেতা এলেন, বহু নায়ক জনপ্রিয় হলেন, কেউ কেউ জাতীয় স্তরেও খ্যাতি অর্জন করলেন; কিন্তু উত্তমকুমারের মতো সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বস্তরের দর্শকের হৃদয়ে একই সঙ্গে স্থায়ী আসন করে নেওয়া আর কেউ পারলেন না কেন?

 

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, উত্তমকুমারের সঙ্গে তুলনা করাটাই এক অর্থে অন্যায়। কারণ তিনি কেবল অভিনয় করেননি; তিনি বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে যুক্ত করেছিলেন যে তাঁর ব্যক্তিত্ব পর্দার চরিত্রকে অতিক্রম করেছিল। তাঁর হাসি, চোখের ভাষা, কণ্ঠস্বর, পোশাক, হাঁটার ভঙ্গি—সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছিল ‘উত্তমকুমার’ নামের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ইমেজ।

 

উত্তমকুমারের আবির্ভাবের সময়টিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরের বাংলা সমাজ তখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু-জীবন, মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা, শহুরে জীবনের নতুন স্বপ্ন এবং একদিকে আধুনিকতার আকর্ষণ, অন্যদিকে পুরনো মূল্যবোধের টানাপোড়েন—এই সমস্ত কিছুর মধ্যে বাঙালি এমন এক নায়ককে খুঁজছিল, যার মধ্যে বাস্তবতা ও স্বপ্ন পাশাপাশি থাকবে। উত্তমকুমার সেই প্রয়োজনটি পূরণ করেছিলেন।

 

আর তাঁর পাশে সুচিত্রা সেনের উপস্থিতি সেই জাদুকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে যে রোমান্টিক পরিসর তৈরি করেছিল, তা শুধু দুটি অভিনেতার সাফল্য ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বাঙালির প্রেমের নিজস্ব ভাষা। তাঁদের পর্দার সম্পর্কের মধ্যে ছিল সংযম, আকর্ষণ, অভিমান, দূরত্ব, পুনর্মিলন—সবকিছু। তাঁরা প্রেমকে কখনও কেবল শারীরিক আকর্ষণ হিসেবে দেখাননি; প্রেম হয়ে উঠেছিল সামাজিক ও মানসিক সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতা।

 

উত্তমকুমারের আরেকটি বড় শক্তি ছিল তাঁর বহুমাত্রিকতা। তাঁকে শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়-প্রতিভার প্রতি অবিচার করা হবে। ‘নায়ক’-এ তিনি আত্মসচেতন চলচ্চিত্র তারকা, ‘সপ্তপদী’-তে জটিল আবেগের মানুষ, ‘ঝিন্দের বন্দী’-তে অ্যাডভেঞ্চারধর্মী চরিত্র, ‘সন্ন্যাসী রাজা’-য় ঐতিহাসিক আবহের চরিত্র, আবার ‘চিড়িয়াখানা’য় রহস্যময়তার ভিতরে থাকা এক অভিনয়শিল্পী। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর কাজ প্রমাণ করে দিয়েছিল যে জনপ্রিয় নায়ক হয়েও তিনি গভীর অভিনয়ের পরিসরে প্রবেশ করতে সক্ষম।

 

এখানেই আসে তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—স্বাভাবিকতা। উত্তমকুমার অভিনয়কে অনেক সময় অভিনয় বলে মনে হতে দিতেন না। তাঁর সংলাপ উচ্চারণ ছিল সহজ, কিন্তু তার মধ্যে থাকত আবেগের সূক্ষ্ম ওঠানামা। তাঁর চোখ অনেক সময় সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলত। তিনি অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গির বদলে মুখের অভিব্যক্তি, বিরতি, কণ্ঠের ওঠানামা এবং শরীরী ভাষার সাহায্যে চরিত্র নির্মাণ করতেন।

 

তবে শুধু অভিনয় দিয়ে উত্তমকুমারের মতো তারকা হওয়া সম্ভব ছিল না। প্রয়োজন ছিল অসাধারণ ‘স্টার পার্সোনা’। উত্তমকুমার পর্দায় এলেই দর্শক বুঝতেন—এখানে একজন বিশেষ মানুষ এসেছেন। তাঁর মধ্যে ছিল সৌন্দর্য, পুরুষত্ব, ভদ্রতা, রসবোধ এবং এক ধরনের বিষণ্ণ আকর্ষণ। মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষ তাঁর মধ্যে নিজের উন্নততর স্বপ্নকে দেখতে পেতেন; বাঙালি নারী দেখতে পেতেন আকাঙ্ক্ষিত প্রেমিকের একটি পর্দারূপ। এই দ্বৈত গ্রহণযোগ্যতা খুবই বিরল।

 

বাংলা চলচ্চিত্রে পরবর্তীকালে বহু প্রতিভাবান নায়ক এসেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অসামান্য অভিনেতা; তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব, সংযত অভিনয় এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সৌমিত্র কখনও উত্তমকুমারের প্রতিলিপি হতে চাননি। বরং তিনি নিজের সম্পূর্ণ আলাদা অভিনয়ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। তাপস পাল, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, চিরঞ্জিত, ভিক্টর ব্যানার্জি, আবির চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়সহ বহু অভিনেতা তাঁদের নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছেন। কেউই উত্তমকুমারের ‘দ্বিতীয় সংস্করণ’ হননি—এটাই স্বাভাবিক।

 

বিশেষ করে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে নায়ক-তারকার ধারাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তাঁকেও উত্তমকুমারের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। কারণ সময় বদলে গেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে এবং নায়কত্বের সংজ্ঞাও বদলেছে।

 

উত্তমকুমারের সময় বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক-সমাজ ছিল তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। একটি ছবি শহর থেকে মফস্‌সল, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে সাধারণ দর্শক—বিস্তৃত পরিসরে একই সঙ্গে জনপ্রিয় হতে পারত। আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখন দর্শক বিভক্ত—সিঙ্গল-স্ক্রিন, মাল্টিপ্লেক্স, টেলিভিশন, ওটিটি, ইউটিউব এবং সামাজিক মাধ্যমের দর্শক এক নয়। ফলে একজন অভিনেতার পক্ষে একই সঙ্গে সমস্ত শ্রেণির দর্শকের কাছে ‘একমাত্র নায়ক’ হয়ে ওঠা অনেক কঠিন।

 

আরও একটি বড় কারণ হলো চলচ্চিত্রের পরিবর্তিত অর্থনীতি। উত্তমকুমারের যুগে তারকার উপস্থিতিই অনেক সময় একটি ছবির প্রধান আকর্ষণ ছিল। আজ চলচ্চিত্রের সাফল্য নির্ভর করে কনটেন্ট, পরিচালক, বিপণন, ডিজিটাল প্রচার, স্ট্রিমিং অধিকার এবং নানা ধরনের দর্শক-পরিসরের ওপর। ফলে ‘একজন নায়ক = একটি শিল্প’ ধরনের তারকা-ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।

 

উত্তমকুমারের সময় সংবাদমাধ্যমও ছিল সীমিত। সংবাদপত্র, চলচ্চিত্রপত্রিকা, রেডিও এবং পোস্টার—এই ছিল তারকার সঙ্গে দর্শকের প্রধান যোগাযোগ। ফলে একটি রহস্য ও দূরত্ব বজায় থাকত। আজকের সামাজিক মাধ্যমে তারকার ব্যক্তিগত জীবন প্রায় প্রতিদিন দর্শকের সামনে চলে আসে। তারকার ‘মিথ’ তৈরি হওয়ার সুযোগ অনেক কমে গেছে। উত্তমকুমারকে দর্শক পর্দায় যেমন দেখতেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ততটা জানতেন না। ফলে তাঁর পর্দার ব্যক্তিত্বের চারপাশে একটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলা চলচ্চিত্রের সামগ্রিক পরিবর্তন। উত্তমকুমারের সময় সাহিত্য, গান, কবিতা, নাট্যচেতনা এবং চলচ্চিত্র পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, আশাপূর্ণা দেবী প্রমুখের সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। গানও ছিল চলচ্চিত্রের আত্মার অংশ। সুরকার, গীতিকার, পরিচালক, অভিনেতা—সব মিলিয়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছিল। সেই পরিবেশ থেকেই উত্তমকুমারের মতো তারকা জন্ম নিয়েছিলেন।

 

 

আজকের অভিনেতার সামনে আরও কঠিন প্রতিযোগিতা। তাঁকে শুধু ভালো অভিনেতা হলেই চলে না; তাঁকে ডিজিটাল যুগের দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর সাংস্কৃতিক অমরত্ব এক জিনিস নয়। সামাজিক মাধ্যমে কয়েক কোটি অনুসারী থাকা এবং কয়েক প্রজন্মের মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।

 

উত্তমকুমারের মৃত্যুও তাঁর কিংবদন্তিকে আরও দৃঢ় করেছে। ১৯৮০ সালে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ বাঙালির মনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল। যে শিল্পীকে মানুষ প্রতিদিন পর্দায় দেখত, তিনি হঠাৎ অনুপস্থিত। সেই অনুপস্থিতিই তাঁকে স্মৃতির মধ্যে আরও বৃহৎ করে তুলেছে। সময় যত এগিয়েছে, তাঁর ছবি পুনরায় দেখা হয়েছে, তাঁর গান শোনা হয়েছে, তাঁর সংলাপ উদ্ধৃত হয়েছে, তাঁর অভিনয় নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ফলে উত্তমকুমার একজন অভিনেতা থেকে ক্রমশ একটি ‘সাংস্কৃতিক স্মৃতি’ হয়ে উঠেছেন।

 

তাহলে কি আর কখনও ‘আরেকজন উত্তমকুমার’ আসবেন না? উত্তরটি সম্ভবত—আসবেন, কিন্তু উত্তমকুমার হয়ে নয়। প্রত্যেক যুগ তার নিজস্ব নায়ক সৃষ্টি করে। নতুন অভিনেতা হয়তো এমন এক অভিনয়শৈলী তৈরি করবেন যা ভবিষ্যতের দর্শকের কাছে আজকের উত্তমকুমারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু তাঁকে উত্তমকুমারের মাপকাঠিতে বিচার করলে তাঁর নিজস্বতা নষ্ট হবে।

 

উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর অনুকরণ নয়, তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তিনি দেখিয়েছেন, একজন অভিনেতা কীভাবে একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং শিল্পসম্মত হতে পারেন; কীভাবে বাঙালির আবেগকে ধারণ করেও অভিনয়ে সূক্ষ্মতা বজায় রাখা যায়; কীভাবে একজন তারকা একটি ভাষা, এক

টি শহর, একটি মধ্যবিত্ত সমাজ এবং একটি সময়ের স্বপ্নকে নিজের শরীর ও কণ্ঠে বহন করতে পারেন।

 

তাই বাংলা ছায়াছবিতে আরেকজন উত্তমকুমার এলেন না—কারণ উত্তমকুমার কোনো শূন্যস্থান ছিলেন না, যেটি পরে অন্য কেউ পূরণ করবেন। তিনি ছিলেন এক বিশেষ ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুহূর্তের অনন্য সৃষ্টি। সেই মুহূর্ত আর ফিরে আসেনি। বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন নায়ক এসেছে, আসবে; নতুন জনপ্রিয়তা তৈরি হবে, নতুন তারকা জন্ম নেবে। কিন্তু উত্তমকুমার থাকবেন তাঁর নিজের জায়গায়—একটি সময়ের প্রতীক, বাঙালির রোমান্টিক কল্পনার মুখ এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনতিক্রম্য ‘মহানায়ক’।

সম্ভবত এ কারণেই আজও কোনও পুরনো বাংলা ছবি শুরু হলে পর্দায় তাঁর মুখ দেখা মাত্র দর্শকের মনে একটি অদ্ভুত অনুভূতি জেগে ওঠে—এ যেন কেবল একজন অভিনেতার প্রত্যাবর্তন নয়, হারিয়ে যাওয়া এক যুগের ফিরে আসা। আর সেই যুগের পুনরাবৃত্তি হয় না। হয় শুধু তার স্মরণ।

(আন্তর্জাতিক টেগোর পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষী লেখক ও কবি ড. রতন ভট্টাচার্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যাফিলিয়েট ফ্যাকাল্টি এবং কলকাতা ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি।