ড.নুরুল ইসলাম বাবুল
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, এমন এক আশ্চর্য দেশের কথা, যেখানে আইন আছে অথচ ন্যায় নেই, বিচার আছে অথচ যুক্তি নেই, রাজা আছেন অথচ রাজত্বের কোনও সঙ্গত অর্থ নেই। সেখানে রামগরুড়ের ছানারা হাসতে জানে না, হুঁকোমুখো হ্যাংলা নিজের পরিচয়েই এক বিস্ময়, আর একুশে আইনের দেশে সাধারণ নিয়মকানুনও হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত প্রহসন। দেশটির কোনও মানচিত্র নেই, অথচ বাঙালির কল্পনায় তার অস্তিত্ব চিরকালীন। এই দেশ সুকুমার রায়ের—যেখানে অসম্ভব স্বাভাবিক, অস্বাভাবিকই যেন নিয়ম, আর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাস্তব পৃথিবীর গভীরতম অসংগতি। ছোটবেলায় আমরা সুকুমার রায়কে পড়ি হাসতে হাসতে। তাঁর ছড়ার অদ্ভুত প্রাণী, অসম্ভব সব নাম, উলটপালট ঘটনা আর উদ্ভট যুক্তি আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু বয়স বাড়লে একদিন মনে হয়, এই হাসির ভিতরে যেন অন্য কোনও গল্প আছে। ‘হযবরল’, ‘আবোল তাবোল’, ‘পাগলা দাশু’ কিংবা ‘খুড়োর কল’—এসব কি কেবল শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য লেখা? নাকি এইসব উদ্ভট কল্পনার মধ্য দিয়েই তিনি আমাদের পরিচিত পৃথিবীটাকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছেন?
১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় জন্ম সুকুমার রায়ের। পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন লেখক, চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ এবং মুদ্রণপ্রযুক্তির পথিকৃৎ। তাঁদের গড়পার রোডের বাড়িতে সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তির ছিল আশ্চর্য সহাবস্থান। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে পড়াশোনা শেষ করে ১৯১১ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যান আলোকচিত্র ও মুদ্রণপ্রযুক্তি শিখতে। সেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে, পাশাপাশি প্রসারিত হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিগন্ত। ব্রাহ্মসমাজের উদার পরিবেশ এবং যুক্তিবাদী পারিবারিক আবহ তাঁর মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৯১৩ সালে The Quest পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর প্রবন্ধ The Spirit of Rabindranath Tagore প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, যাঁকে আমরা মূলত ছড়াকার হিসেবে চিনি, তিনি ছিলেন শিল্প, বিজ্ঞান ও চিন্তার জগতের এক বহুমুখী মানুষ।
১৯১৫ সালে উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর সুকুমার ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এই পত্রিকাই হয়ে ওঠে তাঁর কল্পনার পরীক্ষাগার। সেখানে তিনি এমন এক সাহিত্যভাষা তৈরি করলেন, যেখানে বাস্তবের নিয়ম ভেঙে যায়, কিন্তু জীবনের সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘হযবরল’-এর সেই বিচারসভায় প্রবেশ করলে মনে হয়, আমরা যেন এক অদ্ভুত প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় এসে পড়েছি। প্রশ্নের উত্তর নেই, যুক্তির ধারাবাহিকতা নেই, অথচ প্রত্যেকেই নিজের কথাকে চূড়ান্ত সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। পাঠক হাসেন, কিন্তু হাসতে হাসতেই বুঝতে পারেন—এ তো কেবল কল্পনার বিচারসভা নয়, আমাদের চেনা সমাজেরও এক ব্যঙ্গচিত্র। ‘শিবঠাকুরের আপন দেশে, আইন-কানুন সর্বনেশে’—এই পঙ্ক্তি যেন সেই ব্যঙ্গেরই সংক্ষিপ্তসার। আইন যখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার বদলে নিজেই বিভ্রান্তির কারণ হয়ে ওঠে, তখন নিয়মের গাম্ভীর্য ভেঙে পড়ে প্রহসনে। সুকুমার কোনও নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ঘটনার বিবরণ দেননি; বরং এমন এক কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে ক্ষমতা ও নিয়মের অযৌক্তিকতা নিজেই নিজের মুখোশ খুলে দেয়। তাঁর প্রতিবাদ বক্তৃতার ভাষায় নয়, হাসির ছন্দে। আবার ‘খুড়োর কল’-এ এক আশ্চর্য যন্ত্রকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা, লোভ ও বিস্ময়ের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা আধুনিকতার অন্ধ মোহকে প্রশ্ন করতে শেখায়। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার কথা, কিন্তু প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস কখনও মানুষকেই হাস্যকর করে তোলে। ‘রামগরুড়ের ছানা’য় হাসতে না পারার বিধানও তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। যে সমাজ আনন্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানে হাসি নিজেই হয়ে উঠতে পারে স্বাধীনতার প্রকাশ। এই কারণেই সুকুমারের উদ্ভট চরিত্রগুলি নিছক কৌতুকের উপকরণ নয়; তারা মানুষের আচরণ, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে নতুন আলোয় দেখায়।
তাঁর এই কল্পনাজগৎকে বুঝতে মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভাল’ ধারণার কথা মনে পড়ে। কার্নিভালে সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রচলিত সীমানা সাময়িকভাবে উল্টে যায়; রাজা থেকে সাধারণ মানুষ—সকলেই হাস্যরসের অংশ হয়ে ওঠেন। সুকুমারের লেখাতেও কেউ ব্যঙ্গের ঊর্ধ্বে নন। ফ্রয়েডের ‘সাবলিমেশন’ ধারণা দিয়ে তাঁর হাস্যরসের মনস্তাত্ত্বিক পাঠ করা সম্ভব—যেখানে জটিল অনুভূতি সৃজনশীল প্রকাশের পথ খুঁজে পায়। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কোনও নির্দিষ্ট অবদমনকে এই সৃষ্টির কারণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিশেষত্ব হলো, তিনি বাস্তবের সীমাবদ্ধতাকে কল্পনার স্বাধীনতায় অতিক্রম করেছিলেন। সুকুমারের ভাষাও তাঁর পরাবাস্তব জগতের অন্যতম নির্মাতা। ‘কুমড়োপটাশ’, ‘ট্যাঁশগরু’, ‘হুঁকোমুখো হ্যাংলা’—এই শব্দগুলি অভিধানের বাঁধা অর্থ মানে না, অথচ ধ্বনি, ছন্দ ও কল্পনার জাদুতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লুইস ক্যারল ও এডওয়ার্ড লিয়রের ননসেন্স সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির শিকড় বাংলা ভাষা, দেশজ কৌতুক ও লোককল্পনায় গভীরভাবে প্রোথিত। সুকান্ত চৌধুরী সম্পাদিত The Select Nonsense of Sukumar Ray তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যকে বৃহত্তর পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে। আশ্মিতা মুখার্জির South Asian Review-এ প্রকাশিত গবেষণাও ‘আবোল তাবোল’-এর হাস্যরসের বহুমাত্রিকতা বিশ্লেষণ করেছে।
মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে, ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সুকুমার রায়ের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি ‘আবোল তাবোল’; মৃত্যুর নয় দিন পরে বইটি প্রকাশিত হয়। শেষ কবিতার পঙ্ক্তি—‘ফুরিয়ে এল আবোল তাবোল। / ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, / গানের পালা সাঙ্গ মোর’—আজও পাঠকের মনে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা জাগায়। যেন শিল্পী জানতেন, তাঁর ব্যক্তিগত সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ তাঁর কল্পনার জগৎ থেমে থাকবে না। আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে অনেক সময় মনে হয়, আমরা যেন এক বিশাল ‘হযবরল’-এর বাসিন্দা। যুক্তির বদলে কর্তৃত্ব, তথ্যের বদলে অপতথ্য, ন্যায়ের বদলে আনুষ্ঠানিকতা—সব মিলিয়ে বাস্তব কখনও কখনও সুকুমারের কল্পনাকেও হার মানায়। তাই তাঁর পরাবাস্তবতা বাস্তব থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়; বরং বাস্তবের মুখোশ খুলে দেওয়ার এক শিল্পিত কৌশল। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর অসংগতিগুলিকে চিনতে কখনও কখনও গম্ভীর মুখের চেয়ে হাসিই বেশি কার্যকর। সুকুমার রায়কে পড়তে পড়তে তাই আমরা শুধু হাসি না—হাসির ভিতর দিয়ে নিজেদের পৃথিবীটাকেও নতুন করে চিনে নিই।