মৃনাল কান্তি দাস
শতবর্ষ আগে প্রকাশিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী শুধু পাঠকের হৃদয়ে আলোড়নই তোলেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের ভিতও। বিপ্লব, স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় লেখা এই উপন্যাস শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়েছিল ঔপনিবেশিক সরকারের হাতে। শত বছর পর ফিরে দেখা যাক, কেন একটি উপন্যাসকে এতটা ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশরাজ।
আসলে কিছু বই শুধু গল্প বলে না। সময়ের জানালা খুলে দেয়। মানুষকে জাগিয়ে তোলে। রাষ্ট্রের ঘুমও কেড়ে নেয় কখনও কখনও। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী তেমনই এক উপন্যাস।
শত বছর আগে বইটি প্রকাশের সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য আকাঙ্ক্ষার সময়—একদিকে অহিংস জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অন্যদিকে বিপ্লবী তৎপরতা। সেই পটভূমিতে শরৎচন্দ্র লিখলেন এমন এক উপন্যাস, যার সারকথা ব্যক্তিগত জীবনকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর মানবমুক্তির ঝান্ডা তুলে ধরা। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুনে প্রকারান্তরে কিছু কাঠখড়েরই জোগান দেন লেখক।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাই পথের দাবীকে শুধু শতবর্ষের মাইলফলক ছোঁয়া একটি উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেই থেমে যাওয়া চলে না। উপন্যাসটি যে উত্তাল এক সময়খণ্ডের ধারক, একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার বাহক এবং সাহিত্যের রাজনৈতিক শক্তির দলিল, তা উচ্চ স্বরে উচ্চারণের দাবি রাখে।
অথচ তেমন সাহিত্যগুণ নেই মনে করে লেখক নিজেই পথের দাবীর পাণ্ডুলিপি ফেলে রেখেছিলেন। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেটি বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের জন্য চেয়ে নেন, পরে তিনিই হন বইটির প্রকাশক। বঙ্গবাণীর দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা থেকে (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) পথের দাবী প্রকাশিত হতে শুরু করে। শেষ কিস্তি ছাপা হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখে, অর্থাৎ ১৯২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে। পরে একই বছরের ৩১ আগস্ট বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ। দাম তিন টাকা।
প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম সংস্করণের প্রায় সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। শুধু এই একটিমাত্র তথ্যেই বোঝা যায়, বইটি পাঠকের মধ্যে কতটা আলোড়ন তুলেছিল আর কেনই–বা শাসকগোষ্ঠীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। ফলে পুলিশ যখন বইটি বাজেয়াপ্ত করতে মাঠে নামে, তখন হাতে পাওয়ার মতো কপি প্রায় ছিলই না বাজারে।
যে বইকে একদিন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেটি এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রচার বন্ধ করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু ‘প্রসার’ থামাতে পারেনি, পারেনি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে।
শরৎচন্দ্রের আগে কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। বিদ্রোহী কবির লেখা শুধু নিষিদ্ধই করা হয়নি, তাঁকে কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। সমসাময়িক সময়ে নিষিদ্ধ হয়েছিল জেমস জয়েসের ইউলিসিস কিংবা ডি এইচ লরেন্সের লেডি চ্যাটারলি’স লাভার-এর মতো বইও। অজুহাত ভিন্ন, কিন্তু শাস্তির ধরন এক। কালে কালে শাসকদের আস্থা মূলত প্রায়োগিক শক্তিতে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শাসকের নিষেধাজ্ঞার খড়্গে মরচে পড়ে, ‘নিষিদ্ধ’ বই ঠিকই পাঠকহৃদয় আলোকিত করে চলে। এর নাম—সাহিত্যের শক্তি।
২
পথের দাবীর উপর ইংরেজরা যাতে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র। তার প্রতিউত্তরে রবীন্দ্রনাথের জবাব নীচে কিছুটা তুলে ধরা হল:
“তোমার পথের দাবী পড়ে শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। মানে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে এটাকে দোষের নাও মনে হতে পারে, কেননা লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। নানা দেশ ঘুরে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে এই দেখলেম, একমাত্র ইংরেজ গভর্ণমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে এত বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্ণমেন্ট সহ্য করবে না।
তোমার বই তারা প্রচার বন্ধ করে না দিত তাহলে বুঝা যেত সাহিত্যে তোমার শক্তি ও দেশে তোমার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে তার নিরতিশয় অজ্ঞতা। শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সহ্য করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।”
রবীন্দ্রনাথ এও লিখলেন, ‘‘রাজশক্তির আছে গায়ের জোর। তার বিরুদ্ধে কর্তব্যের খাতিরে যদি দাঁড়াতেই হয়, তাহলে অপরপক্ষের থাকা উচিত চারিত্রিক জোর। অর্থাৎ আঘাতের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার জোর।”
রবীন্দ্রনাথের মতে, যে বই সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, সেই বই প্রকাশ করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি না করাই উত্তম। আর লেখক যখন সেই অশান্তি একবার তৈরি করেই ফেলেছেন, এখন আর শাস্তির ভয় না করাই উচিত হবে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের মতে বিশৃঙ্খলা মানেই অমঙ্গল নয়, ভুলটাকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই সমাজের ক্ষতি হয়।
রবীন্দ্রনাথের পত্রের জবাবে শরৎচন্দ্রের জবাব কিছুটা তুলে ধরা হল:
“নানা কারণে বাংলা ভাষায় এই ধরনের বই কেউ লেখে না। তাই আমি যখন লিখলাম, তখন সবদিক জেনেই লিখেছি। কিন্তু বাংলার গ্রন্থকার হিসেবে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি এবং তা সত্ত্বেও যদি রাজশাস্তি ভোগ করতে হয় তো করতেই হবে, তা মুখ বুজেই মেনে চলি কিন্তু প্রতিবাদ করা কি উচিত নয়?
আমার প্রতি আপনি এই অবিচার তুলেছেন যেন আমি শাস্তি এড়াবার ভয়েই প্রতিবাদের ঝড় তুলেছি,কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। দেশের লোকে যদি প্রতিবাদ না করে তবে আমাকেই করতে হবে তবে হৈ চৈ করে নয়, আরেকখানা গ্রন্থ লিখে”।
শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন, ক্ষমার প্রত্যাশা তাঁর ছিল না— “…যদি রাজরোষে শাস্তিভোগ করতে হয় ত করতেই হবে— তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি। কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়? প্রতিবাদেরও দণ্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ আবশ্যক। নইলে গায়ের জোরকেই প্রকারান্তরে ন্যায্য বলে স্বীকার করা হয়।”
রাজরোষে বিপন্ন প্রতিবাদীর প্রতি আর পাঁচ জনের কর্তব্য কী, এ প্রশ্নটি আজও নাড়া দিচ্ছে, তাই আজও কথাগুলো জরুরি। শাসকের অবজ্ঞার থেকে প্রত্যাঘাতের মূল্য বেশি, এবং তা সহ্য করতে তৈরি থাকতে হবে প্রতিবাদীকে, রবীন্দ্রনাথের এ কথাগুলি যথার্থ। কিন্তু সত্যবাদীর উপর অকারণ বলপ্রয়োগের প্রতিবাদ না করলে শাসকের স্বৈরাচারকেই সমর্থন করা হয় না কি? ক্ষমতান্ধ শাসকের কাছে শাস্তিই প্রত্যাশিত, কিন্তু সহ-নাগরিক? তাঁদের কাছে কী প্রত্যাশা করতে পারেন লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, সে কথাটাও সমাজকে চিন্তা করতে হবে। ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকথনের দায় সৃজনশীল মানুষের, কিন্তু সেই মানুষটির সুরক্ষার দায় কার?
নিজের অবস্থান সম্পর্কে আপোষ নয়, বরং জোরালো মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের অবস্থান দৃঢ় করেছেন শরৎচন্দ্র। তিনি রাজনৈতিক পুস্তিকা লেখেননি; রাজনৈতিক বাস্তবতাকে রূপ দিয়েছিলেন উপন্যাসে। সেখানেই তাঁর সাহিত্যিক মনীষা। সেটাই সাহিত্যের শক্তি।
৩
কী আছে বইটিতে?
“আমরা সবাই পথিক। মানুষের মন্যুষত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙ্গেচুরে চলব”
এই হল পথের দাবীর মূলমন্ত্র। সাদা চামড়া না হওয়ার অপরাধে যখন কাউকে বেঞ্চে বসতে দেওয়া হয় না, আইনের কাছে যখন নিপীড়ক পার পেয়ে যায়, শাস্তি পায় নিপীড়িতরা, তখন বোঝা যায় স্বাধীনতা কী চরমভাবে অবহেলিত হচ্ছে, কী ভীষণ রকমের দরকার হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার ছোঁয়া। স্বাধীনতা মানে তো কেবল শুধুমাত্র দু’বেলা ভরপেট খাবার খাওয়া নয়, স্বাধীনতার ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত।
শরৎচন্দ্রের সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসিত। পরাধীনতার শেকল ভেঙে এক নতুন জাগ্রত সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তারই তো প্রতিচ্ছবি পথের দাবী। সব্যসাচী চরিত্রটি তো তারই চিত্র বহন করে। সব ভেঙেচুরে নতুন স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ফুটে ওঠে। গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে সমাজের এতদিনের পুরনো শিকল ভেঙে ফেলা সম্ভব, এতে বিশ্বাস ছিল না শরৎচন্দ্রের। তিনি মনে করতেন, আঘাতে আঘাতে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে আগামীর জন্য। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন,
“পথের দাবীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যসেন। আমার আশীর্বাদ রইল তাঁর সঙ্গে।”
শরৎচন্দ্রের এই ভাবমূর্তি দেখা যায় মূল চরিত্র সব্যসাচীর মাধ্যে। তিনিই এই বিপ্লবের নায়ক। আবার অন্যদিকে এর মধ্যে পাওয়া যায় সনাতনী চেহারা। পরিবর্তন চায়, কিন্তু পুরাতন শিকল ভেঙে ফেলার জন্য যে বিপ্লবের দরকার, তাতে ভয় হয়। ভবিষ্যতের জন্য কেন আজকের সময়গুলি নষ্ট, কেন আজকের মানুষগুলির উপর অন্যায়, কেন শুধু তথাকথিত এলিট ক্লাস নিয়েই চিন্তা, কেন প্রান্তিক মানুষগুলো জানতেও পারবে না স্বাধীনতা কী, কেন তারাও অংশগ্রহণ করবে না? নানা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে সব্যসাচীর মাথায়। অন্যদিকে গল্পের আরেক চরিত্র অপূর্ব। সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে সে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থান এই সাধারণ জনগণেরই। পরাধীনতা এদের অস্থিমজ্জায় এমনভাবে আছে যে তাদের আর কিছু বোধ হয় না স্বাধীনতা-পরাধীনতা নিয়ে। হয়তো কখনও কখনও খারাপ লাগে, কিন্তু এত কঠিন বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট ছাড়া আর কী? তাই নিজের স্বার্থ বাচাতে অপূর্বের দলের বাকিদের সাথে বেইমানি করতেও বাধেনি।
সমাজের নানা অসঙ্গতি লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব নারীরা যোগ দেন তাদের মধ্যে অনেকেই এসেছিল বারাঙ্গনা পল্লী থেকে। সেখানে একটি মেয়ে ছিল বিমলা নামে। অসম্ভব সাহসী, বুদ্ধিমতী, চৌকস একজন নারী। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করা হয়, পথের দাবীর সুমিত্রাই কি বিমলা? এর জবাবে তিনি বলেন,
“হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে, মেয়েটা কিন্তু সত্যিকার প্যাট্রিয়ট৷ যেখানেই থাকুক, যা-ই করুক, স্বদেশকে ও চিরকাল ভালবাসবে৷”
পথের দাবী কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর অনুপ্রেরণার কাহিনি নয়। এর ভিতরে রয়েছে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার প্রশ্ন—রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।বইয়ের প্রতিটি পাতায় আছে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার এক প্রেরণা। শুধুমাত্র শান্তিতে জীবন পার করাই জীবনের স্বার্থকতা নয়। মানুষ তার নিজের ইচ্ছানুযায়ী চলবে, কিন্তু অপরের ইচ্ছা যখন তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ব্যক্তিস্বাধীনতা কোথায় আর থাকে? শাসক যখন হয় শুধুমাত্র শোষণের জন্য, তখন সেই শাসনরূপী শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পথের দাবীর প্রয়োজন। আজও…