শান্তিতে নোবেল পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নিরলস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই।....

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নিরলস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় তামিল বংশোদ্ভূত এক দরিদ্র ভারতীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার অধীনে বড় হয়ে ওঠার সময় দারিদ্র্য ও বর্ণবৈষম্যের বহুবিধ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। ​উল্লেখ্য, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

 

​নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের জন্য পিল্লাইকে এই বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হলো।” ​কমিটির অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যান্য অধিকারকামীদের আইনি লড়াই পরিচালনা করার শুরুর দিনগুলি থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের একাধিক যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন- এই দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল ভিত্তিই ছিল বিচার নিশ্চিত করা।”

 

 

​বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নাভি পিল্লাই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও তাদের শীর্ষনেতাদের অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জবাবদিহিতায় বাধ্য করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে হিংসা ও সংঘাতের শিকার মানুষদের মনে আশার সঞ্চার করেছেন। ​নোবেল কমিটির ভাষায়, “নভি পিল্লাই বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক আইনি নীতির অন্যতম সেরা রক্ষক। তাঁর বর্ণাঢ্য ও দূরদর্শী কর্মজীবন আমাদের বিশ্বব্যাপী আইনের শাসনকে সমর্থন, সুসংহত ও প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার ও মানব মর্যাদার প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা বিশ্বজুড়ে এক শান্তিময় পৃথিবী গড়ার চেষ্টায় লিপ্ত প্রত্যেকের জন্য প্রেরণা ও আশার উৎস।”

 

​রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ (আইসিটিআর)-এর সেই ঐতিহাসিক রায়ের প্রসঙ্গ টেনে কমিটি জানায়, “রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল যখন এটি প্রথমবার সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে গণধর্ষণ ও যৌন হিংসাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ- এমনকি গণহত্যার শামিল বলে গণ্য করা যেতে পারে, তখন বিচারক হিসেবে পিল্লাইয়ের প্রভাব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেই একই মামলায় তিনি আরও একটি নজিরবিহীন আইনি মোড় ঘুরিয়েছিলেন: আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কেবল ঘৃণাসূচক প্রচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ভিত্তিতে গণহত্যার প্ররোচনার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিল।”

 

​মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই

​ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত ৮৫ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকান প্রবীণ আইনজীবী পিল্লাই ১৯৬৭ সালে তৎকালীন নাটাল প্রদেশে প্রথম মহিলা হিসেবে নিজস্ব আইনি অনুশীলন শুরু করেছিলেন। ​তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং অন্যান্য বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে বিবাদী পক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে লড়াই করেছেন। এ ছাড়া, দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাও ছিলেন তিনি।

 

​পরবর্তীকালে তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ (আইসিটিআর), ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ (আইসিসি) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন।
​নোবেল কমিটি বিশেষ করে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে পিল্লাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে গণধর্ষণ ও যৌন হিংসাকেও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং ‘গণহত্যা’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এ ছাড়া, অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড সংক্রান্ত জাতিসংঘের ‘স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন’-এর প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। এই কমিশন গত বছর এক প্রতিবেদনে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে।

 

​জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে পিল্লাই স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের একটি সুনির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ধ্বংস করার স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র চার ধরনের গণহত্যামূলক অপরাধ সংঘটনের জন্য সরাসরি দায়ী।” শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে গাজায় এই গণহত্যা সংঘটনে ‘উস্কানি ও প্ররোচনা দেওয়ার’ জন্যও অভিযুক্ত করেছিলেন তিনি। ​বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের গণহত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাটিতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রখ্যাত আইনি ব্যক্তিত্ব।

 

আন্তর্জাতিক এই সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার খবর শুনে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় পিল্লাই জানান, প্রথমে এটিকে একটি রসিকতা বলেই মনে হয়েছিল তাঁর। হাসিমুখে তিনি মন্তব্য করেন, “একজন পেশাদার আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে আজও নিজের চোখে সত্যতা যাচাই করে নেওয়ার অভ্যাসটা আমার কাটেনি।” ​নিজের সাম্প্রতিক কাজের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, “আমার পেশাগত জীবনে সর্বশেষ যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছি, তা হলো গাজা সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ করা- যেখানে সেখানে ঘটে যাওয়া নির্মম বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।” ​পিল্লাই বলেন, “সেই রিপোর্ট প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মূল প্রতিক্রিয়াগুলির একটিই ছিল- সত্য প্রকাশের সাহসী ভূমিকা পালন করার জন্য আমাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো। স্বাভাবিকভাবেই আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিলাম। কারণ, চরম সত্যিটা তুলে ধরার জন্য কেন আলাদা করে সাহসের প্রয়োজন হবে?”