স্বপ্নের কোনো অবসর নেই, এখনও অনেক পথ চলা বাকি

সেখ হাবিব কিছু মানুষ নিজের ভাগ্য বদলাতে চান, আর কিছু মানুষ সারাজীবন ব্যয় করেন একটি সমাজের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্নে। বর্তমান সময়ে তাঁদেরই মধ্যে অন্যতম একজন হলেন আল-আমীন মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ....

সেখ হাবিব

কিছু মানুষ নিজের ভাগ্য বদলাতে চান, আর কিছু মানুষ সারাজীবন ব্যয় করেন একটি সমাজের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্নে। বর্তমান সময়ে তাঁদেরই মধ্যে অন্যতম একজন হলেন আল-আমীন মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম।

আল-আমীন মিশনের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম একা নন, যুগে যুগে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল প্রত্যেক সমাজ সংস্কারককেই, যাঁরা অন্ধকারকে আলোকিত করার কাজে সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

মাদার টেরিজা তাঁর কাজ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত নাম-যশের চেয়ে কাজের মূল উদ্দেশ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তীব্র সমালোচনা থেকে মুক্ত ছিলেন না। বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকেই তিনি আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। তাঁর মনোভাব ছিল, মানুষের সমালোচনার ভয়ে নিজের স্বাধীন চিন্তার পথ পরিত্যাগ করা নয়।

 

 

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর Basic Education বা Nai Talim নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শিশুর চরিত্র, আত্মনির্ভরতা ও মানবিক মূল্যবোধ।

আর এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমোঘ বাণী –
“একমাত্র উত্তর হলো সম্পূর্ণ নীরবতা। অর্থাৎ, আমি যদি তাদের আক্রমণের পাল্টা আক্রমণ করি, তাহলে আমরাও তাদেরই স্তরে নেমে যাব। সত্য নিজেই নিজের যত্ন নেবে।”

বর্তমানে এমন কিছু সমালোচকের আবির্ভাব হয়েছে যাঁরা সমাজে কোন অবদান না রেখেই নিজেদেরকে পন্ডিত লেখক, পন্ডিত সাংবাদিক আখ্যায়িত করতে পছন্দ করেন। নুরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁদের ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক লেখনী এবং ভাষা প্রয়োগেই বোঝা যায় তাঁরা আদতে সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকারক। তাঁরা নুরুল ইসলাম তথা আল-আমীন মিশনের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত কুৎসা রটিয়ে চলেছেন।

 

 

কিন্তু চিন্তাশীল সমাজ বোঝেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটা সম্প্রদায়কে সমাজের মূল স্রোতে আনার যে দুঃসাহসিক কাজ নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে আল-আমীন মিশন ৪০ বছর ধরে করে আসছে, তাকে স্তব্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস চলছে।

সমাজে সবথেকে দুর্বল শ্রেণি হল নিরক্ষর, আর সব থেকে শক্তিশালী হাতিয়ার হল অক্ষরজ্ঞানে তাঁদেরকে আলোকিত করা। এই কাজটা বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়।

এ বিষয়ে নুরুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন –
“যাঁরা নেগেটিভ সমালোচনা করছেন এবং যাঁরা পজিটিভ আলোচনা করছেন, সবটাই তো আল-আমীন মিশনকে নিয়ে। তাতে অসুবিধা কি! দুটি ক্ষেত্রেই মিশনের যাত্রাপথ আরো আলোকিত, আরো সুদৃঢ় হচ্ছে।”

 

 

রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, মাদার টেরিজার Missionaries of Charity-এর মতো প্রতিষ্ঠান কেন নিজেদের ভিতর থেকে নেতৃত্ব তুলে আনে? কারণ “আপন লোককে সুবিধা দেওয়া” নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির আদর্শ, সংস্কৃতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান।

নুরুল ইসলামও মনে করেন, উত্তরসূরি বাইরে থেকে খুঁজে আনার আগে ভিতরেই পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করে রাখা। তাই এগিয়ে আছেন মিশনের বেশকিছু প্রাক্তনীরা, যাঁরা ছাত্র শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত মিশনেরই সঙ্গী, এছাড়াও দীর্ঘ সময়ের কর্মী-সাথীরা ।

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী গঠিত সাধারণভাবে কোনও Charitable Trust/NGO-কে তার সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব প্রত্যেক সাধারণ নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে দিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। কোন আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি চলছে, তার উপর সরকারের কাছে হিসাব, Audit Report, Return এবং নির্দিষ্ট Disclosure-এর বাধ্যবাধকতা থাকে।

 

 

আমি তাঁকে বলতে শুনেছি –
“আমার মৃত্যুর পর ব্যাংকে আরও কত টাকা থাকবে—এটি কি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি জীবিত অবস্থায় সেই অর্থ দিয়ে কত মানুষের জীবন একটু ভালো করতে পারলাম—সেটি গুরুত্বপূর্ণ? আমি ব্যক্তিগতভাবে মিশন থেকে কোনো পারিশ্রমিক নিই না। আমি যে সরকারি পেনশন পাই সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।”

সত্যিই কি তাঁরা অর্থ, সম্পদ, বিলাসিতা ও পার্থিব প্রাচুর্যের মোহ ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে সমাজকল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে কিংবা বুঝতে হলে দর্শনশাস্ত্র, মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব এবং নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিতে অনুধাবন ও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আমরা শিক্ষাবিজ্ঞানে পড়েছি শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য Wisdom অর্জন করা। এই Wisdom এর পরেও আরো তিনটি শব্দ আছে Self-Realization, Spirituality & Self-Actualization। যাঁরা দেশ তথা বিশ্বের উন্নতিতে নিজ নিজ কাজে একাগ্রতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সততার সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে সর্বক্ষণ নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন তাঁরা ধীরে ধীরে ত্যাগের দর্শনের দিকে পরিচালিত হয় । পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার মূল উদ্দেশ্য তাঁরা অনুধাবন করতে শুরু করেন ।

 

 

কিছু মানুষ বয়সে প্রবীণ হন, কিন্তু স্বপ্নে কখনও প্রবীণ হন না।

সত্তর বছর বয়স পেরিয়েও তাঁর কর্মচাঞ্চল্য দেখে মনে হয়—বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা; স্বপ্নের বয়স হয় না।

একটি স্বপ্ন থেকে শুরু করে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ—এই যাত্রা নিঃসন্দেহে সহজ ছিল না।

স্যার সৈয়দ আহমদ খানের স্বপ্ন থেকে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়,
বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন থেকে নারীশিক্ষার প্রসার,
রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন থেকে শান্তিনিকেতন…
আরো বহু আছে পৃথিবীর বুকে আলোক উজ্জ্বল ইতিহাস হয়ে ….

ঠিক তেমনই নুরুল ইসলামের স্বপ্ন থেকে আল-আমীন মিশন— পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুদের শিক্ষাবিপ্লব ও গৌরবের আরেক নাম।

আপনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি; আপনি বহু মানুষের মনে স্বপ্ন দেখার সাহস জাগিয়েছেন।

আপনি শুধু শিক্ষার প্রসার ঘটাননি; আপনি বহু পরিবারের ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছেন।

আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন, দীর্ঘায়ু দান করুন। আপনার হাতে জ্বলে ওঠা শিক্ষার প্রদীপ আরও বহু প্রজন্মের পথ আলোকিত করুক।

নুরুল ইসলামের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী—একটি বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নাকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসংখ্য তরুণ-তরুণীর মনে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জাগিয়ে তোলা?