যে কণ্ঠ আজও হৃদয়ে বাজে: কুমার শানুর সুরেলা সফর

কানাই দাস   নব্বইয়ের দশকের ভারতবর্ষ ছিল এক অদ্ভুত রোমান্টিক ঘোর লাগা সময়। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টেলিভিশন সবে রঙিন হচ্ছে, ড্রয়িংরুমের ক্যাসেট প্লেয়ারে রিবন আটকে গেলে রোটোম্যাক বলপেন দিয়ে পরম....

কানাই দাস

 

নব্বইয়ের দশকের ভারতবর্ষ ছিল এক অদ্ভুত রোমান্টিক ঘোর লাগা সময়। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টেলিভিশন সবে রঙিন হচ্ছে, ড্রয়িংরুমের ক্যাসেট প্লেয়ারে রিবন আটকে গেলে রোটোম্যাক বলপেন দিয়ে পরম যত্নে তা ঘোরানো হতো, আর চৌরঙ্গীর গলির মোড়ের ক্যাসেট শপ থেকে ভেসে আসত এক মায়াবী, মনোমুগ্ধকর কণ্ঠস্বর। সেই সুর কেবল ক্যাসেট বিক্রি বা চার্টবাস্টারের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ঢুকে পড়েছিল কোটি কোটি মানুষের প্রেম, বিরহ, আনন্দ আর একাকীত্বের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে। যাঁর কণ্ঠে সেই সময় গোটা দেশের মানুষ প্রেম বিরহ আর আনন্দকে নতুন করে অনুভব করেছিল। তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় কুমার শানু (আসল নাম কেদারনাথ ভট্টাচার্য, জন্ম: ১৯৫৭, ২০ অক্টোবর)।

 

 

সংগীতের পরিমাপে কুমার শানু কেবল একজন প্লেব্যাক গায়ক নন, তিনি নব্বইয়ের দশকের একটি স্বর্ণযুগ, একটি সম্পূর্ণ সংগীত-অধ্যায়। কালের প্রবাহে যা এখনো ফলগু নদীর মত প্রবাহিত হয়ে চলেছে। ১৯৯৩ সালে একদিনে ২৮টি গান রেকর্ডের অবিস্মরণীয় বিশ্বরেকর্ড কিংবা ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪-টানা পাঁচ বছর ফিল্মফেয়ার জয়ের যে ইতিহাস তিনি একাই রচনা করেছেন, তা শুধু সংগীতের নিরিখে নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসেও এক অনন্য নজির। কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার গান গাওয়া এবং এক বছরে রেকর্ড সংখ্যক ১,১৬১টি গান বিভিন্ন ভাষায় উপহার দেওয়া এই শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। অথচ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সংগীত জগতকে সমৃদ্ধ করার পর, অগণিত কালজয়ী গান উপহার দেওয়ার পরও এই জীবন্ত কিংবদন্তির নামের পাশে ভারতের সর্বোচ্চ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (National Film Award)-টি আজীবন ব্রাত্য থেকে গেছে। ভারত গৌরব রত্ন তো দূরের কাল।
আজ কোনো রাখঢাক না রেখে স্পষ্ট ভাষায় বলার সময় এসেছে – কুমার শানু জাতীয় পুরস্কার ডিজার্ভ করতেন কি না, সেই বিতর্ক বহু আগেই অর্থহীন হয়ে গেছে। আমার মনে হয় প্রশ্নটা শুধু কুমার শানু জাতীয় পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন কিনা তা নয় বরং এত বড় একজন শিল্পীর নাম জাতীয় পুরস্কারের ইতিহাসে থাকা উচিত ছিল কিনা সেই প্রশ্নই আজ বড়।এই স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি তাই শুধু একজন শিল্পীর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির প্রশ্ন নয় ভারতীয় সংগীতকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করি, সেই প্রশ্নইও এখানে এসে যায় ।ইতিহাস বিচারকদের এই চরম দীনতাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না।

 

তথ্যের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কিছু জ্বলন্ত সত্য
‘আশিকি’ (১৯৯০)-র ‘নজর কে সামনে’, ‘সাজন’ (১৯৯১)-এর ‘মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়’, ‘দিওয়ানা’ (১৯৯২)-র ‘সোচেঙ্গে তুমহে প্যায়ার’, ‘বাজিগর’ (১৯৯৩)-এর ‘ইয়ে কালি কালি আঁখেন’ থেকে শুরু করে ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’-র ‘তুঝে দেখা তো’, কিংবা ‘পরদেশ’-এর ‘মেরি মেহবুবা’, এছাড়াও ‘জিন্দেগি কি তালাশ মে হাম’, ‘জব কই বাত বিগড় যায়ে’-আরও বহু অগুনতি গান ভারতীয় সিনেমার মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেগুলোকে কি লঘু করে দেখার কোনো উপায় আছে?
বিশেষ করে আর. ডি. বর্মণের শেষ মাস্টারপিস ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’ (১৯৯৪)-র কথাই ধরা যাক। ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লগা’ কিংবা ‘কুছ না কহো’-র মতো গানে যে স্নিগ্ধতা, যে নিঃশব্দ আর্তি আর ক্লাসিক্যাল আভিজাত্য শানু ফুটিয়ে তুলেছিলেন,
এই গানগুলোর আবেদন আজও কমেনি ,বরং সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর মূল্য আরো স্পষ্ট হয়েছে। যা সোশ্যাল মিডিয়ার জড়িয়তে ভারতীয় সংগীতের পাঠ্যক্রমে পরিণত হয়েছে। সেই অমর সৃষ্টির পরও যদি একজন গায়কের হাতে জাতীয় পুরস্কার না ওঠে, তবে বুঝতে হবে খামতি শিল্পীর সুরে ছিল না, বিচারকদের সততা ও মানদণ্ডেই চরম গলদ ছিল।
শুধু তাই নয়, বাংলা ফিল্ম জগতেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ‘তিনকাঠি’ (১৯৮৬), ‘অমর সঙ্গী’ (১৯৮৭)-যে সিনেমাটি টলিউডের ইতিহাসে একটি মাইলফলক, যেখানে কিশোর কুমার ও কুমার শানু দুজনেই গান গেয়েছেন।

 

এছাড়া ‘অনুতাপ’ (১৯৯২), ‘বাবা কেন চাকর’ (১৯৯৮), ‘শশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ (২০০০) এর ‘চোখ তুলে দেখনা কে এসেছে’, এছাড়াও বিভিন্ন অ্যালবামে বাংলা আধুনিক গান থেকে শুরু করে শ্যামা সংগীত, গজল এবং রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম-সব মাধ্যমেই তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এত বৈচিত্র্য, এত বিপুল অবদান কি জুরিবোর্ডের কানে পৌঁছায়নি?

নাকি ক্ষমতাবানদের অদৃশ্য সমীকরণে বিচারকদের চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল?
২০০৯ সালে একটি ‘পদ্মশ্রী’ দিয়েই রাষ্ট্র যেন দায়সারাভাবে হাত ধুয়ে ফেলল। অথচ শানুর চেয়ে বয়সে কনিষ্ঠ বা সংগীতের সামগ্রিক অবদানে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা অনেকেই আবার নানা যোগাযোগ ও প্রভাবের মাধ্যমে বড় বড় সম্মান পেয়েছেন এমন অভিযোগও কম শোনা যায় না।এভাবেই অনেকের ঝুলিতে আজ ‘পদ্মভূষণ’। কুমার শানু কোনোদিন ক্ষমতার করিডোরে গিয়ে তোষামোদ বা তেলমর্দন করেননি। পুরস্কারের লোভে নিজের ব্যক্তিত্ব বা শিল্পসত্তাকে বিকিয়ে দেননি বলেই হয়তো তাঁর ভাগ্যে সরকারি সিলমোহর জোটেনি।

 

মেরুদণ্ড সোজা রেখে, কোনো নোংরা সমীকরণের কাছে মাথা নত না করে একচ্ছত্র রাজত্ব করার নামই কুমার শানু। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও তার কণ্ঠের নিজস্বতা হারিয়ে যায়নি ।কিন্তু যোগ্য শিল্পীকে তাঁর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে রাষ্ট্র আসলে নিজের সংকীর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট আর মেরুদণ্ডহীন রূপটিকেই উন্মোচিত করেছে। সংগীতের প্রতি এই অবিচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা।
সরকারি মেডেল বা কাঁচের শোকেসের ট্রফি দিয়ে কোনো শিল্পীর অমরত্ব মাপা যায় না। ট্রফি হয়তো সময়ের নিয়মে শোকেসে ধূসর হয়ে যেত, কিন্তু শানুদার গান বেঁচে আছে ট্যাক্সি চালকের ক্যাসেট প্লেয়ারে, মধ্যবিত্তের প্রথম প্রেমের গোপন চিঠিতে, মাঝরাতে চোখ ভেজা কোনো নিঃসঙ্গ মানুষের হেডফোনে আর অগণিত সংগীতপ্রেমীর প্রতিদিনের নিশ্বাসে। রাষ্ট্র যাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে, মহাকাল এবং কোটি কোটি সাধারণ শ্রোতা তাঁকে হৃদয়ের স্থায়ী সিংহাসনে বসিয়ে রেখেছে। জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় কুমার শানুর নাম না থাকাটা শানুদার ক্ষতি নয়, তা স্বয়ং জাতীয় পুরস্কারেরই এক অপূরণীয় কলঙ্ক ও চিরকালীন দৈন্য দশার পরিচয়।

 

আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা শানুর গান নিয়ে ইউটিউব খুলেছেন, রিলস বানাচ্ছেন ও অর্থ উপার্জন করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে প্রশ্ন-মৃত্যুর পর মানুষকে সম্মান দেওয়ার চেয়ে বেঁচে থাকতে সম্মান দেওয়াটা কি বেশি জরুরি নয়? আসুন, আমরা সবাই মিলে সরব হই এবং জোরালো কণ্ঠে জানতে চায়- কুমার শানু তুমি এখন কার… বাংলার, ভারতের, না মহাভারতবর্ষের…
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর কোন পুরস্কারের তালিকাই নেই। উত্তর আছে সেই কোটি কোটি মানুষের মনে যারা এখনো তার গান শুনছেন , রিলস তৈরি করছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় দিচ্ছেন। তাঁদের হৃদয়ে সেই অর্থে কুমার শানু সময়ের এক অলিখিত ভারতরত্ন।