দূরবিনের চোখে আধুনিকতা: একবিংশ শতাব্দীতে স্যার সৈয়দ আহমদ খান

ড.নুরুল ইসলাম বাবুল ১৮৫৭-র পরের ভারত। দিল্লির আকাশ থেকে বারুদের ধোঁয়া হয়তো সরে গিয়েছিল, কিন্তু বাতাসে তখনও পরাজয়ের গন্ধ। মুঘল সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট গৌরব ভেঙে পড়েছে। পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে ভেঙে পড়েছে....

ড.নুরুল ইসলাম বাবুল

১৮৫৭-র পরের ভারত। দিল্লির আকাশ থেকে বারুদের ধোঁয়া হয়তো সরে গিয়েছিল, কিন্তু বাতাসে তখনও পরাজয়ের গন্ধ। মুঘল সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট গৌরব ভেঙে পড়েছে। পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে ভেঙে পড়েছে একটি সমাজের আত্মবিশ্বাসও। ইতিহাসের সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে এক মানুষ বুঝতে চাইছিলেন, কেন একটি সভ্যতা তার অতীতের গৌরব নিয়েও বর্তমানের কাছে পরাজিত হয়। তাঁর নাম সৈয়দ আহমদ খান, যিনি পরবর্তী কালে পরিচিত হবেন স্যার সৈয়দ নামে। দিল্লির সেই ভগ্নপ্রায় সময় থেকে আজকের সমাজমাধ্যমের যুগে এসে দৃশ্যপট বদলেছে।

 

হাতে তরবারির বদলে এসেছে স্মার্টফোন, রাজদরবারের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল জনপরিসর। অথচ প্রশ্নের চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। আজও ইতিহাসের মানুষদের নিয়ে আমাদের বিচার প্রায়ই দুই মেরুতে বিভক্ত। কেউ স্যার সৈয়দকে ব্রিটিশ শাসনের অনুগত অভিজাত বলে বাতিল করেন, কেউ তাঁকে মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষার একক স্থপতি হিসেবে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যে তাঁর রাজনৈতিক দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ইতিহাসের মানুষকে এভাবে ভাগ করে নেওয়া সহজ; তাঁকে বোঝার জন্য যে ধৈর্য, তা অনেক বেশি দুর্লভ।

 

স্যার সৈয়দের জীবন বোঝার জন্য ১৮৫৭-র বিদ্রোহের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধান করে তিনি লেখেন আসবাব-এ-বাগাওয়াত-এ-হিন্দ, অর্থাৎ ভারতীয় বিদ্রোহের কারণ। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত এই রচনায় তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের নীতি ও শাসনব্যবস্থার ত্রুটিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শাসকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কৌশল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি দিক ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বাস্তবতার মধ্যেও প্রশাসনিক অন্যায় ও নীতিগত ব্যর্থতার সমালোচনা করার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন। তাঁকে নিছক ব্রিটিশদের স্তাবক বললে এই ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার তাঁর ব্রিটিশ-অনুগত অবস্থানকে আড়াল করলেও সত্যের প্রতি অবিচার করা হয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত ছিল শিক্ষার প্রশ্নে।

 

তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত কোনো সমাজ দীর্ঘকাল আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে পারে না। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সায়েন্টিফিক সোসাইটির মাধ্যমে তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের বই উর্দুতে অনুবাদের উদ্যোগ নেন। ১৮৭০ সালে প্রকাশ শুরু হয় তহজিব-উল-আখলাক পত্রিকার। সেখানে তিনি সামাজিক সংস্কার, যুক্তিবাদ, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রচলিত আচার নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর কাছে আধুনিকতা ছিল না নিজের শিকড় উপড়ে ফেলার নাম; বরং নিজের ঐতিহ্যকে প্রশ্ন করার, বোঝার এবং নতুন জ্ঞানের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষমতা। এই জায়গাতেই স্যার সৈয়দকে একজন শিক্ষাসংস্কারকের চেয়ে বড় করে দেখতে হয়। তিনি জ্ঞানের দরজা খুলতে চেয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণকে অনেকেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিপদের সঙ্গে এক করে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ধর্মবিশ্বাস ও যুক্তিবোধকে পরস্পরের শত্রু করে তোলা অনাবশ্যক। কিন্তু এই অবস্থানের জন্য তাঁকে রক্ষণশীল মহলের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। তাঁর সংস্কারচিন্তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি; নিজের সমাজের ভেতরেও তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি উঠেছিল।

 

১৮৭৫ সালে আলিগড়ে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়, তা পরে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজে পরিণত হয়। ১৯২০ সালে সেই প্রতিষ্ঠানই আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। এই রূপান্তরের মধ্যে রয়েছে একটি দীর্ঘ শিক্ষাপ্রকল্পের ইতিহাস। স্যার সৈয়দের লক্ষ্য ছিল এমন একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলা, যে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হবে, আবার নিজের ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কেও সচেতন থাকবে। তাঁর উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই: তিনি শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন সামাজিক পুনর্গঠনের উপায় হিসেবে।

 

তবে ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে গেলে এখানেই থেমে থাকা চলে না। স্যার সৈয়দের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন এসেছিল। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ ভারতীয় পরিচয়ের পক্ষে কথা বলেছেন। ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি গুরুদাসপুরের ভাষণে তিনি দুই সম্প্রদায়ের অভিন্ন দেশজীবন ও পারস্পরিক নির্ভরতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাদের সামাজিক ও নাগরিক স্বার্থ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

 

কিন্তু পরবর্তী সময়ে হিন্দি-উর্দু বিতর্ক, মুসলমানদের শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কর্মসূচির প্রতি তাঁর আপত্তি তাঁকে অন্য অবস্থানে নিয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে মুসলমানদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষিত হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সংশয় বাড়ে। তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতা করেন এবং মুসলমানদের স্বতন্ত্র শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর এই অবস্থান পরবর্তী মুসলিম রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। তবে তাঁকে সরাসরি দ্বিজাতিতত্ত্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠাতা বলে চিহ্নিত করা ইতিহাসের বহুস্তরীয় বিকাশকে একটি সরল সূত্রে নামিয়ে আনা। তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা, সম্প্রদায়গত নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতার সঙ্গে আপসের প্রবণতা—এই তিনের জটিল সহাবস্থান। তাঁর এই দ্বিধাই তাঁকে ইতিহাসের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।

 

কারণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানুষরা সব সময় নিজেদের সময়ের সমস্ত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেন না। তাঁরা কখনো ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেন, কখনো সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়েই নিজেদের আশঙ্কার কাছে আটকে যান। স্যার সৈয়দ আধুনিক শিক্ষার পক্ষে যে প্রতিষ্ঠান ও বৌদ্ধিক পরিসর তৈরি করেছিলেন, তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাঁর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করতে গিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান মুছে ফেলারও কোনো যুক্তি নেই।

 

আজকের ভারতবর্ষে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। সমাজমাধ্যমে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে তথ্যের চেয়ে পরিচয়, গবেষণার চেয়ে স্লোগান, আর যুক্তির চেয়ে ক্ষোভ অনেক সময় বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস তখন অনুসন্ধানের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে নিজেদের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসের পক্ষে সাক্ষী জোগাড় করার উপকরণ। স্যার সৈয়দকে নিয়েও সেই প্রবণতা দেখা যায়। তাঁকে একদিকে নিখুঁত আধুনিকতার প্রতীক, অন্যদিকে সম্প্রদায়গত বিভাজনের একমাত্র উৎস হিসেবে দেখার মধ্যে একই ধরনের সরলীকরণ কাজ করে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়, শিক্ষার সবচেয়ে বড় কাজ তথ্য মুখস্থ করানো নয়; বরং তথ্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে শেখানো। কোনো মানুষকে ভালোবাসি বলে তাঁর ভুলকে আড়াল করব, কিংবা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অপছন্দ করি বলে তাঁর অবদান অস্বীকার করব—এই দুই প্রবণতাই জ্ঞানচর্চার পরিপন্থী।

 

স্যার সৈয়দের জীবন আমাদের শেখায়, আধুনিকতা কোনো প্রস্তুত মতবাদ নয়। তা হলো প্রশ্ন করার সাহস, নতুন জ্ঞান গ্রহণের মানসিকতা এবং নিজের সমাজের অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা। স্যার সৈয়দের হাতে দূরবিন ছিল কি না, তা ইতিহাসের তথ্য নয়; দূরবিনের রূপকটি আমাদের। সেই দূরবিন দিয়ে তিনি নিজের সময়ের অন্ধকারের ওপারে শিক্ষার সম্ভাবনা দেখতে চেয়েছিলেন। আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন, আমরা কি সেই দূরদৃষ্টি উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছি, নাকি অতীতের ছাইভস্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে ভবিষ্যতের আলোটুকুই হারিয়ে ফেলছি?