হিরো নয়, অভিনেতা হও’! নানার শেষ কথায় আবেগঘন শাহরুখ, স্মৃতিতে সেই অদ্ভুত বন্ধুত্ব

পর্দায় নানা পাটেকার ছিলেন তীব্র, স্পষ্টবাদী এবং আপসহীন। ব্যক্তিজীবনেও তাঁর স্বভাবটা খুব একটা আলাদা ছিল না। ভালবাসা দেখাতেন নিজের মতো করে, প্রশংসা করার বদলে ভুল ধরিয়ে দিতেন, আর স্নেহের প্রকাশও....

পর্দায় নানা পাটেকার ছিলেন তীব্র, স্পষ্টবাদী এবং আপসহীন। ব্যক্তিজীবনেও তাঁর স্বভাবটা খুব একটা আলাদা ছিল না। ভালবাসা দেখাতেন নিজের মতো করে, প্রশংসা করার বদলে ভুল ধরিয়ে দিতেন, আর স্নেহের প্রকাশও অনেক সময় আসত বকুনির আড়ালে। সেই নানাকেই এবার স্মরণ করলেন শাহরুখ খান। নানার প্রয়াণে কিং খানের স্মৃতিচারণে উঠে এল তাঁদের সম্পর্কের একেবারে ব্যক্তিগত, অকৃত্রিম ছবি।

নানার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার কথা মনে পড়ছে শাহরুখের। সেই সময় শ্রদ্ধা আর খানিকটা অস্বস্তিতে নিজের চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন তিনি। বিষয়টি দেখে এক মুহূর্তও নরম হননি নানা। শাহরুখের হাত সরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নায়ক হওয়ার বাহ্যিক চেষ্টার চেয়ে অভিনেতা হয়ে ওঠাটাই আসল। সেই ছোট্ট ঘটনাটাই পরবর্তীকালে শাহরুখের কাছে হয়ে উঠেছিল নানার ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয়।

 

শাহরুখের কথায়, নানা কখনও কাউকে খুশি করার জন্য কথা বলতেন না। যা শুনতে ভাল লাগবে, তা নয়, বরং যা শোনা দরকার, সেটাই বলতেন। তাঁর সেই সোজাসাপ্টা স্বভাবের মধ্যে কোনও কূটনীতি ছিল না। কথাবার্তা হয়তো রুক্ষ, আচরণ হয়তো কঠিন, কিন্তু সেই কঠিন আবরণের ভিতরে ছিল অসাধারণ মায়া। আর সেই মায়ার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ছিল তাঁর হাসি।

 

নানার ভালবাসার ধরনটাও ছিল বেশ অদ্ভুত। কাউকে আগে ধমক দেবেন, হয়তো কয়েক দফা বকবেন, তারপর কখন যে সেই বকুনির মাঝেই জড়িয়ে ধরেছেন, তা বুঝতেই সময় লাগত। শাহরুখের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও এমনই ছিল। বকুনি ছিল, মতের অমিল ছিল, তর্ক ছিল, কিন্তু তার ভিতর দিয়েই তৈরি হয়েছিল গভীর ভালবাসা। শাহরুখও জানিয়েছেন, নানাকে তিনি যেমন ভালবাসতেন, নানা তাঁকেও তেমনই আপন করে নিয়েছিলেন।

 

 

শুধু সহকর্মী নন, শাহরুখের কাছে নানা ছিলেন একই সঙ্গে শিক্ষক, পরামর্শদাতা, কঠিন সমালোচক এবং বন্ধু। অভিনয় নিয়ে তাঁর কাছ থেকে শেখার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও নানার উপস্থিতি ছিল বিশেষ। আর সেই সম্পর্কের আরও একটি মজার দিক ছিল ক্যারম। শাহরুখের স্মৃতিতে, ক্যারম বোর্ডে নানা ছিলেন ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী। একের পর এক ম্যাচ জিতে নিজের জয় উপভোগ করতেন তিনি। সেই খুনসুটি, প্রতিযোগিতা এবং হাসির মুহূর্তগুলোই আজ আরও বেশি করে মনে পড়ছে শাহরুখের।

নানার চলে যাওয়াকে তাই শুধু একজন সহ-অভিনেতার মৃত্যু হিসেবে দেখছেন না শাহরুখ। তাঁর কাছে এই চলে যাওয়া ব্যক্তিগত ক্ষতি। মনে হচ্ছে, আরও কথা বলা যেত, আরও একটি তর্ক হতে পারত, একসঙ্গে বসে আরও এক কাপ চা খাওয়া যেত। আর হতে পারত আরও একটি ক্যারমের ম্যাচ।

 

 

শাহরুখের স্মৃতিতে নানা শুধু সিনেমার এক অসামান্য অভিনেতা নন, তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর তীব্রতা, উন্মাদনা, হাসি এবং ভালবাসা দীর্ঘদিন থেকে যাবে। তাঁর চলে যাওয়ায় ভারতীয় সিনেমায় যে শূন্যতা তৈরি হল, তা কোনও একটি ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছড়িয়ে ছিল দেশজুড়ে, এমনকি দেশের বাইরেও।

তবে নানাকে নিয়ে শাহরুখের শেষ অনুভূতিটা আরও ব্যক্তিগত। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা, সেই বকুনি, সেই কঠিন অথচ স্নেহমাখা কথাগুলো তিনি নিজের ভিতরে বয়ে নিয়ে চলবেন। তার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ফিরে আসবে সেই পুরনো সতর্কবার্তা, তারকা হওয়ার তাড়ায় যেন অভিনেতা সত্তাটাই হারিয়ে না যায়।

 

 

শেষে তাই নানার জন্য শাহরুখের প্রার্থনা, তাঁর আত্মা শান্তিতে থাকুক। ঈশ্বর তাঁকে আপন করে নিন। আর স্বর্গে পৌঁছেও যেন তিনি একই রকম থাকেন, দুর্দান্ত অভিনেতা, কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ক্যারম বোর্ডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়ন। খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলেন নানা। কিন্তু যে মানুষটি অন্যকে ‘অভিনেতা হয়ে ওঠার’ পাঠ দিয়েছিলেন, তাঁর সেই শিক্ষা আর স্মৃতি থেকে যাবে আরও বহুদিন।

শাহরুখের পোস্টে এই ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলিই মূল আবেগ, এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর সেই দীর্ঘ শ্রদ্ধার্ঘ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নানার প্রয়াণে ৭৫ বছর বয়সে ভারতীয় সিনেমা এক অত্যন্ত স্বতন্ত্র অভিনেতাকে হারাল।