সোনা বন্দ্যোপাধ্যায়
১০-১২ বছর আগের কথা, সে-সময়ে একটি বাস টার্মিনাসে প্রায়ই যেতাম। দেখতাম যে, প্রতিটা ট্রিপ শেষ করে ড্রাইভার, কন্ডাকটররা সবাই বাস থেকে নেমে, তাঁদের বিশ্রাম করার জায়গায় গিয়ে হাত, মুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে চা, বিস্কুট খেয়ে ক্লান্তি মিটিয়ে হালকা বিশ্রাম নিতেন। এই সময় অনেকেই হালকা মেজাজে নানা রাজনৈতিক আলোচনা অথবা দেশ, বিদেশের ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার চর্চায় মেতে উঠতেন। এটা শুধু এই বাস টার্মিনাসই নয়, আমাদের দেশের সব টার্মিনাসেরই সাধারণ ছবি। কিন্তু তার মধ্যেও একজন লম্বা চেহারার ড্রাইভারকে দেখতাম যে, একাধিক পত্রিকা নাড়াচাড়া করে, যে কোনও একটি পত্রিকার পাতা খুলে খুব মন দিয়ে পড়ছেন।
এরপর কালের নিয়মেই ১০-১২টা বছর পার হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ সেদিন অন্য কোনও একটি বাস টার্মিনাসে গিয়ে ওই লম্বা চেহারার ড্রাইভার সাহেবকে দেখতে পেলাম। চেহারা ও মুখে-চোখে বয়সের ছাপ পড়েছে কিন্তু মানসিকতায় তাঁকে বৃদ্ধ করতে পারেনি। দেখলাম, আজও তিনি একটা ফাঁকা জায়গায় বসে একটি পত্রিকা পড়ে চলেছেন। আর থাকতে পারলাম না।
কাছে গিয়ে আলাপ করে জানলাম যে, তাঁর নাম ‘কুতুব আহমেদ’, বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বন্দিপুর, মোড়লপাড়া। শুনলাম, বয়সের ভারে এখন আর তিনি বাস চালাতে পারেন না কিন্তু সংসারের প্রয়োজনে এখনও তাঁর কিছুটা অর্থোপার্জন দরকার। তাই এই টার্মিনাসে এখন তিনি স্টার্টার হিসাবে কাজ করেন। বাস চালানোর তুলনায় এটা অনেক হালকা কাজ। কিন্তু বই পড়ার নেশা তাঁর এখনও যায়নি। আমার জীবনে এইরকম উঁচুদরের মানসিকতার ড্রাইভার এবং কন্ডাকটর দক্ষিণ ভারতে তামিলনাডূর কোয়েম্বাটুর, কেরালার পল্লকড ইত্যাদি শহরে চোখে পড়লেও বাংলা তথা উত্তর ভারতের কোথাও নজরে আসেনি।
আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী কী বা কী ধরনের বই এখনও আপনি পড়েন?” যে উত্তরটা পেলাম, তাতে অবাক না হয়ে পারলাম না। কুতুব সাহেব বললেন, “আগে তো নামী, অনামী মিলিয়ে অনেক পত্রিকাই পড়তাম কিন্তু এখন আর অনেক পত্রিকা পড়তে পারি না। তবে একটা পত্রিকা এখনও নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছি, ওটা না পড়ে পারি না, সেটা হল ‘উদার আকাশ’। বয়সের ভারে বেশি বই পড়তে পারি না কিন্তু উদার আকাশ না পড়লে মনের মধ্যে যেন একটা অপূর্ণতা রয়ে যায়। আজ থেকে অনেক বছর আগে পত্রিকাটির জন্মলগ্ন থেকেই আমার এই অভ্যাস, যা এখনও ধরে রেখেছি।”
অল্প কিছূদিন হল, ’উদার আকাশ’ পত্রিকা ২৫ বছর পূর্ণ করল। এবারের সংখ্যা এখনও হাতে আসেনি।
কিন্তু ২০২১ সালে ২০ বছর পূর্তির সময় শিল্পী ‘সারফুদ্দিন আহমেদ’ এই পত্রিকার প্রচ্ছদে বাঁশি হাতে ও ধুতি পরা এক সনাতন ও সরল ভারতীয় গ্রাম্য যুবকের যে ছবি এঁকেছিলেন, আজও তা পাঠকের মনকে নাড়া দিয়ে যায়। বেশ আবেগপ্রবণ স্বরে কুতুবভাই জানালেন যে, সেই সংখ্যার সব ক’টি গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতাই ছিল রীতিমতো উঁচু মানের, যা বৃদ্ধ কুতুব আহমেদকে আজও আকর্ষণ করে। এবারের সংখ্যাটি উদ্বোধনের প্রাক্কালে বাস টার্মিনাসের এই ঘটনাটা চোখে পড়ল। এটা নিঃসন্দেহে উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক এবং পত্রিকা গোষ্ঠীর সকল সদস্যদের কাছে এক চরম আনন্দের। পরিবহন কর্মী কুতুব আহমেদ সাহেব আমাদের চোখে পড়লেন বলে এটা জানতে পারলাম কিন্তু এই রকম হয়তো আরও একাধিক কুতুব আহমেদ আছেন, যাঁদের কথা আমরা জানতে পারি না।
স্মার্টফোন আর টিভি সিরিয়ালের সর্বগ্রাসী নেশা যখন একের পর এক আমাদের বহু সনাতন ঐতিহ্য ও সুন্দর অভ্যাসকে নষ্ট করে দিয়ে সমাজকে রুক্ষ, শুষ্ক করে দিচ্ছে, তখন কুতুব আহমেদের মতো ব্যক্তিরা অবশ্যই সমাজের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বলাই বাহুল্য যে, এর জন্য ভীষণভাবে দায়ী ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা, যা অদম্য গতিতে এত বছর ধরে এগিয়ে চলেছে। আর, চরম কৃতিত্বের দাবি রাখেন এই পত্রিকার সফল ও উদ্যমী সম্পাদক ফারুক আহমেদ, যাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও শ্রমের ওপর ভিত্তি করে পত্রিকাটি এইভাবে তার জয়যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে।