শামসুল তালুকদার
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকতার সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। বরং গত একশো থেকে দুশো বছরের সাংবাদিকতার ইতিহাস মূলত প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ারই ইতিহাস। হাতে লেখা সংবাদ থেকে টাইপরাইটার, টেলিগ্রাফ থেকে টেলিফোন, ছাপাখানা থেকে রেডিও ও টেলিভিশন, এরপর কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই সাংবাদিকতার প্রচলিত কাঠামোকে বদলে দিয়েছে।
বদলেছে সংবাদ সংগ্রহের পদ্ধতি, প্রকাশের মাধ্যম, সংবাদকর্মীর ভূমিকা এবং সবচেয়ে বড় কথা, পাঠকের আচরণ। প্রতিটি পরিবর্তনের সময়ই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: পুরোনো পদ্ধতির কী হবে? কিছু কাজ অবশ্যই কমেছে, কিছু পেশা বিলুপ্ত হয়েছে, আবার নতুন ধরনের কাজ ও দক্ষতার জন্ম হয়েছে। সাংবাদিকতাও এর ব্যতিক্রম নয়।আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি আরও বড় একটি পরিবর্তনের সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর যুগে।
এই পরিবর্তন আগের অনেক প্রযুক্তিগত বিপ্লবের তুলনায় গভীর, কারণ এবার প্রযুক্তি শুধু মানুষের কাজের গতি বাড়াচ্ছে না; এটি এমন কিছু কাজও করতে পারছে, যেগুলো একসময় কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হতো।খবরের সারাংশ তৈরি করা, তথ্য বিশ্লেষণ, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন, ডেটা বিশ্লেষণ, এমনকি প্রাথমিক সংবাদ প্রতিবেদন তৈরির মতো কাজ এখন AI করতে পারে।
ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, একসময় কি সাংবাদিকের প্রয়োজনই থাকবে না?আমার বিশ্বাস, উত্তরটি এতটা সরল নয়।কারণ সাংবাদিকতা কেবল তথ্য লিখে প্রকাশ করার নাম নয়। সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো সত্য অনুসন্ধান, প্রশ্ন করা, প্রেক্ষাপট বোঝা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা এবং ক্ষমতাবানকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।
একটি AI কয়েক সেকেন্ডে হাজার হাজার তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি বিভ্রান্তিকর, কোন ঘটনার পেছনে মানুষের কী অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং কোন প্রশ্নটি সমাজের সামনে তোলা দরকার, এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানবিক বিচারবোধ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বরং AI সাংবাদিকতার কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমিয়ে একজন সাংবাদিককে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
একজন সাংবাদিক যদি প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তাঁর কাজের মান ও পরিধি দুটোই বাড়তে পারে।তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কতদূর যাবে? যেকোনো প্রযুক্তিই মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু প্রযুক্তি তৈরি করার পর সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং এর সামাজিক প্রভাব কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রযুক্তিবিদদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হবে। যারা AI ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি তৈরি করছেন, তাদের ভাবতে হবে উদ্ভাবনের সীমা কোথায়। একই সঙ্গে সরকার, নীতিনির্ধারক এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিশ্চিত করতে হবে যে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানুষের অধিকার, গোপনীয়তা, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্র এবং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।এখানে নিয়ন্ত্রণ মানে প্রযুক্তিকে থামিয়ে দেওয়া নয়।
বরং সঠিক নিয়ম, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারযোগ্য রাখা।ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।শিল্পবিপ্লব মানুষের অনেক কাজ বদলে দিয়েছিল। কম্পিউটার অফিসের কাজের ধরন বদলে দিয়েছিল। ইন্টারনেট সংবাদমাধ্যমের পুরোনো ব্যবসায়িক মডেলকে প্রায় আমূল পরিবর্তন করেছে। কিন্তু মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। মানুষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
AI-এর ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ঘটনা ঘটবে।হয়তো আগামী দিনে একজন সাংবাদিককে আগের মতো একই ধরনের কাজ করতে হবে না। হয়তো একটি সংবাদকক্ষে আগের তুলনায় কম মানুষ থাকবে, কিন্তু যারা থাকবে তাদের দক্ষতা, বিচারবোধ, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা এবং অনুসন্ধানী সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বাড়বে। সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ হয়তো মানুষ বনাম AI নয়; বরং মানুষ ও AI-এর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা।তবে এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রযুক্তি নিজে নয়।
ঝুঁকি হলো প্রযুক্তিকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।ভুয়া তথ্য তৈরি, deepfake, স্বয়ংক্রিয় প্রচারণা, পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদম এবং মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ভবিষ্যতের সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষ করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই ভবিষ্যতের সাংবাদিককে শুধু লেখার দক্ষতা থাকলেই চলবে না; তাঁকে প্রযুক্তি বুঝতে হবে, ডেটা বুঝতে হবে এবং AI-generated তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
অন্যদিকে, পাঠকদেরও পরিবর্তন হতে হবে। দ্রুত তথ্য পাওয়া আর সঠিক তথ্য পাওয়া এক জিনিস নয়। AI যত দ্রুত তথ্য তৈরি করবে, মানুষের দায়িত্ব তত বেশি হবে তথ্য যাচাই করার।তাই, “AI-এর যুগে মানবিক মূল্য কমবে” এই ধারণাকে আমি ভবিষ্যতের একমাত্র সম্ভাব্য চিত্র হিসেবে দেখি না। আমার কাছে এটি মানুষের জন্য আরেকটি অভিযোজনের অধ্যায়।
মানুষের ইতিহাস আসলে পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ইতিহাস। প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এনেছে।আমরা সেই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়েছি, কিছু হারিয়েছি, অনেক কিছু নতুন করে শিখেছি এবং শেষ পর্যন্ত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি। AI-ও তার ব্যতিক্রম হবে না।প্রশ্নটা তাই AI মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে কি না, শুধু এটুকু নয়। আসল প্রশ্ন হলো; মানুষ AI-কে কীভাবে ব্যবহার করবে?
প্রযুক্তি নির্মাতারা কতটা দায়িত্বশীল থাকবেন এবং সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা কতটা সময়োপযোগী ও ন্যায়সংগত কাঠামো তৈরি করতে পারবেন?প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার চেয়ে প্রযুক্তিকে বোঝা জরুরি। পরিবর্তনকে ঠেকানোর চেয়ে পরিবর্তনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা জরুরি।সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎও সম্ভবত সেখানেই। AI হয়তো সংবাদ লিখবে।
কিন্তু কোন সংবাদটি সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রশ্নটি ক্ষমতার সামনে রাখা প্রয়োজন এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস সেটি এখনও মানুষেরই দায়িত্ব।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবতার মূল্য নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি নয়; মানুষ নিজেই।