নেপালের সাম্প্রতিক বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় আরও এক বার প্রমাণ করে দিয়েছে যে হিমালয় অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি কতটা ভঙ্গুর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তা কতখানি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এই ক্ষত সতেজ থাকাকালীনই তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে যা ব্রহ্মপুত্র) নদীর উপর চিনের এক মহাপ্রাচীর-সদৃশ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ ও ভূরাজনীতিতে এক নতুন বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। তিব্বতের ‘গ্রেট বেন্ড’ এলাকায় প্রস্তাবিত এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে তা হবে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ, যা বেজিংয়ের ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধের চেয়েও তিন গুণ বেশি শক্তিশালী বলে চিনের দাবি। কিন্তু এই তথাকথিত উন্নয়ন হিমালয়ের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র এবং নিম্ন অববাহিকার দেশ ভারতের জন্য এক মহাবিপর্যয়ের সঙ্কেত বহন করছে।
তিব্বতের এই ভঙ্গুর ও তরুণ অঞ্চলটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ— এই সত্যটি উপেক্ষা করার উপায় নেই। এখানে বিপুল পরিমাণ জলরাশি আটকে রাখার অর্থ হল ‘রিজ়ার্ভার-ইনডিউসড সিসমিসিটি’ বা জলাধার-প্ররোচিত ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এর সঙ্গে রয়েছে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট হিমবাহজাত হ্রদ ফেটে বন্যা (জিএলওএফ)-র ঝুঁকিও। কোনও কারণে এই বৃহৎ বাঁধটির অবক্ষয় ঘটলে, নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত ভারত ও বাংলাদেশে একটি প্রলয়কারী জলপ্রবাহের সৃষ্টি হবে। অন্য দিকে, অসম ও অরুণাচল প্রদেশের প্রাণপ্রবাহ হল ব্রহ্মপুত্র নদ। চিনের এই বাঁধের কারণে শুষ্ক ঋতুতে ভারতে জলপ্রবাহ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যাবে, যা এই অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। তা ছাড়া, ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিই অসমের উর্বর উপত্যকার মূল ভিত্তি। বাঁধের ফলে পলি আটকে গেলে নদীর অববাহিকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হবে। আশঙ্কা রয়েছে আরও, বিশেষত সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে। চিন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে জলকে ‘হাতিয়ার’ বানাতে পারে। সংঘাত বা উত্তেজনার সুযোগে তারা যদি একতরফা ভাবে জল আটকে রাখে কিংবা বর্ষায় অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেয়, তবে গভীর সঙ্কট হতে পারে।
এই ‘জল-অস্ত্র’র মোকাবিলায় ভারত সরকার অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীতে ১১,০০০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যা মূলত চিনের ছেড়ে দেওয়া জলকে ধরে রাখার কাজ করবে। কিন্তু ‘বাঁধের বদলে বাঁধ’— এই নীতি কি আদৌ কোনও স্থায়ী সমাধান? সিয়াং নদীতে ভারতের এই বৃহৎ বাঁধ প্রকল্প উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। প্রথমত, এই অঞ্চলের অনন্য জীববৈচিত্র প্রভাবিত হবে। দ্বিতীয়ত, ভিটেমাটি হারিয়ে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী উচ্ছেদের শিকার হলে তীব্র সামাজিক অসন্তোষ দেখা দেবে। সর্বোপরি, নদী অববাহিকার পলিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অসমের উর্বর কৃষি ব্যবস্থাই শুধু বিপর্যস্ত হবে না, মাজুলি নদীদ্বীপও চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে। নদী কোনও রাজনৈতিক সীমানা মানে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন চিনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদী চুক্তি এবং যৌথ পরিবেশগত সমীক্ষা। উন্নয়ন যদি পরিবেশকে ধ্বংস করে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ ছাড়া কিছুই নয়।