উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক ডিসকোর্সে যখন প্রথাগত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং ঐতিহ্যের রোমান্টিকীকরণকে একাকার করে দেখা হয়, তখন সত্যজিত রায়ের ১৯৬০ সালের মাস্টারপিস ‘দেবী’ চলচ্চিত্রটি এক গভীর অন্তর্দৃষ্টির জানালা খুলে দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি কেবল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ প্রতিবাদ নয়; বরং এটি হলো পিতৃতান্ত্রিক হিন্দু সমাজকাঠামোয় দেবত্ব আরোপের মনস্তত্ত্ব এবং রাজনীতির এক নির্মম দলিল। বর্তমানের রাজনৈতিক ও আদর্শগত মেরুকরণের লেন্স দিয়ে দেখলে ‘দেবী’ হয়ে ওঠে অন্ধ বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সর্বকালীন রূপক।
চলচ্চিত্রের শুরুতেই কালীকিঙ্কর রায়ের পরিবারে যে শাশ্বত সনাতনী বিশ্বাসের পরিচয় মেলে, তা সমসাময়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল ভিত্তি—‘পবিত্র ঐতিহ্য ও দেবত্বে’র ধারণার সঙ্গে সরাসরি সংলাপ জুড়ে দেয়। জমিদার কালীকিঙ্কর (যাঁর নামটির মাঝেই কালীর প্রতি অন্ধ ভক্তির ইশারা লুকিয়ে আছে) যখন তার পুত্রবধূ দয়াময়ীকে জীবন্ত দেবী হিসেবে পুজো করতে শুরু করেন, তখন সেখানে ধর্মের নামে এক ধরনের আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব কাজ করে। ঐতিহ্যিক অনুশাসনের নামে নারীর ইচ্ছাকে গলা টিপে হত্যা করার এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ক্ষমতারই সমার্থক।
জ্যেষ্ঠ পুত্র তারাপ্ৰসাদের পিতৃতান্ত্রিক আনুগত্য এবং সমাজের ধর্মান্ধ সমর্থন প্রমাণ করে যে, কীভাবে একটি সমষ্টিগত বিশ্বাস মানুষকে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হতে বাধা দেয়।
উমা প্রসাদ , যিনি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদে উদ্বুদ্ধ, তিনি হলেন সেই আধুনিক মানুষ যিনি অন্ধ বিশ্বাসের হিমালয়সম দেয়াল ভাঙতে চেয়েও ব্যর্থ হন। উমার এই অসহায়ত্ব আধুনিক রাজনৈতিক পরিসরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীন রাজনৈতিক লেন্স দিয়ে বিচার করলে, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং যুক্তিবাদ যখন রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উন্মাদনার কাছে বারবার পরাস্ত হয়, উমার পরিণতি যেন তারই পূর্বাভাস।
সত্যজিৎ রায় তাঁর সুক্ষ্ম পরিচালনায় কোনো স্লোগান ব্যবহার করেননি, বরং রূপক ও প্রতিমা দিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দয়াময়ীর কুয়াশাচ্ছন্ন বনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এবং দর্শকের মনে এই প্রশ্ন রেখে যাওয়া যে—আসলেই কি তিনি দেবী হয়ে উঠেছিলেন, নাকি সমাজের পৈশাচিক মানসিকতা তাঁকে উন্মাদ করে দিয়েছিল—তা এক গভীর রাজনৈতিক আঘাত হানে।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল সুর যেখানে দেবত্ব ও জাতীয়তাকে একীভূত করতে চায়, সত্যজিৎ সেখানে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই দেবত্ব আরোপের প্রক্রিয়াটি আদতে মানবিকতার চরম অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘দেবী’ চলচ্চিত্রটি কোনো প্রথাগত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিরোধিতার ছবি নয়; এটি হলো বিশ্বাসের মোড়কে লুকিয়ে থাকা অন্ধ ফ্যাসাদের বিরুদ্ধে এক চিরকালীন শিল্পভাষ্য। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নতুন মাত্রা পেয়েছে, তখন সত্যজিতের লেন্স দিয়ে ‘দেবী’কে পাঠ করা মানেই হলো অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকার ভেদ করে যুক্তির আলো জ্বালানোর পণ নেওয়া।